|

দশটি বুলেটের চিহ্ন নিয়ে এখনো বেঁচে আছি

AU_L20170811055955
Print Friendly

এফ টি বাংলা

বিভীষিকাময় সেই কালো রাতের দুর্বিষহ স্মৃতি এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। একটি মুহূর্তের জন্যেও ভুলতে পারি না সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের দুঃসহ দৃশ্য। চোখের সামনে ঝাঁঝড়া হয়ে গেল জন্মদাতা পিতার শরীর। ১৪ বছরের কিশোরী বোন বেবী, ১০ বছরের ছোট ভাই আরিফসহ পরিবারের সকল সদস্য লুটিয়ে পড়ল ঘাতকের ব্রাশ ফায়ারে। বড় ভাই (আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, চিফ হুইফ)-র সাড়ে ৪ বছরের ছেলে অবোধ শিশু বাবুর জীবনও মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নিল উত্তপ্ত বুলেট। জল্লাদের হাত একটি বারের জন্যও কেঁপে ওঠেনি ফুলের মতো শিশু বাবু, রাসেল-এর হৃদপিন্ড এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতে?

শরীরে দশ দশটি বুলেটের দগদগে ক্ষত চিহ্ন নিয়ে বেঁচে আছি। কিন্তু এ কেমন বেঁচে থাকা? চোখের সামনে পলকে পলকে নাচে ঘাতকের উদ্যত বন্দুকের নল, নিঃশ্বাসে এখনো লাগে বারুদের গন্ধ, মনের পর্দায় ভেসে ওঠে জনকের রক্তাক্ত শরীর, রক্তের প্লাবনে ভাসমান প্রিয় মুখগুলো।

স্বামী আকরাম আনী খানের স্টিভিডোরিং ব্যবসা। সেই সুবাদেই বেশ ক’বছর ধরে চট্টগ্রামেই থাকা। আসিফ এবং দীপ-কে নিয়েই বেঁচে আছি। চাওয়া-পাওয়ার আর কিছু নেই। কী-ইবা চাওয়ার আছে আমার, যা হারিয়েছি তা তো আর ফিরে পাব না।

২৭ নম্বর মিন্টো রোডের বাড়ি। আমার দাদির মৃত্যুবার্ষিকির অনুষ্ঠানের পর রাতের খাবার শেষ করে অনেক রাত পর্যন্ত আব্বা, বড় ভাই ও শহীদ ভাই কথাবার্তা বললেন। এরপর যে যার মতো যান ঘুমাতে। প্রচন্ড শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। চারদিক থেকে গুলি। ঝনঝন করে ভেঙে পড়ছে জানালর কাচ। তখন গভীর রাত। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলম না- কী হচ্ছে, কী ঘটছে। ছোট বোন বেবীকে নিয়ে দৌড়ে গেলাম আব্বা-আম্মার রুমে। ইতিমধ্যেই সবাই জেগে গেছে।

ভাই-ভাবী-বাচ্চারাও চলে এসেছে আব্বার রুমে। সবাই স্তব্দ, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রে বৃষ্টির মতো গুলি হচ্ছে। মা চিৎকার করে আব্বাকে বললেন, “মিয়া ভাইয়ের বাসায় ফোন করে দেখো।”

আব্বা বড় মামার সঙ্গে (বঙ্গবন্ধু) ফোনে কথা বললেন। জানি না, কী কথা হয়েছিল। মিয়া ভাই কী বললেন-আম্মা জানতে চাইলেই আব্বা বললেন, “আমাদের মতো অবস্থা তাঁরও। সেখানেও গুলি চলছে।”

বেবী আবার ফোন করে বড় মামাকে বলল,“মামা আমাদের বাঁচান।”

শেখ মনি ভাইয়ের বাসায় ফোন করা হল। মা বললেন, “বাবা মনি, আমাদের বাসায় খুব গুলি হচ্ছে। মনি ভাই বললেন আমি দেখছি…।”

শেষ করতে পারেননি কথা।ঘাতকের গুলি বিদীর্ণ করেছে তার দেহ। বর্বর ঘাতকরা ঠিক একই সময় একই সঙ্গে হামলা চালায় বঙ্গবন্ধু, সেরনিয়াবাত ও শেখ মনির বাসায়। বড় ভাই আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ চিৎকার করে বললেন আক্রমণকারীদের- খবরদার উপরে উঠার চেষ্টা করবে না।

