|

ভারত-চীনের তুলনায় ইইউভুক্ত দেশের ঋণ বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক

pakistans-foreign-loan-reaches-highest-level-7347a776fc142ab3067748b5ecb100a5
Print Friendly

এফ টি বাংলা

চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন বেশ জটিল বলে ভারত ও চীনের প্রতিশ্রুত ঋণের টাকা পুরোপুরি উন্নয়নকাজে ব্যবহার করা যায় না। এই দুই দেশের চেয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ)দেশগুলো থেকে ঋণ বা অনুদান নেওয়া বাংলাদেশ সরকারের জন্য বেশি স্বস্তিদায়ক।

কারণ, ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে নেওয়া ঋণ অনেকটাই শর্তহীন থাকে। তবে ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের পাওয়া অর্থের অধিকাংশই অনুদান। এই অনুদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে খাত উল্লেখ করা থাকলেও থাকে না কোনও শর্ত।

তাই বাংলাদেশের জন্য ইইউ থেকে পাওয়া অনুদান উন্নয়নকাজে ব্যবহার করা বেশি স্বস্তিদায়ক। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত ও চীন বাংলাদেশকে ‘সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট’র নামে কিছু কঠিন শর্ত দেয়। ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে পাওয়া ঋণ বা অনুদানের ক্ষেত্রে তা থাকে না। আর এ কারণেই ভারত ও চীনের কাছ থেকে পাওয়া ঋণের ব্যবহার এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন অনেকটাই কঠিন হয় বাংলাদেশের জন্য। তাই ভারত ও চীনের প্রতিশ্রুত ঋণের বেশির ভাগ টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের প্রতিশ্রুত ঋণের তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার এখনও ব্যবহার করা যায়নি। একই অবস্থা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতিশ্রুত ঋণের ক্ষেত্রেও। নরেন্দ্র মোদির প্রতিশ্রুত পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণের টাকা বেশিরভাগই অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। যেটুকু অর্থ ব্যবহার করা গেছে তাও ভারত-সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। এর বাইরের প্রকল্পগুলোয় এ অর্থ ব্যবহার করা যায়নি।

একই অবস্থা চীন থেকে পাওয়া ঋণের ক্ষেত্রেও। গত অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশের ২৭টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ২৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে বেসরকারি খাতে উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা সই করেছেন ১১টি চুক্তি। এসব ঋণের বাস্তবায়ন শুরু হলেও বেশিরভাগ প্রকল্পের অগ্রগতি বিভিন্ন কারণে আটকে গেছে।

ইআরডি সূত্রে আরও জানা গেছে, চীন প্রথম দফায় বাংলাদেশকে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দুই প্রকল্পে ৩৮ কোটি ৭১ লাখ ডলার ঋণ দিতে চুক্তি করে। ইআরডি ও চীনা দূতাবাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত চুক্তি হয়। ডেভেলপমেন্ট অব আইসিটি ইনফ্রা-নেটওয়ার্ক ফর বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ফেজ-৩ (ইনফো সরকার-৩) প্রকল্পের জন্য ১৫ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের চুক্তি হয়। আর মর্ডানাইজেশন অব টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ফর ডিজিটাল কানেক্টিভিটি (এমওটিএন) প্রকল্পের জন্য ঋণ চুক্তি হয় ২৩ কোটি ১৫ লাখ ডলারের।

জানা গেছে, এই দুই প্রকল্পে ওই ঋণের জন্য দুই শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। এছাড়া, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পসহ আরও ছয়টি প্রকল্পের চূড়ান্ত ঋণ চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে।

ওই সময় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উপস্থিত থেকে ৬টি মেগা প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এই ৬টি চুক্তি ও প্রকল্পে চীন এক লাখ ১০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে।

শি জিনপিং ও শেখ হাসিনার যৌথভাবে উদ্বোধন করা ৬টি প্রকল্প হচ্ছে- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট স্থাপন, কর্ণফুলী নদীর নিচে একাধিক লেনের টানেল নির্মাণ, চট্টগ্রামে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, পায়রায় এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, চার স্তরের জাতীয় তথ্য ভাণ্ডার ও শাহজালাল সার কারখানা নির্মাণ প্রকল্প।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের করা প্রকল্পগুলোর মধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলা ও হ্রাসকরণ, সেতু নির্মাণ, বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা সহযোগিতা, দু’দেশের মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাই, সামুদ্রিক সহযোগিতা, দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা, ইনফরমেশন, সিল্ক রোড, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সহযোগিতা, সন্ত্রাস মোকাবিলায় সহযোগিতা সংক্রান্ত প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর।

ইআরডি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় বাংলাদেশের জন্য ৪৫০ কোটি ডলার ঋণের ঘোষণা দেওয়া হয়। নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে শীর্ষবৈঠকের পর তাদের উপস্থিতিতে ২২টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ সময় বাংলাদেশের সামরিক ক্ষেত্রে ৫০০ মিলিয়ন ডলারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সহজ শর্তে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। দু’দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়ক ও রেল যোগাযোগ,  প্রতিরক্ষা ও পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের অক্টোবরে ভারতীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বাংলাদেশ সফরে এসে দু’দেশের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন করে গেছেন।

এর আগে ২০১০ সালে মনমোহন সিং ক্ষমতায় থাকাকালে প্রথম লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল ভারত। এর মধ্যে ৮০ কোটি ডলার ঋণ, ২০ কোটি ডলার অনুদান। এই অর্থে ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। যার অধিকাংশই ভারত-সম্পৃক্ত।

গত সাত বছরে এসব প্রকল্পের বিপরীতে মাত্র ৩৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার ছাড় করেছে ভারত। এরপর আরও ৮৬ কোটি ডলার ঋণ সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এরপর দ্বিতীয় ঋণ চুক্তির আওতায় মনমোহন সিং সরকার আরও ২০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রতি দেয়। এই অর্থে ১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাছাই করা হয়। এর মধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ১২টির। তবে প্রকল্পগুলোর মাঠপর্যায়ের কাজ এখনও শুরু হয়নি। সূত্র জানায়, এগুলো করা সম্ভব হয়নি ভারতের দেওয়া সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের শর্তের কারণে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ঋণ গ্রহণের বিষয়টি সরকারের এখতিয়ার। প্রয়োজন হলে সরকার যে কারও কাছ থেকে ঋণ নিতেই পারে। এটি স্বাভাবিক ঘটনা। তা একান্তই সরকারের নিজস্ব নীতির ওপর নির্ভরশীল। আর শর্তের বিষয়টি যে ঋণ দেবে, আর যে ঋণ নেবে তার ওপর নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সহনীয় এমন শর্তেই ঋণ নেওয়া উচিত।’

জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘ভারত ও চীনের প্রতিশ্রুত ঋণের বিপরীতে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন চলছে। এ ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ তো চলছে। আর ইইউভুক্ত দেশ ও সংস্থাগুলো থেকে সরকার বিভিন্ন অনুদান ও ঋণ নেয়। তবে ঋণের ক্ষেত্রে তো কিছু শর্ত থাকে, তবে তা সরকারের জন্য সমস্যা নয়।’

-লিপু

Comments