|

একটা গুলি লাগবে আমার বুকে

AU_L20170811055955
Print Friendly

এফ টি বাংলা

‘একটা গুলি লাগবে আমার বুকে, আর বঙ্গবন্ধুর বুকে।’- আশ্চর্য এই ভবিষ্যৎবাণী। বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব ও পরবর্তীতে ডিএফআই-এর প্রধান কর্নেল শাফায়াত জামিল- এর কথাটি সত্য হয়ে দেখা দেবে তা ভাবতেও পারেননি মিসেস জামিল।

বঙ্গবন্ধু জীবনে কাউকে ভয় পাননি। সারা জীবন জুলুমবাজ পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে লড়েছেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে জল্লাদ বাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল, জেলখানায় তাঁর চোখের সামনে তাঁর কবর খুঁড়েছিল। তাও তিনি নিঃশঙ্কচিত্তে বলেছিলেন, ‘আমি নতি স্বীকার করতে জানি না। আমি বাঙালি, আমার দেশ বাংলাদেশ।’

সেই অকুতোভয় মহানায়ক ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, তাঁর আশেপাশের মানুষগুলো তাকে হত্যা করেবে।

স্বাধীনতার পর দেশে ফিরলেন। দেশের শাসনভার নেওয়ার পর তিনি নিরাপত্তার ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যান। আসলে যে বাঙালিকে তিনি জন্মের পর থেকে দেখে আসছেন, যে বাঙালির জন্য, দেশের জন্য তিনি জীবনের মায়া করেননি, তাদের কাছে নিরাপত্তা কী!

বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের মানুষ কর্নেল জামিল কিন্তু প্রায়ই অনুযোগ করতেন। বঙ্গবন্ধু কোনো সিকিউরিটিই মানছেন না। বঙ্গভবনে না থেকে ৩২ নম্বরে থাকছেন। কন্যা ও স্ত্রীর কাছে এ ব্যাপারে কর্নেল জামিল আশঙ্কার সুরে বলতেন, ‘দেখবে, বুড়া নিজেও মরবে, আমাকেও মারবে।’

জামিল বঙ্গবন্ধুকে অতিশয় ভালোবাসতেন। তাই কখনো ফাদার, কখনো বুড়া, কখনো বঙ্গবন্ধু- যখন যা মনে হত ডাকতেন।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু নিহত হলেন- সেনাবাহিনী, রক্ষীবাহিনী, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা যখন চরম ব্যর্থতায় রূপ নেয় তখনই এই দেশপ্রেমিক, সাহসী সেনা অফিসার জাতির পিতাকে রক্ষা করার জন্য জীবন উৎসর্গ করলেন। তাঁর নাম একজন সৎ, নিষ্ঠাবান,দেশপ্রেমিক সেনাঅফিসার হিসেবে ইতিহাস উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

বঙ্গবন্ধুর সময়কালের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,‘৭৫-এর ১৫ আগস্টের সেই রাতে তিনি জামিলকে ফোন করেছিলেন ৩২ নম্বরে যাওয়ার জন্য।

তার সেই বক্তব্যটি পড়ে সত্যিই আহত হই। সে সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথমে আমার কথা হয়। সাড়ে পাঁচটার সময় হট টেলিফোন যখন এল, তখন আমি ফোন ধরেছিলাম। ভোর ৪টা থেকে আমি উঠে বসে আছি। ফায়ারিং হচ্ছে। আমরা তখন গণভবনে থাকতাম। তখনো তিনি এদিক ওদিক ফোন করছিলেন। জানার চেষ্টা করছে। কী হচ্ছে, না হচ্ছে। কিছুতেই কিছু আঁচ করতে পারছে না। সেই সময়েই হট টেলিফোন বেজে উঠল। জামিল বলল, ফোনটা ধরতে। ধরলাম। বঙ্গবন্ধুর গলা-‘জামিলকে দাও।’

বেশ উদ্বিগ্ন কন্ঠ মনে হল। ওকে বলতেই দৌড়ে এসে ফোন ধরল। অনেকক্ষণ তার কথা শুনল। শেষে জামিল বলল, ‘স্যার আমি এক্ষুনি আসছি। চিন্তা করবেন না, ভয় পাবেন না, আপনি আপনার ঘরে থাকুন।’

এরপর সে পুলিশ সুপারকে, জেনারেল শফিউল্লাহকে ফোন করল। আমি শুধু এটুকুই শুনলাম, ‘’স্যার, আপনি ফোর্স পাঠান, আমি যাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু খুব বিপদে আছেন, মিসক্রিয়েন্টরা তার বাড়ি অ্যাটাক করেছে।’

তিনি কিন্তু আর্মির কথা বলেননি। মনে হয় বুঝতে পারেননি।

সেদিন জামিল সিভিল ড্রেসে বেরিয়ে এলেন। তখন গণভবনে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের দেড় শ সদস্য ছিল। তিনি প্রথমে কমান্ড করলেন, মুভ করল। সামরিক সচিব থাকা অবস্থায়, তিনি বঙ্গভবনে নিরাপত্তা ও নিয়মকানুন চালু করেছিলেন। আওয়ামী্ লীগের হর্তাকর্তা নেতারা কোনো নিয়ম-কানুন মানতে চাইত না। একদিন এক আওয়ামী লীগ নেতাকে বঙ্গভবনের গেটে আটকে দিয়েছিলেন।

১৫ আগস্টের সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়েই জামিল চলে যান। বাড়ির কেউ আর কোনো খবরই জানে না। এদিন বেলা দেড়টায় শফিউল্লাহ ফোনে জানালেন- ‘কর্নেল জামিল মারা গেছেন।’
ফোনে একথা শুনেই বললাম, ‘এসব আপনি কী বলছেন!’