একটু পরই সিঁড়িতে অসংখ্য বুটের শব্দ। উঠে আসছে বর্বররা। সারেন্ডার…সারেন্ডার বলে চিৎকার করতে করতে অস্ত্র উঁচিয়ে রুমে ঢুকে পড়ে দশ-পনেরো জনের ঘাতকের দল। সবাই হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ওরা বলল, ভয় পাবেন না, সবাই নিচে নেমে আসুন।

চৌদ্দ বছরের কিশোরী বেবী বলে উঠল, ভয় পাব কেন? আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না।”

ভীষণ একরোখা আর সাহসী ছিল আমার সেই বোনটি। সবাই নামছি সিঁড়ি বেয়ে। আব্বা আঁকড়ে ধরে ছিলেন আমার হাত। আমরা নিচে নেমে এলাম। আমির হোসেন আমুর খালাত ভাই নান্টু (সে রাতে আমাদের বাসায় ছিল) ছুটে এসে বলে, “চাচা, আমাদের কী হবে?”

ঘাতকরা আমাদের সবাইকে নিচের ড্রয়িং রুমে ঢুকতে বলল, এ সময় জুনিয়র একজন অফিসার নাম জিজ্ঞেস করল আব্বাকে।

আমার নাম আবদুর রব সেরনিয়াবাত।– আব্বা বললেন।

সৈন্যটি একটু হেসে বলল, ঠিক আছে ভেতরে যান।

ড্রয়িং রুমে ঢুকেই দেখলাম ঘাতকবাহিনী যুদ্ধের পজিসনে ঘিরে আছে আমাদের। আমরা সবাই ইতস্তত দাঁড়িয়ে। আব্বা জানতে চাইলেন, আপনাদের কমান্ডিং অফিসার কে?

ওদের একজন বলল, আমাদের কোনো কমান্ডিং অফিসার নেই।

পরে জেনেছি মেজর বজলুল হুদা ও কর্নেল শাহরিয়ার তখন বাইরে দাঁড়িয়ে কমান্ড করছিল।

মা জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কি আমাদের মারবেন?

উত্তর দিল ঘাতক দলের একজন, না আপনাদের মারব কেন?

তার কথা শেষ হবার আগেই মাত্র হাত দুয়েক দূর থেকে শুরু করল ব্রাশ ফায়ার। ঠা-ঠা শব্দের মাধ্যে আমি চিৎকার করে জড়িয়ে ধরলাম আব্বাকে। একটু থেমে আবার চলল ব্রাশ ফায়ার… লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে। মনে হল আব্বাও পড়লেন উপুড় হয়ে। কানের কাছে আর্তনাদ, অস্পষ্ট গোঙানি… রক্তে ভেসে যাচ্ছে ড্রয়িং রুম। পানি পানি… এরপর আর জানি না কিছুই।

জ্ঞান ফিরল হাসপাতালে। কিছুই মনে করতে পারছিলাম না, আমি এখানে কেন! ডাক্তারদের কথাবর্তা কানে আসে অস্পষ্ট। শুনলাম আব্বা, বড় মামা (বঙ্গবন্ধু), মনি ভাই, আরজু আপা- কেউ বেঁচে নেই। প্রচণ্ড চিৎকার করে জ্ঞান হারালাম আবার। জ্ঞান আসে, চোখে ভেসে ওঠে রক্তের স্রোত, ঘাতকের মুখ, আবার জ্ঞান হারাই। শরীরে দশটি গুলির ক্ষত এভাবে চেতন-অচেতন অবস্থায় কাটে চৌদ্দ দিন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে। পুরোপুরি যখন জ্ঞান ফিরল তখন জানলাম, আমার মা-ভাবী ও বোন রীনা বেঁচে আছেন। পাশের ওয়ার্ডেই চিকিৎসাধীন। কিন্তু আব্বা নেই, ভাই আরিফ সেরনিয়াবাত নেই, বোন বেবী নেই, বাবু নেই, নেই আরজু আপা, নেই…।

