04/21/2026
মোঃ হুমায়ুন কবির | Published: 2026-03-29 19:06:44
শরীয়তপুরের সদর উপজেলা খাদ্য গুদাম (আংগারিয়া এলএসডি) যেন নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি এই খাদ্য গুদামকে তার নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি একটি লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই তদন্ত কমিটি নিয়েও শস্যের মাঝেই ভূত দেখছেন গুদাম সংশ্লিষ্টরা। স্বচ্ছ তদন্তের ব্যাপারে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড)’র আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের স্বার্থে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করেছেন স্থানীয়রা।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া বাজারের ব্যবসায়ী খান রাইস মিলের মালিক মতিউর রহমান খানের লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আংগারিয়া এলএসডিতে আমন চাল সংগ্রহ অভিযানের তার মালিকানাধীন খান রাইস মিলের নামে চাল সংগ্রহ দেখিয়ে শরীযতপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হুমায়ুন কবির ও শরীয়তপুর সদর উপজেরা আংগারিয়া এলএসডির (খাদ্য গুদামের) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ নেওয়ান আলম (দিনা) সরকারের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে।
চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি মিলের মালিক মতিউর রহমান খানের সোনালী ব্যাংক শরীয়তপুর শাখার হিসাব নাম্বার থেকে দেওয়া একটি ম্যাসেজের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন তার হিসাব নম্বর থেকে একটি চেক ইস্যু করে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এই ঘটনায় হতভম্ব মতিউর রহমান খান সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগ করেন। এসময় তিনি জানাতে পারেন যে, তার হারিয়ে যাওয়া একটি চেকের (হারানো চেকের জিডি নাম্বার পালং মডেল থানা ৯৭০) মাধ্যমে শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ নেওয়াজ আলম (দিনা) তার নিজস্ব লোক দিয়ে টাকা উত্তোলন করেছেন।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পর ঐ হিসাব পরিচালনাকারী খান রাইস মিলের মালিকের উত্থাপিত "আমাকে ফোন না দিয়ে বা অনুমতি না নিয়েই কেন চেকের টাকা প্রদান করা হয়েছে"; এমন প্রশ্নের কোনও সদুত্তর সোনালী ব্যাংকের উক্ত ম্যানেজার দিতে পারেনি বলে লিখিত অভিযোগে দাবী করেছেন মতিউর রহমান খান।
লিখিত অভিযোগে খান রাইস মিলের মালিক মতিউর রহমান খান আরও উল্লেখ করেছেন, শরীযতপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হুমায়ুন কবির ও শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ নেওয়াজ আলম (দিনা) যোগসাজস করে তার অজান্তেই তার সহি স্বাক্ষর নকল করে খান রাইস মিলের নামে পে-অর্ডার করেছে। টিআর কাবিখার চাল কিনে তা দিয়ে সংগ্রহ সমন্বয় করেছে। আবেদনের অনুলিপি সংবাদিকদের মাঝে বিতরণ করে ন্যায় বিচার দাবী করেন মতিউর রহমান খান।
এই ঘটনার কয়েকদিন পরে বিএনপির স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার মাধ্যমে খান রাইস মিলের মালিক মতিউর রহমান খানের সাথে আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে সমঝোতার একটি অডিও রেকর্ড স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এই অডিওতে পুরো ঘটনা স্বীকার করে ধান ও চাল সংগ্রহের লাভের টাকার ভাগবাটোয়ারা করতে শোনা যায়। উক্ত অডিওতে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, তার তো (মতিউর রহমান খান) মিলই নাই।
এরপর গুদামের এক স্টাফ ওই মীমাংসা করতে আসা নেতাকে বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান করে দেয়ার অনুরোধ করেন। তার অনুরোধে ঐ নেতা কিভাবে মীমাংসা করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করেন। সেক্ষেত্রে ব্যাংকে গিয়ে মতিউর রহমান খানকে ওই চেকে স্বাক্ষর করে দেয়ার শর্ত দেওয়া হয়। কিভাবে কাদের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে, কার ফোনে কোন সিন্ডিকেট গুদামে ধান প্রদান করেছে, লাভের টাকা কিভাবে বন্টন করেছেন তার বিস্তারিতই ওই অডিওতে শোনা যায়।
এরপর ঐ নেতা সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভয় দিয়ে বলেন, "আমরা আপোষ-মীমাংসা করে ফেললে এসব অভিযোগের আর কিছুই হবে না। সাংবাদিকদের নিউজে কি আর হবে? গুদামে কোন সাংবাদিককেই ঢুকতে দিবে না।" এমন সব কথোপকথোনও হয়েছে ওই অডিওতে।
