01/11/2026
সামিউর রহমান লিপু | Published: 2026-01-10 15:20:25
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনে অধিকাংশ পদে বিজয়ী হয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত অদম্য জবিয়ান ঐক্য প্যানেলের প্রার্থীরা। তারা জকসুর ২১টি পদের মধ্যে ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ১৬টি পদে জয় পেয়েছেন।
বর্তমানে এই ফল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চলছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ। এরই আলোকে জকসু নির্বাচনের ময়নাতদন্ত এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হচ্ছে।
জকসু নির্বাচনে শিবিরের জয়ের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নিজস্ব ভোটব্যাংক, সাংগঠনিক পরিচিতি, দক্ষতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করার পর স্বাস্থ্যসেবা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যে তাদের প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে।
মূলত শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাদের সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তিই ছিল জয়ের প্রধান নিয়ামক। বিশেষ করে ঐক্যবদ্ধ সাংগঠনিক শক্তি তাদের জয়ের অন্যতম কারণ।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কঠোর নীতি শিবিরের কার্যক্রমকে সীমিত করে দেয়। তবে ছাত্রলীগের সঙ্গে মিশে রাজনীতি ধরে রেখেছিল শিবিরের একটি পক্ষ। আবার ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে ক্লাস-পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতি-নিরপেক্ষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজেদের প্রতি সহানুভূতি তৈরি করেছে আরেকটি পক্ষ।
এর আগে বিএনপির সময়েও শিবিরের একটি পক্ষের নেতাকর্মীরা সেই দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। যার ফলে বর্তমানে তারা ক্যাম্পাসে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে বলেই মনে করেন একাধিক ছাত্র সংগঠনের নেতারা।
একাধিক শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা বলছেন, জকসু নির্বাচনে শিবিরের জয় কেবল কৌশল কিংবা কাকতালীয় নয়। এর পেছনে রয়েছে শিবিরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক ও কার্যকর পদক্ষেপ। দলটির নেতাকর্মীরা দলীয় পরিচয় গোপন রেখে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন এবং আছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বিএনসিসি, ডিবেটিং সোসাইটি, আবৃত্তি সংসদ, রোভার স্কাউটসহ অন্যান্য ক্লাব। এতে নিজস্ব ভোটব্যাংক গড়ে উঠেছে।
২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পরই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মন জয়ে তৎপর হয় শিবির। মেধাবী সংবর্ধনা, ক্যাম্পাসে ও ছাত্রী হলে নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন আয়োজন শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে।
৫ আগস্টের পর ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরুর পর থেকে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের মাঝে কুরআন শরিফ বিতরণ, বৃত্তি, অসুস্থদের সহায়তা প্রদানসহ নানা কার্যক্রম চালিয়েছে সংগঠনটি। নতুন করে ক্যাম্পাসে আত্মপ্রকাশের পর থেকে এ পর্যন্ত ছাত্রশিবির দলীয় কোন্দল কিংবা কোনো ধরনের সংঘর্ষে জড়ায়নি।
জকসু নির্বাচনের শুরু থেকেই শিবির একতাবদ্ধভাবে তাদের শক্তি সামর্থ্যের পুরোটা কাজে লাগিয়েছে। নিজেদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা, নারীদের নিরাপত্তা ও পোশাকের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার শঙ্কার বিষয়টিকে বিবেচনায় নেয় সংগঠনটি। নানা পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের এসব ধারণা ও শঙ্কার বিষয়গুলো দূর করতে কাজ করেন তারা।
নির্বাচনে শিবিরের প্যানেলে প্রার্থীদের বেশিরভাগই একাধিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক ছিল। ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছাত্রশিবিরের সমর্থকগোষ্ঠী তাদের পুরো প্যানেল ধরে ভোট দিয়েছেন, ফলে তাদের ফিক্সড ভোট অন্য কোনো প্যানেলের সদস্যরা পাননি।