ঘাতকেরা কেড়ে নিয়েছে সব কিছু, স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকল ধীরে-ধীরে। পড়ে জেনেছি আমাদের বাসায় নিরস্ত্র করে রাখা নিরাপত্তা রক্ষীরা দুবৃত্তদের চলে যাবার পরপরই রমনা থানায় ঘটনা জানায়। রমনা থানার তৎকালীন ওসি ঝুঁকি নিয়ে থানার পুলিশ ভ্যানে করে আমাদেরকে পাঠিয়েছিলেন হাসপাতালে। পরের দিন আমি মাকে দেখতে পেলাম। হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের একটি কক্ষে রাখা হল বেঁচে থাকা আমাদের চার জনকে। বারো জন পুলিশ দিচ্ছে নিচ্ছিদ্র পাহারা। উপরের নির্দেশ ছাড়া কেউ ঢুকতে পারে না কক্ষে। এ অবস্থায় আমাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে লাগল দ্রুত। ডাক্তাররা কর্তৃপক্ষকে জানাল, এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের বাঁচানো যাবে না। পরিচিতদের রোগীর কাছে আসতে দেওয়া উচিত। নইলে এদের নিয়ে যান সিএমএইচে। মাহুতটুলির শ্বশুর বাড়িতে থাকত আমার মেজবোন মঞ্জু আপা, ২২ দিন পর মঞ্জু আপা আসতে পারলেন আমাদের কাছে। অতি আপনজনদের সঙ্গে এই প্রথম সাক্ষাৎ, নিঃশব্দে। তার কাছে জানলাম বড় ভাই হাসনাত আবদুল্লাহ বেঁচে আছেন। ঘটনার সময় ঘাতকদের দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি ঢুকে পড়েছিলেন অন্য একটি রুমে। ছোট ভাই খোকন, বড় ভাইর দুই শিশু সন্তান কান্তা আর সাদেককে নিয়ে পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অনেক কষ্টে মঞ্জু আপার বাসায় যায়। এর ক’দিন পর কমলাপুরের বাসা থেকে এলেন সেজ বোন শিউলি আর দুলাভাই। এভাবে ধীরে-ধীরে দেখা হতে লাগল আত্মীয়- স্বজনদের সঙ্গে। তখনো আমরা বন্দী।

ঘাতক দল তখনো খুঁজছে বড় ভাইকে। তাঁর সন্ধানে আত্মীয়দের বাসায় চালিয়েছে তল্লাশি। মা, ভাবী, রীনা কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে। এর মাঝে চলে গেল প্রায় এক মাস। গুলিতে মায়ের ডান ঘাড়ের হাড় ভেঙে গেছে, চিবুক কেটে গেছে। সেলাই দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে কোনো রকমে, ডান হাত অকোজো। রীনার জখম শুকিয়ে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু আমাদের অবস্থা শোচনীয় তখনো। শরীরে দশটি গুলির আঘাতে ডান পা সম্পূর্ণ অচল। বসার শক্তিটুকুও নেই। হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিওলেন ডাক্তারগণ, তখন অক্টোবর। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আদেশ দিলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ভাবীকে রেখে মাকে, আমাকে এবং রীনাকে ছেড়ে দিতে। কারণ বড় ভাইকে এখনো ধরতে পারে নি খুনীরা। জীবিত বা মৃত হাসনাতকে যে তাদের বড় দরকার। ভাবী শাহানারা বেগমকে জিম্মি করে রাখতে। চায় খুনীরা। কিন্তু মা অস্বীকার করলেন ভাবীকে ছাড়া হাসপাতাল ছাড়তে। বললেন, সেই রাতেই তো আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এখন আর কিসের ভয়। মা আবার সংজ্ঞা হারালেন, জ্ঞান ফিরেনি সারাদিন। মঞ্জু আপা-দুলাভাই ডাক্তারকে বললেন, এদেরকে হাসপাতাল থেকে বের করার ব্যবস্থা করুন। মেডিকেলে এদের কোনো চিকিৎসা নেই। এর ক’দিন পর দুলাভাই ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের সহায়তায় আমাদের সবাইকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করলেন।

দিনটি ছিল ৩১ অক্টোবর পঁচাত্তর। আমরা ছিলাম বন্দি, তৎকালীন সরকারের জিম্মায়। কিন্তু হাসপাতালের পাওনা যাবতীয় চিকিৎসা খরচ বাবদ প্রায় বিশ হাজার টাকা পরিশোধ করা হল অনেক কষ্টে, বোনদের সহায়তায়। আব্বার ব্যাংকে ছিল না পাঁচশটি টাকাও। আমাদের বরিশালের বাড়ি এবং মিন্টো রোডের সরকারি বাড়ি তখন সিলগালা করা, খুনীদের দখলে।

  • হামিদা সেরনিয়াবাত

Comments