এর আগেই বঙ্গবন্ধুর এডিসি শরীফ আজিজ, লেফটেন্যান্ট রব্বানীকে ফোন করেছিল। জামিলের ড্রাইবার কীভাবে পালিয়ে এসে জানাল, সে ৩২ নম্বরের কাছে গিয়ে গাড়ি ঘোরাতে চেয়েছিল কিন্তু জামিল তাকে চলে যেতে বলেছিলেন, ‘আমি ঠিক করে আসছি, তুমি যাও।’

১৫ আগস্টেই জামিল মূলত বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব ছিলেন না, ছিলেন ব্রিগেডিয়ার মশিউল হক। এই দিনই জামিলকে র‌্যাংক দেওয়ার কথা ছিল। ডিএফআই-এর প্রধান ব্রিগেডিয়ার রউফ ৭ দিনের ছুটি নিয়ে এক মাসের বেশি বিদেশে থাকেন। জামিল ডিএফআই-এর প্রধান হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু রউফ দেশে না ফেরা পর্যন্ত সম্পূর্ণ দায়িত্ব বুঝে পাচ্ছেন না। ব্রিগেডিয়ার রউফ এই নীল নকশায় জড়িত ছিলেন কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করি। সাইফারস চার্জ অর্থাৎ যেটায় গোপনীয় সমস্ত বিষয় থাকে সেটা দিয়ে যাননি রউফ। ওটা বুঝে পেলে বোধহয় বঙ্গবন্ধুর হত্যার পূর্বপরিকল্পনার ক্যু পাওয়া যেত।

অফিসের ড্রয়ারের চাবি পর্যন্ত দিয়ে যাননি, ফলে জামিল কোনো পেপার না পেয়ে বিরক্ত হন। সম্পূর্ণ চার্জ বুঝে না পাওয়ায় তাঁকে সিভিল পোশাকেই ঘুরতে হয়েছে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত। সামরিক সচিব হিসেবে যে হ্যান্ড ব্যাজ ছিল, ওটা মশিউর সাহেবকে দিয়ে দিতে হয়েছিল। রউফের এই চার্জ হস্তান্তর না করে বিদেশে দীর্ঘ দিন থাকাটা নীল নকশায় জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহ জোরালো করে।

জেনারেল শফিউল্লাহর ফোনে জামিলের মৃত্যুর খবর শোনার পর ঘটনাটি সত্যি কিনা এ ব্যাপারে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করার চেষ্টা চলল। বাইরে কার্ফু। এমন সময় খালেদ মোশাররফ ডিএফআই থেকে গাড়ি নিয়ে এক অফিসারকে পাঠালেন। তিনি জানালেন, ‘এখানে থাকাটা নিরাপদ নয় বিধায় বেগম জামিল যেন সন্তানদের নিয়ে গণভবন থেকে চলে যান লালমাটিয়ায় জামিলের ভাই-এর বাসায়।’

রাত ১১ টায় একটা গাড়ি আসে। মিসেস জামিলকে ক্যান্টনমেন্টে সবাইকে নিয়ে যেতে বলা হল। খালেদ মোশাররফ কর্নেল জামিলের লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। অবশ্য এরপরে জেনারেল শফিউল্লাহ আর তাঁদের কোনো খোঁজ-খবর নেননি।

পরে আমি জিজ্ঞেস করি শফিউল্লাহকে, কেন তিনি কর্নেল জামিলকে ৩২ নম্বরে যেতে বলেছিলেন।
শফিউল্লাহ সেদিন বলেছিলেন,‘ভাবী,আমি এর জবাব দিতে পারব না, যখনই আমি নামাজ পড়ি তখনই আমার সামনে বঙ্গবন্ধু আর জামিল ভাইয়ের মুখ ভেসে ওঠে।’

আমাদের পরিবারের সঙ্গে জিয়ার ঘনিষ্ঠতা ছিল। জিয়া বলেছিলেন, তিনি নাকি আমার দূর সম্পর্কের ভাই। সেনাপ্রধান হওয়ার পর ৩ সেপ্টেম্বর তিনি একটি শোকবার্তা পাঠান আমার কাছে।

মায়ের পীড়াপীড়িতে আমি জিয়ার কাছে যাই। আমার মা-ই জিয়াকে বললেন, ‘দেখো, জামিল কিছু রেখে যায়নি, এ অবস্থায় তুমি ওকে থাকার অন্তত একটি বাড়ি দাও।’

জিয়া শুধু বলেছিলেন,‘জামিল সবাইকে ফোন করল। আমাকে করল না কেন? তাহলে তো আমি ৩২ নং বাড়িতে যেতে দিতাম না।’ জিয়ার এই কথাতেই বোঝা যায় তিনি ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

  • আঞ্জুমান আরা জামিল

Comments