32912

05/17/2026

হাতিরঝিলে শিশু তাসনিমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাবা-মাকে চাঁদাবাজ বানানোর অপচেষ্ট

আব্দুর রহিম | Published: 2026-05-17 20:47:48

রাজধানীর হাতিরঝিলে নির্মাণাধীন ভবনের অরক্ষিত লিফটের গর্তে পড়ে শিশু তাসনিমের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় ভবন মালিকের চরম অবহেলার বিষয়টি যখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট, ঠিক তখনই সামনে এলো এক চাঞ্চল্যকর ও অমানবিক তথ্য। সন্তানহারা শোকাহত মা-বাবার পাশে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, উল্টো তাদের ঘাড়ে চুরির অপবাদ ও চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলার হুমকি চাপাচ্ছে ভবন মালিকপক্ষ।

শুধু তাই নয়, এই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া আসামিকে কারামুক্ত  করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তারা। আর এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে প্রভাবশালী মালিকপক্ষকে নির্লজ্জভাবে ইন্ধন যোগাচ্ছে স্থানীয় থানা পুলিশ—এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের।

জানা যায়, ভবন মালিক শাখাওয়াত হোসেন নয়ন তার বোন মোসাঃ আফরোজা খানমকে দিয়ে হাতিরঝিল থানায় একটি হয়রানিমূলক লিখিত অভিযোগ দায়ের করিয়েছেন। শিশু তাসনিমের মা-বাবার দাবি, পুলিশ তড়িঘড়ি করে এই হাস্যকর অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্তও করেছে।

মিথ্যা অভিযোগের পাহাড়: ৬ টন রড ও ১৫০ বস্তা সিমেন্ট চুরির গাঁজাখুরি গল্প

হাতিরঝিল থানায় দেওয়া আফরোজা খানমের লিখিত অভিযোগে নিহতের বাবা লিটন (৪৯) এবং মা মিতু বেগমকে (৩২) প্রধান আসামী করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ১০-১২ জন সন্ত্রাসী নিয়ে ভবনে ঢুকে চাঁদা দাবি করে লিটন ও মিতু। চাঁদা না পেয়ে তারা নির্মাণাধীন ভবনের ভেতর থেকে ৬ টন রড, ১৫০ বস্তা সিমেন্ট, পাথর এবং মোটরসহ ৫ লাখ টাকার মালামাল জোরপূর্বক লুট করে নিয়ে যায়! সব মিলিয়ে বিবাদীরা মালিকপক্ষের প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠেছে—পেশায় দর্জি একজন হতদরিদ্র বাবা, যিনি সবেমাত্র সন্তান হারিয়েছেন, তিনি কীভাবে ১০-১২ জন সন্ত্রাসী ভাড়া করবেন? আর এত বিশাল পরিমাণ (৬ টন রড ও ১৫০ বস্তা সিমেন্ট) মালামাল ট্রাকে তুলতে দীর্ঘ সময় লাগে, যা জনবহুল ওই এলাকায় কারও চোখেই পড়ল না? একজন সাধারণ দর্জি কি এতটাই প্রভাবশালী যে, তিনি একজন বিত্তশালী ভবন মালিকের কাছে গিয়ে চাঁদা দাবি করবেন?

স্থানীয়দের মতে, এটি নিহতের পরিবারকে চাপে রাখতে মালিকপক্ষের সাজানো একটি ডাহা মিথ্যা নাটক।

অডিওতে আফরোজার দম্ভোক্তি

ঘটনার বিস্তারিত জানতে আমাদের প্রতিবেদক যখন আফরোজা খানমকে ফোন করেন, তখন তিনি কোনো রকম অনুশোচনা ছাড়াই দম্ভের সাথে নিহতের পরিবারকে দোষারোপ করতে থাকেন।

অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, শিশু তাসনিমের মৃত্যুর দায় এড়িয়ে আফরোজা উল্টো আসামিকে (যে বর্তমানে জেলে আছে) বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালানোর কথা অকপটে স্বীকার করেন।

