|

একাত্তরের সময় শেখ কামাল-শেখ জামাল যেখানে ছিলেন

BeFunky-Collage
Print Friendly

এফ টি বাংলা

‘আচ্ছা, আওয়ামী লীগ যে এত মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ কইরা ফেনা তুলে, তা শেখ কামাল আর শেখ জামাল মুক্তিযুদ্ধের সময় কই ছিল? শেখ কামাল তো মুক্তিযুদ্ধের সময় ইন্ডিয়ায় পলায়া ছিল। জামালও গেছিল। বাপে পাকিস্তানীগোর কাছে ধরা দিয়া আরামে দিন কাটাইছে পাকিস্তানে, আর পোলায় ইন্ডিয়ায় ছিল মৌজ ফুর্তিতে। তাইলে যুদ্ধটা করছিল কারা? এই যে আজকে রাজাকার বলে যে ইসলামী নেতাদের ফাঁসী দেওয়া হচ্ছে, এরাই সেইদিন যুদ্ধ করছিল ম্যা ম্যা ম্যা…’

একদিন-দুইদিন না, এই ম্যা ম্যা শুনছি আমরা আজকে প্রায় ৪০টা বছর ধরে। একটু বুঝতে শেখার পর থেকেই নানা জায়গায় দেখেছি, বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ উঠলেই অবধারিতভাবে আসতো শেখ কামালের প্রসঙ্গ এবং ব্যাংক ডাকাতি-মেয়েদের তুলে নিয়ে যাওয়া টাইপের জঘন্য মিথ্যাচারের কথা। তারপর একটা সময় আসতো এই কথাটা, ‘শেখ মুজিবের পরিবার মুক্তিযুদ্ধে যায় নাই কেন? মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ কামাল-শেখ জামাল কই ছিল?’

যে মানুষটা তার জীবনের সারে চার হাজার দিন কারাগারে কাটিয়েছিল স্রেফ বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতার জন্য, একটা স্বাধীন পরিচয়ের জন্য, সেই বঙ্গবন্ধুকে পুরো পরিবারসহ পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট জঘন্যতম বর্বরতায় মেরে ফেলার পর সেটাকে জায়েজ করতে ছড়ানো হয়েছিল এমন অসংখ্য নির্লজ্জ মিথ্যাচার। আর মুক্তিযুদ্ধে শেখ পরিবারের অবদানকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য ছড়ানো হয়েছিল যে শেখ কামাল-শেখ জামাল দেশ থেকে পালিয়ে ভারত গিয়ে মৌজ-ফুর্তি করেছে, ঠিক যেমনটি ছড়ানো হয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের ভারতে মদ-মেয়েমানুষে ডুবে থাকার নির্লজ্জ মিথ্যাচার। অথচ মুক্তিযুদ্ধে শেখ কামাল ও জামালের অবদানের ডকুমেন্টস আজো জাজ্বল্যমান। বাঙ্গালী দেখে না, বাঙ্গালী দেখতে চায় না!

শেখ কামাল, শেখ জামাল, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর সন্তানএকাত্তরের ২৫শে মার্চ কালরাতে বঙ্গবন্ধু যখন গ্রেফতার হলেন, আমাদের নরমাল কমনসেন্স বলে, তখন পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে কামালের উচিত ছিল পরিবারকে পাকিস্তানীদের হাত থেকে রক্ষা করা। কিন্তু একাত্তরের বিভীষিকা পাল্টে দিয়েছিল এমন অনেক হিসেব। আরো অসংখ্য পরিবারের বড় সন্তানের মতো কামালও পরিবারকে অমোঘ নিয়তির হাতে ফেলে চলে গিয়েছিলেন বাড়ি ছেড়ে, শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বেন বলে। দেশকে যে স্বাধীন করতে হবে। কামাল বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বাকি সদস্যরা পাকিস্তানীদের হাতে গ্রেফতার হবার আগেই। মে মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানী সেনাদের চোখ এড়িয়ে শেখ কামাল, তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য ইলিয়াস চৌধুরী এবং তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা শেখ শহীদুল ইসলাম গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী হয়ে মুকসুদপুর হয়ে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে যান। এরপর ভারতের বেলুনিয়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিশিয়ালি প্রথম ব্যাচের ক্যাডেট হিসেবে শেখ কামালের পাসিং আউট হয়। ১০৫ দিনের ট্রেনিং শেষে এসব তরুণ অফিসাররা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার মুহুর্তে সেকেন্ড লেফটেনেন্ট ওয়ালির এক ছোট ডায়েরীতে তাদের অটোগ্রাফ দিয়েছেন। ওয়ালি ছিলেন প্রথম কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদেরই একজন। সেখানে শেখ কামালেরও একটা অটোগ্রাফ আছে। তিনি লিখেছিলেন-
“তোমার সফলতা কামনা করছি।”
শেখ কামালুদ্দিন
৯.১০.৭১ ৮, থিয়েটার রোড
কোলকাতা


ট্রেনিং শেষ করার পর সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট শেখ কামালকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্ণেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি হিসেবে পদায়ন করা হয়। যুদ্ধের বাকি সময়টা তিনি সর্বক্ষণ ছিলেন প্রধান সেনাপতি ওসমানীর সাথে, দায়িত্ব পালন করেছেন তার এডিসি হিসেবে। শেখ কামাল কেবল মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না, ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম কমিশন্ড প্রাপ্ত অফিসারদের একজন।