এদিকে, স্থানীয় এক সাংবাদিক আংগারিয়া এলএসডি তে নীতিমালা বর্হিভূত ভাবে ধান সংগ্রহের বিরুদ্ধে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে লিখিত আবেদন করেন। তার প্রেক্ষিতে খাদ্য সচিবের নির্দেশে ঢাকা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুরাইয়া খাতুন ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই তদন্ত কমিটিতে মাদারীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে আহবায়ক আর ফরিদপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (কারিগরি) ও শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্বরত)-কে সদস্য করা হয়েছে। তবে বিপত্তি বেধেছে শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অতি: দা:) আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে। আব্দুর রাজ্জাক শরীয়তপুর সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং যে সময়কার ধান ও চাল সংগ্রহ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে সেই সংগ্রহের সময় তিনি উক্ত উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবী, স্বচ্ছ তদন্ত হলে আব্দুর রাজ্জাককেও অপরাধীর কাঠগরায় দাড়াতে হবে। গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দুজনেই যৌথভাবে সকল কেনাকাটা করে থাকেন। এবং দুজনের যৌথ স্বাক্ষরেই কেনাকাটা সম্পন্ন হয়। যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে তাদেরই একজনকে তদন্ত কমিটিতে রাখাকে ”সর্ষের মাঝেই ভুত” দেখছেন স্থানীয়রা। আঞ্চলিক কর্মকর্তা সুরাইয়া খাতুন আলোচিত এই ঘটনার দায় এড়াতে এবং অভিযুক্তদের রক্ষা করতেই এমন তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন বলে ধারনা করছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও আংগারিয়া এলএসডি’র একাধিক কর্মচারী জানান, ২০১৭ একই গুদামে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন শাহ নেওয়াজ আলম (দিনা)। টানা দুই বছর এই গুদামে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেসময়ে সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানের মেয়ে পরিচয়ে গুদামকে নানা অপকর্মের স্বর্গ বানিয়েছেন। সব কিছু দেখেও মুখ বুজে সহ্য করেছি। তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপুকে বাবা ডাকতেন দিনা। এই দুই নেতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি যাচ্ছেতাই করেছেন গুদামে বসে। নিষিদ্ধ অনেক কাজ হয়েছে গুদামে, যা দেখেও না দেখার ভান করতে হয়েছে। ভয়েও কেউ কিছু বলার সাহস পায়নি।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টে ক্ষমতার পালাবদল হলে এবার ভোল পাল্টে বিএনপি’র প্রভাবশালী নেতাদের শেল্টার নেন শাহ নেওয়াজ আলম দিনা। বিএনপির এক শীর্ষ নেতার নাতী হিসেবে তিনি নিজেকে পরিচয় দিতে শুরু করেছেন। কোন কোন নেতাকে বড় ভাইও বানিয়ে ফেলেছেন। স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে তাকে আইনের আওতায় না আনলে গুদামের পরিবেশ ঠিক হবে না।
এসব বিষয়ে ঢাকা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুরাইয়া খাতুনের মুঠোফোন ও হোয়াটসএ্যাপে কল ও ক্ষুদেবার্তা দেয়া হলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। ২৫ মার্চ অফিসে গিয়েও আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রককে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ফারহানাকে জানানো হলে তিনিও কোন সাড়া দেননি।
শরীয়তপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হুমায়ুন কবির বলেন, শাহনেওয়াজ দীনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে সেই বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সাপেক্ষে কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিবে। মতিউর রহমান খানের চেক জালিয়াতির ঘটনায় আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই। এই বিষয়ের সাথে আমি মোটেও জড়িত নই।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শরীয়তপুর সদর উপজেলা গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ নেওয়াজ আলম দিনা এই প্রতিবেদককে বলেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি কোন অপরাধের সাথে জড়িত নই। মিল মালিক মতিউর রহমান খান ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81