সাংবাদিককে তিনি বলেন, "একটা অসহায় ছেলে... ওর কান্না দেখলে আপনি অস্থির হয়ে যাবেন। ওর জন্য তো উকিল আছে দাদাভাই, কিন্তু কোনো কারণেই বের করতে পারতেছি না। আজকে দুই মাস হয়ে গেছে জেলের ঘানি টানতেছে।"

যেখানে শিশু তাসনিমের মর্মান্তিক মৃত্যুতে একটি পরিবার পথে বসেছে, সেখানে মালিকপক্ষের বিন্দু পরিমাণ সহানুভূতি নেই নিহতের মা-বাবার প্রতি। উল্টো নিজেদের গাফিলতির কারণে জেলে যাওয়া কর্মীকে ছাড়িয়ে আনতে না পারার আক্ষেপে পুড়ছেন তিনি!

এদিকে, সন্তানের মৃত্যুতে পাগলপ্রায় মা-বাবাকে 'খারাপ মানুষ' আখ্যা দিয়ে আফরোজা দম্ভের সাথে আরও বলেন, "লিফটের ভিতরে সেই মেয়েটা (শিশু তাসনিম) পইড়া মারা গেলো, আল্লাহ মালুম ভাই... এখন ওই মানুষের কাছ থেকে মানুষে হেনস্তা করার জন্য টাকা পয়সা দাবি করে আমাদের কাছে। আমরা ওরে কখনোই টাকা পয়সা দিব না। আমরা যা করার তা দেইখাই নিব... এত দূর নেওয়ার পরে তো আমরা মিটতেই যাব না।"

পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকা ও বক্তব্য

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয়টি হলো স্থানীয় থানা পুলিশের ভূমিকা। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ প্রকৃত ঘটনা তদন্ত না করে এবং শোকাহত পরিবারের কান্না না শুনে, উল্টো প্রভাবশালী মালিকপক্ষের সাজানো গাঁজাখুরি চুরির অভিযোগ আমলে নিচ্ছে। পুলিশের এই পক্ষপাতমূলক আচরণ নিহতের পরিবারকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে।

তবে এই বিষয়ে ওসি আসাদুজ্জামানের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, "যে ভদ্রলোক বাড়িটা নির্মাণ করছেন, তিনি একটি অভিযোগ দিয়েছেন। আমরা তদন্ত করছি। কেন এই নামগুলো দেওয়া হলো, কারা এটা করছে—তা বিস্তারিত তদন্ত করে বের করতে হবে। আমাদের এক অফিসার একদিন ঘটনাস্থলে গিয়েছেন। বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। নিশ্চয়ই কিছু না কিছু আছে।"

বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর কিছু প্রভাবশালীর নাম

মর্মান্তিক এই মৃত্যুর ঘটনায় দ্য ফিন্যান্স টুডের নিজস্ব অনুসন্ধানে এই ঘটনার পেছনে বেশ কিছু প্রভাবশালীর নাম উঠে এসেছে। আমরা ধাপে ধাপে প্রমাণসহ তা উন্মোচন করব। বিশেষ করে ভবন মালিক শাখাওয়াত হোসেন নয়ন, তার বোন আফরোজা খানম, আবুল কালাম, হানিফ সওদাগর, খসরু ভূঁইয়া, আলম ও তার স্ত্রী এবং রফিকসহ আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে।

খুব শিগগিরই ভবন মালিক শাখাওয়াত হোসেন নয়নের সকল কীর্তি ও অনিয়ম প্রমাণসহ তুলে ধরা হবে, যিনি সাংবাদিককেও প্রশ্নের মুখে ফেলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন!

শেষ কথা

শিশু তাসনিমের মৃত্যুর দায় এড়াতে, আসামিকে বাঁচাতে এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে হয়রানি করতে যে নোংরা খেলা চলছে, তা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, অবিলম্বে এই মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ খারিজ করে এবং প্রভাবশালীদের কূটকৌশল থামিয়ে শিশু তাসনিম নিহতের ঘটনায় মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় বিচারের আশায় থাকা একটি নিরীহ ও শোকাহত পরিবার ক্ষমতার জাঁতাকলে চিরতরে পিষ্ট হয়ে যাবে।


Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman

Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81