04/28/2026
কাজী মাহমুদুর রহমান | Published: 2026-04-28 17:45:14
ঢাকার মতিঝিল, গুলশান কিংবা চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ—দেশের প্রধান আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। নতুন ঋণ অনুমোদিত হচ্ছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারিত হচ্ছে, ব্যবসা বাড়ছে—সবকিছু যেন উন্নয়নের এক ইতিবাচক গল্প বলছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান অগ্রগতির আড়ালে নিঃশব্দে জমে উঠছে এক গভীর সংকট—হোয়াইট-কলার অপরাধ এবং ঋণ খেলাপির বিস্তার।
১৯৩৯ সালে সমাজবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ড “হোয়াইট-কলার ক্রাইম” শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, সমাজের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরাও তাদের পেশাগত অবস্থানকে ব্যবহার করে অপরাধ করতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অপরাধের ধরন ও প্রভাব বহুগুণে বেড়েছে। আজকের বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে এটি আরও জটিল, আরও অদৃশ্য এবং আরও বিপজ্জনক।
হোয়াইট-কলার অপরাধের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অদৃশ্যতা। এখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি নেই, নেই কোনো সহিংসতা। কিন্তু একটি ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন, একটি জাল ঋণ নথি, বা একটি পরিকল্পিত অর্থপাচার—এসবই একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে।
এই অপরাধগুলো সাধারণত ঘটে অফিস কক্ষের ভেতরে, হিসাবের খাতায়, কিংবা ডিজিটাল লেনদেনের আড়ালে। ফলে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, অনেক সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারে না যে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অপরাধের প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ব্যাংকের ক্ষতি অন্য ব্যাংকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়, আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হোয়াইট-কলার অপরাধের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হলো ঋণ খেলাপি বা নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল)। একটি ঋণ যখন দীর্ঘ সময় ধরে পরিশোধ হয় না—সাধারণত ৯০ দিন বা তার বেশি—তখন সেটিকে নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) হিসেবে গণ্য করা হয়।
কিন্তু ঋণ খেলাপির পেছনে সব সময় অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাজ করে না। অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার ফল—
প্রথমত, ভুয়া বা অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে ঋণ নেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার না করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ব্যবহার করে ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এড়ানো হয়।
চতুর্থত, হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন রাখা হয়। ফলে একটি ঋণ, যা শুরুতে লাভজনক মনে হয়েছিল, ধীরে ধীরে ব্যাংকের জন্য বোঝায় পরিণত হয়।
ঋণ থেকে খেলাপি: একটি চক্রের গল্প
একটি ঋণ যখন সঠিকভাবে ব্যবহার হয়, তখন তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে—ব্যবসা বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, আয় বৃদ্ধি পায়। কিন্তু যখন সেই ঋণ অপব্যবহার হয়, তখন তা একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি করে।
ঋণ → অপব্যবহার → আয় কমে যাওয়া → কিস্তি বন্ধ → NPL → ব্যাংকের ক্ষতি → নতুন ঋণ কমে যাওয়া → অর্থনৈতিক স্থবিরতা
এই চক্রটি যত দীর্ঘ হয়, অর্থনীতির ক্ষতিও তত গভীর হয়।
ঋণ খেলাপি বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা কমে যায়। তারা নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রকৃত উদ্যোক্তারা—যারা সত্যিই ব্যবসা করতে চান।
একদিকে ব্যাংকের আয় কমে যায়, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় থেকে যায় অপরিবর্তিত। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়ায়। এতে সৎ ঋণগ্রহীতাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।
এভাবে একটি সীমিত পরিসরের অপরাধ ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
হোয়াইট-কলার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
> প্রথমত, এই অপরাধের সঙ্গে প্রায়ই প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জড়িত থাকে।
> দ্বিতীয়ত, আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যায় না।
> তৃতীয়ত, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে।
> চতুর্থত, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম—অনেকেই বুঝতে পারেন না কীভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ফলে অনেক অপরাধ ধরা পড়লেও তা শেষ পর্যন্ত শাস্তির মুখ দেখে না।
দেশে আর্থিক অপরাধ দমনের জন্য বিভিন্ন আইন রয়েছে—ব্যাংকিং আইন, অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন, দেউলিয়া আইন ইত্যাদি। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বড় ধরনের ঋণ খেলাপি বা আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এতে যেমন অর্থ উদ্ধার বিলম্বিত হয়, তেমনি অপরাধীদের জন্য একটি ভুল বার্তা যায়—আইনের ফাঁক গলে পার পাওয়া সম্ভব।
ঋণ খেলাপি থেকে পুনরুদ্ধার মানে শুধু টাকা ফেরত আনা নয়; বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে আবার সচল করা। পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো—
> ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন
> জামানত বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধার
> প্রয়োজনে ব্যবসা পুনরুজ্জীবনের জন্য সহায়তা প্রদান
> আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেনা আদায়
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সঠিক পরিকল্পনা ও সহায়তা পেলে একটি ব্যর্থ ব্যবসাও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তাই সব ঋণ খেলাপিকে একইভাবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ খেলাপি রোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিরোধ।
ঋণ অনুমোদনের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই, ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়ন, এবং ঋণের ব্যবহার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে অনেক সমস্যাই এড়ানো সম্ভব। এছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহার—যেমন ডিজিটাল ডাটাবেস, ক্রেডিট তথ্য ব্যুরো—ঋণ ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হোয়াইট-কলার অপরাধের মূল কারণগুলোর একটি হলো নৈতিকতার অভাব। যখন ব্যক্তিগত লাভকে সামাজিক দায়িত্বের ঊর্ধ্বে রাখা হয়, তখনই এই ধরনের অপরাধের জন্ম হয়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, “সরকারি টাকা মানে কারও নয়”—এই ভুল ধারণা থেকেই ঋণ খেলাপির প্রবণতা তৈরি হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে কোনো আইনই কার্যকর হবে না।
হোয়াইট-কলার অপরাধ ও ঋণ খেলাপির ক্ষতি শুধু ব্যাংক বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপরও।
যখন ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তারা সুদের হার বাড়ায়। এর ফলে সাধারণ গ্রাহককে বেশি সুদ দিতে হয়। আবার নতুন ঋণ কমে যাওয়ায় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যায়। অর্থাৎ, কয়েকজনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বোঝা বহন করতে হয় পুরো সমাজকে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
> প্রথমত, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
> দ্বিতীয়ত, আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
> তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব কমাতে হবে।
> চতুর্থত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
> পঞ্চমত, সামাজিকভাবে নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে হবে।
হোয়াইট-কলার অপরাধকে অনেক সময় “ভদ্রলোকের অপরাধ” বলা হয়। কিন্তু এর প্রভাব মোটেও ভদ্র নয়। এটি অর্থনীতির ভিত দুর্বল করে, আস্থার সংকট তৈরি করে এবং উন্নয়নের গতিকে থামিয়ে দেয়।
ঋণ খেলাপির মাধ্যমে এই অপরাধ যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন তা একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই নীরব সংকট একদিন বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। উন্নয়নের গল্পকে টেকসই করতে হলে এই অদৃশ্য ঝুঁকির বিরুদ্ধে এখনই লড়াই শুরু করতে হবে।
লেখক— ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসির এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড চিফ লিগ্যাল অফিসার (সিএলও)। তিনি একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট ও নীতি বিশ্লেষক।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81