|

শিক্ষার্থীদের চোখে জাবির যত সমস্যা

1512322317(1)
Print Friendly

জাবি করেসপন্ডেন্ট

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আবাসিক হলগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সভায় শিক্ষার্থীরা তাদের নানা সমস্যা তুলে ধরেন। সভায় জাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম এসব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন।

রবিবার (০৩ ডিসেম্বর) দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধা ৭টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, হল প্রভোস্ট, প্রক্টরিয়াল বডি, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মাহথীর মুহাম্মদ হলগুলোতে  বিদ্যমান গণরুমের ভয়াবহতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এ গণরুমে ম্যানার শিখানোর নামে নবীন শিক্ষার্থীদেরকে যেসব শিখানো হয় তা কোন সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারেনা। এখান থেকেই শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। তাই প্রশাসনের এখনই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।’

এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রিফাত বিল্লাহ বলেন, ‘আমি যখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি তখন আমার জায়গা হয়েছে গণরুমে। আমি আগে কাউকে গালি দিতাম না, কেউ দিলেও সহ্য করতে পারতাম না। কিন্তু এ গণরুম আমাকে গালি দেয়া শিখিয়েছে। এখন কেউ আমাকে গালি দিলে গায়ে লাগেনা। এ ছাড়াও রাতে আমার ঘুমানোর জায়গা নেই। যার কারণে সকালে ক্লাস করতে পারছিনা। ডিপার্টমেন্টে রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে। তাই এ গণরুমের বিরুদ্ধে প্রশাসনের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া দরকার।’

সভায় উপস্থিত অধিকাংশ শিক্ষার্থী এ গণরুম তুলে দেয়ার জন্য প্রশাসনকে দাবি জানালে উপাচার্য গণরুম তুলে দেয়ার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বাস দেন।

এসময় তিনি বলেন, ‘আমিও জানি এ গণরুম তুলে দিতে পারলে অনেক অপরাধ কমে যাবে। শিক্ষার্থীদের খারাপ হওয়ার পথও কমে যাবে।’

আবাসন সমস্যার কথা উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩তম ব্যাচের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হাসান আল মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় বলা হয়। কিন্তু এখানকার প্রায় ৩০ ভাগ শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাহলে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় বলার দরকার কি?’

এসময় হল প্রশাসনের কার্যক্রমের অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘হল প্রশাসন যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করার কারণে আজ হলগুলোর অবস্থা নাজুক। এমন অবস্থা শিক্ষার্থীরা হলের প্রভোস্ট ও আবাসিক শিক্ষকদেরকে চিনেনা। তার মানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে কোন যোগাযোগ নেই। তাই হল প্রশাসনকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’

এ বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা বলেন, ‘যাদের পড়াশুনা শেষ তারা সিট ছেড়ে দিলেই সিট সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’

এর প্রেক্ষিতে উপাচার্য বলেন, ‘আবাসন সমস্যা দূর করতে শিক্ষমন্ত্রণালয়ের সাথে আমাদের কথা-বার্তা চলছে। এ মাসের মধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে আমারা আরও ৪টি হল নির্মাণের জন্য বাজেটের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে পারবো বলে আশা করছি।’

ক্লাস রুটিনের বাস্তবায়ন নেই উল্লেখ করে কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘শিক্ষকরা রাতে জানিয়ে দেন আগামীকাল কখন ক্লাস নিবেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সিলেবাস আছে তা মানা হয় না। এমনকি অনেক শিক্ষক ক্লাসের সিডিউল দিয়েও ক্লাস নেননা। তাই এখন ক্লাস রুটিনের কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।’

এ বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা বলেন, ‘শিক্ষকরা শুক্র ও শনিবার বাণিজ্যিক কোর্সের ক্লাসগুলো যথাযথভাবে নিতে পারেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ক্লাস নিতে গেলে তারা নানা সমস্যা দেখান। শিক্ষকদেরকে এমন আচরণ থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।’

সভায় জাসদ ছাত্রলীগের আইটি সম্পাদক নোমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশন জটের অবস্থা তুলে ধরে বলেন, ‘আমি নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের ৪০তম ব্যাচের ছাত্র। আমার মাস্টার্স এখনও শেষ হয়নি। অথচ কোন কোন বিভাগের ৪১তম ব্যাচের মাস্টার্স শেষ হয়ে গেছে। যার কারণে আমরা সবার থেকে পিছিয়ে আছি। আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বছর এ বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাই এ সেশন জট দূরকরণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দরকার।’

মাদকের বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের  সভাপতি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে মাদক ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। তাই এ মাদক প্রতিরোধে হলগুলোর প্রতিটি রুমে, বটতলা, পরিবহন চত্বরসহ চিহ্নিত জায়গাগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা দরকার। এ ছাড়াও সকলকে নিয়ে মাদক বিরোধী কমিটি গঠন করা যেতে পারে।’

সভায় সালাম বরকত হলের ৪০তম ব্যাচের জাহিদ হাসান নামে এক ছাত্র বলেন, ‘আমার হলের ৫৬টি টয়লেটের লাইটগুলো নষ্ট হয়ে আছে। প্রশাসনকে বলার পর প্রশাসন ৪টির লাইট ঠিক করে দিয়েছে কিন্তু বাকিগুলো এখনও ঠিক করা হয়নি।’

সুফিয়া কামাল হলের ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মাহিমা মতি বলেন, ‘আমার হলে গেস্ট রুম নেই, গ্যাস নেই, খাবারের ব্যবস্থা নেই। ডাইনিংয়ে লোক নিয়োগ দেয়া আছে কিন্তু ডাইনিং চালু নেই। ফটোকপি করার ব্যবস্থা নেই। অন্য হলে ইন্টারনেটের ব্যবস্থা থাকলেও এ হলের ইন্টারনেটের কোন ব্যবস্থা নেই।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের ৪১তম ব্যাচের রুম্মান নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমার হলে গ্যাস নাই। ডাইনিং চালু নেই। ক্যান্টিন চালু থাকলেও সেখানে খাবারের দাম অনেক বেশি।’ এ সময় তিনি হলের পাশে যে জায়গাটি আছে তা সংস্কার করে মাঠ তৈরি করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। কামাল উদ্দিন হলের শিক্ষার্থীরাও তাদের হলের মাঠটি ঠিক করার জন্য প্রশাসনের নিকট দাবি জানান।

এ ছাড়াও সভা থেকে শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরি সংকট দূরকরণ, প্রতিটি হলের রিডিং রুমের ব্যবস্থা করা, সংসদ নির্বাচন দেয়া, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে আরও বেশি সহযোগিতা করা, র‌্যাগিং বন্ধ করা, মুক্তমঞ্চের জন্য স্থায়ী সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা করা, ছাত্রীদের হল প্রভোস্টের রুম হলের বাহিরে করা ও জাবিকে তথ্য প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।

-মাহমুদুল হাসান

Comments