31183

01/22/2026

এক ছাদের নিচে: ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক ও মানবিক এনজিও

মোস্তফা কামাল আকন্দ | Published: 2026-01-22 15:52:16

বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে ক্ষুদ্রঋণ কেবল একটি আর্থিক উদ্যোগ নয়; এটি ছিল সামাজিক আস্থা, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কভিত্তিক এক উদ্ভাবন।

গ্রামের নারী, ভূমিহীন কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ অর্থের চেয়েও বেশি কিছু ছিল—এটি ছিল মর্যাদা ও অংশগ্রহণের সুযোগ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষুদ্রঋণকে ব্যাংকিং কাঠামোয় রূপান্তরের যে উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, তা এই সামাজিক দর্শনের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।

ব্যাংক ও এনজিও—এই দুই প্রতিষ্ঠানের চরিত্র, লক্ষ্য ও দায়বদ্ধতা এক নয়। ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য হলো মুনাফা অর্জন, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে এনজিও পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণের মূল উদ্দেশ্য সামাজিক ন্যায়, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি।

এই দুই ভিন্ন দর্শনকে এক ছাদের নিচে রাখার চেষ্টা কাঠামোগত সংকট তৈরি করে, যেখানে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং যুক্তিই প্রাধান্য পায় এবং সামাজিক লক্ষ্য ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক হলে দরিদ্র মানুষ আর উন্নয়নের অংশীদার থাকে না; সে হয়ে ওঠে কেবল একজন গ্রাহক। তার জীবনের অনিশ্চয়তা—দুর্যোগ, অসুস্থতা, আয়হানি বা পারিবারিক সংকট—ব্যাংকিং হিসাবের বাইরে থেকে যায়। কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা তখন আর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয় না; তা হয়ে ওঠে আর্থিক ব্যর্থতা কিংবা আইনগত ঝুঁকি। এতে ক্ষুদ্রঋণের মানবিক ও সহমর্মিতাপূর্ণ চরিত্র ক্রমেই ক্ষয়ে যায়।

ব্যাংকিং কাঠামোর পক্ষে যুক্তি হতে পারে—এতে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নিয়ন্ত্রণ কাদের জন্য? এটি কি দরিদ্র মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করে, নাকি কেবল আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে?

এনজিওভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণে যে সামাজিক জবাবদিহি, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও নৈতিক দায়বদ্ধতা কাজ করত, ব্যাংকিং কাঠামোয় তার স্থান সংকুচিত হয়। ফলে ব্যবস্থা হয় আরও আনুষ্ঠানিক কিন্তু সামাজিকভাবে আরও দুর্বল।

বাংলাদেশের উপকূল, চর, হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলে এনজিওগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা পূরণ করে এসেছে। তারা শুধু ঋণ দেয়নি; দুর্যোগকালে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, নারীর নেতৃত্ব ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলেছে।

ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের চাপে যদি এনজিওগুলো কেবল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু এনজিও নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ই।

এটি ভুলে গেলে চলবে না যে, ক্ষুদ্রঋণ কখনোই প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার অনুকরণে তৈরি হয়নি। এটি ছিল একটি সামাজিক বিনিয়োগ মডেল, যেখানে আর্থিক টেকসইতার পাশাপাশি সামাজিক প্রভাব ছিল মুখ্য বিবেচ্য। ব্যাংকিং কাঠামো সেই সামাজিক প্রভাবকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে জানে না; সেখানে সংখ্যাই মুখ্য, মানুষের বাস্তবতা নয়।

এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—উন্নয়ন কি কেবল হিসাবের খাতা ঠিক রাখার বিষয়, নাকি সামাজিক ন্যায়েরও প্রশ্ন? ক্ষুদ্রঋণকে ব্যাংকে রূপান্তরের আগে এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

এক ছাদের নিচে ব্যাংক ও এনজিও—এই দুই ভিন্ন চরিত্রকে একত্রে চালানোর চেষ্টা বাস্তবে উন্নয়নকে এগিয়ে নেয় না; বরং তা ক্ষুদ্রঋণের সামাজিক আত্মাকে দুর্বল করে।

আজ প্রয়োজন ক্ষুদ্রঋণের এনজিওভিত্তিক সামাজিক চরিত্রকে সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করা, তাকে ব্যাংক বানানোর নামে শৃঙ্খলিত করা নয়।


Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman

Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81