দেশ স্বাধীন হবার এই মুক্তিযোদ্ধা দেশ গড়ার দায়িত্ব কাঁধে নিতে অবসর নেন সেনাবাহিনী থেকে, সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট হিসেবেই। এই লেখায় শেখ কামালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অজস্র ছবির কিছু শেয়ার করা হলো।

শেখ কামাল, শেখ জামাল, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর সন্তান
শেখ জামালের মুক্তিযুদ্ধে যোগদান ছিল আমাদের জন্য একটা বিশেষ ট্যাকটিক্যাল মুভ। তার ভাগ্য কামালের মতো ভালো ছিল না। বড় ভাই পালাতে পারলেও জামাল পালাতে পারেননি, পরিবারের বাকি সদস্যদের সাথে গ্রেফতার হন পাকস্তানী সেনাদের হাতে। কামাল পালিয়ে যাওয়ায় শেখ জামাল ছিল পাকিস্তানীদের চূড়ান্ত নজরদারির মধ্যে, তারা কোনভাবেই জামালকে চোখের আড়াল হতে দিত না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রক্ত বইছে যার ধমনীতে, তাকে কিভাবে আটকে রাখবে পাকিস্তানীরা? একাত্তরের আগস্টের একদিন সকালে মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব আবিষ্কার করলেন, তার সন্তান জামালকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। স্বামী এবং এক সন্তানকে আদৌ আর কখনো দেখতে পাবেন কিনা জানেন না, প্রতিদিনই পাকিস্তানী সেনারা হুমকি-ধমকি আর মানসিক অত্যাচার করছে, বেগম মুজিব এমনিতেই প্রচন্ড যন্ত্রণায়, এর মধ্যেই হঠাৎ আরেক সন্তান শেখ জামালকে খুঁজে না পেয়ে চরম আতংকিত এবং উদ্বিগ্ন ফজিলাতুন্নেন্সা মুজিব তার সন্তানকে অপহরণের অভিযোগ তুললেন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। তার এই অভিযোগ আলোড়ন তুললো সারা বিশ্বে, অনেকগুলো বিদেশী পত্রিকা নিউজ করলো, পাকিস্তানীরা গুম করেছে বন্দী শেখ মুজিবের মেজ ছেলেকে!

শেখ কামাল, শেখ জামাল, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর সন্তান
আসল ঘটনা হচ্ছে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে পালিয়েই শেখ জামাল সরাসরি চলে গিয়েছিলেন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে। তারপর ট্রেনিং শেষ করবার পর তাকে মুজিব বাহিনীতে নেওয়া হয়। সেখানেই যুদ্ধের বাকি সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন জামাল। কিন্তু জামালের এই খবরটা সঙ্গত কারণেই একেবারে চেপে যায় স্বাধীন বাঙলা প্রবাসী সরকার, কারণ এই ইস্যুতে প্রবাস সরকার এবং ভারত সরকারের তীব্র চাপে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচন্ড বেকায়দায় পড়েছিল পাকিস্তান সরকার। এটি ছিল মূলত সাইকোলজিক্যাল গেইমে এক কার্যকরী অস্ত্র! বিব্রত পাকিস্তানীরা কোন উত্তরই দিতে পারছিল না। বন্দী অবস্থায় তাদের হেফাজত থেকে শেখ মুজিবের ছেলের গায়েব হয়ে যাওয়ার খবরটা প্রচন্ড সমালোচনার মুখে ফেলেছিল পাকিস্তানীদের।

শেখ কামাল, শেখ জামাল, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর সন্তানএরপর ২রা ডিসেম্বর লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধের যে সব আলোকচিত্র ছাপা হয়েছিল, তার একটিতে সীমান্তের ১০ মেইল ভেতরে সাবমেশিনগান হাতে জামালকে যুদ্ধ করতে দেখা যায়। মুক্তিযুদ্ধের পর শেখ জামালের প্রথমে যুগোশ্লাভিয়া এবং পরে ব্রিটিশ রয়েল মিলিটারি অ্যাকাডেমী থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার কথা ছিল। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট থামিয়ে দেয় সব!

পুরো একাত্তর জুড়ে কামাল-জামালের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি তাদের পদের কারণে বিভিন্ন ট্যাকটিক্যাল কারণে সঙ্গত কারণেই প্রকাশ করা হয়নি। স্বাধীনতার পর সেভাবে লিপিবদ্ধও করা হয়নি। হয়তো হতো, কিন্তু তার আগেই ‘৭৫ আগস্ট এসে সব থামিয়ে দিল।

আর তারপর থেকেই আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি একের পর এক প্রোপাগান্ডা আর নির্লজ্জ অপপ্রচার ছড়িয়ে তাদের বানিয়েছি ইতিহাসের ভিলেন!

কী অদ্ভুত! কী আশ্চর্য! অবশ্য যে জাতি জাতির জনককে সপরিবারে নির্মমভাবে শেষ করে ফেলতে পারে, তাদের কাছে যে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানের বীরত্বগাঁথা দলিল আর ডকুমেন্টস দিয়ে প্রমাণ করতে হবে, এ আর বিচিত্র কি!

(এই পুরো লেখাটার অনুপ্রেরণা, সার্বিক তথ্য এবং ছবির জন্য মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অমি রহমান পিয়াল ভাইয়ের কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। ছবিগুলো নেওয়া হয়েছে জন্মযুদ্ধ থেকে)

-লিপু

Comments