আবার কিছু কিছু শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, অনেক যোগ্য প্রার্থী শুধু প্যানেলনির্ভর ভোটিংয়ের কারণে পরাজিত হয়েছেন। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি প্রার্থীর যোগ্যতা ও কাজ দেখে ভোট দিয়েছি। কিন্তু ফলাফলে দেখছি, অপরিচিত অনেকে শুধু প্যানেলের কারণে জিতে গেছেন।
জকসু নির্বাচনে সমন্বিত শিক্ষার্থী প্যানেলে ৪ নারী প্রার্থী রাখা হয়। সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও প্রার্থী করা হয়। এগুলো ভোটারদের মধ্যে তাদের প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে। মূলত শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাদের সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তিই ছিল জয়ের প্রধান নিয়ামক।
ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেলের আশানুরূপ ফল না আসার পেছনে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকা, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব দায়ী। অধিকাংশ প্রার্থীর ফেসভ্যালু কম থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেদের তুলে ধরা কঠিন হয়েছে।
তবে অন্যান্য ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তুলনায় জকসুতে ভালো করেছে ছাত্রদল। ভিপি পদে হয়েছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। পাশাপাশি অন্যান্য পদেও লড়াই হয়েছে। কিন্তু জিএস পদে হারের ব্যবধান ছিল বেশি।
ছাত্রদল শক্তিশালী হলেও দলীয় কোন্দলে বিপর্যস্ত ছিল পুরোটা সময়। সর্বশেষ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা নিয়ে দলীয় কোন্দল ও বিভাজন আরও বৃদ্ধি পায়।
ছাত্রদলের একজন নেতা সভাপতি পদে ৫ বছর একই জায়গায়। অন্যদিকে শিবিরের এরই মধ্যে ৫ জন সভাপতি চলে যান কেন্দ্রীয় পর্যায়ে, না হয় লেখা পড়া শেষ করে সংসার ও কর্মজীবন শুরু করছেন।
এই বিষয়গুলো কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীরা দারুণভাবে পর্যবেক্ষণ করে। কোনও আদু ভাইকে ছাত্রনেতা হিসেবে দেখতে চান না তারা। এটা বারবার প্রমাণিত।
শিক্ষার্থীদের মন জয়ে ছাত্রদলের সমন্বিত কোনো কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি। কিছু প্রোগ্রাম আয়োজন করলেও তাতে দলের সব গ্রুপের সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি ছিল বলে মনে করছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই বছরের পর বছর ধরে ছাত্রদলের কার্যক্রম চলছে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। অনেকের নেই ছাত্রত্ব। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দুই তিন জনের বাপ। একেক নেতার বয়স ৩৮-৪০। একজন ৫-১০ বছর সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদ আঁকড়ে আছেন। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। তাই তরুণ-তরুণীরা ছাত্রদল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
শাখা ছাত্রদলের একাধিক নেতা বলেছেন, গ্রুপিংয়ের কারণে অনেক পরিচিত মুখকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। জুনিয়রদের প্রার্থী করা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হলেও তাদের মধ্যে খুব বেশি পরিচিত মুখ ছিল না। ৫ আগস্টের আগে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে রাজনীতি করতে না পারায় সঠিকভাবে নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি। অনেক প্রার্থীর যোগাযোগ অদক্ষতাও ভুগিয়েছে।
ছাত্রদলকে ঢেলে সাজাতে তারেক রহমানকেই উদ্যোগ নিতে হবে। না হয় এর খেসারত আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেও দিতে হতে পারে বিএনপিকে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত জকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে ওএমআর যন্ত্রে ভোট গণনা শুরু করে নির্বাচন কমিশন। তবে দুটি যন্ত্রে দুই রকম তথ্য দেখানোর কারণে গণনা স্থগিত রাখা হয়। এরপর প্রার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আলোচনা করে প্রথম ২৭৮টি ব্যালট পেপার হাতে গুনে পরে যন্ত্রে যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেয়। বুধবার রাত ১২টার দিকে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করে কমিশন।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81