05/18/2026
সামিউর রহমান | Published: 2026-05-18 18:10:06
জাতিসংঘের নেতৃত্বে প্রতিবছর রোহিঙ্গা ও স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য যৌথ সহায়তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এই পরিকল্পনা মূলত জাতিসংঘনির্ভর একটি পরিকল্পনা। এটা তাদের তহবিল সংগ্রহের একটা ব্যবস্থা। রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘের যৌথ সহায়তা পরিকল্পনা (জেআরপি) তহবিলে বিদেশি এনজিওগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের স্থানীয় ও জাতীয় এনজিওগুলো ন্যায্য তহবিল এবং সরাসরি নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে।
এনজিও ফোরামগুলোর মতে, বৈষম্য নিরসন ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় সংস্থাদের সরাসরি তহবিল ও নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া জরুরি।
কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম এবং কোস্ট ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা যায়, জেআরপি (JRP) তহবিলের সিংহভাগই আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংস্থা পেয়ে থাকে। স্থানীয় এনজিওগুলোকে ঠিকাদার বা সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে ব্যবহার করা হলেও, তারা সরাসরি ও পর্যাপ্ত তহবিল পায় না।
এই বৈষম্য নিরসনে আজ ১৮ মে (সোমবার) জাতীয় প্রেসক্লাবে কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) ও ইকুইটি জাস্টিটিজ ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইকুইটিবিডি) এর যৌথ উদ্যোগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও স্থানীয়করণের একটি রোডম্যাপ দাবি করা হয়েছে।
সিসিএনএফ ও ইকুইটিবিডির প্রধান মডারেটর রেজাউল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, ইকুইটিবিডির সমন্বয়কারী মোস্তাফা কামাল আকন্দ ও মোঃ ইকবাল উদ্দিন, এবং সিসিএনএফের সমন্বয়ক মোঃ শাহিনুর ইসলাম।
স্থানীয় এনজিওগুলোর সক্ষমতাকে অবজ্ঞা করায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার অংশীদারিত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে জাতীয় সংস্থাগুলো তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এই প্রসঙ্গে ইকুইটিবিডির প্রধান মডারেটর রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করার জন্য জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এক্ষেত্রে তারা এক্টেড, অ্যাকশন এইড এবং ইউনিসেফ টিডিএইচ এর মতো আন্তর্জাতিক এনজিওর মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন করছে। অথচ তাদের কাজের একটা অংশ স্থানীয় এনজিওর মাধ্যমে করার কথা। সেটা তারা তোয়াক্কা করছে না।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সমালোচনা করে রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থায়ী আবাসন তৈরি করছে। এর জন্য তারা সরকার, বন বিভাগ বা স্থানীয় মানুষের মতামত গ্রহণ করেনি। অথচ অনেক দেশে সরকারের অনুমতি ছাড়া জাতিসংঘ কোন কাজ করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, নেপালে কাজ করতে গেলে সেই দেশের অনুমতি নিয়ে কাজ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় তারা অনুমতি নেয়ার ন্যুনতম সৌজন্যতাও দেখাচ্ছে না। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং দেশের সকল নাগরিকদের জন্য অপমানজনক। ভবিষ্যতে এরকম যেন আর না হয় সেজন্য দেশের স্বার্থ সংরক্ষেণে জাতিসংঘের উচিত সকল কাজের জন্য সরকারের অনুমতি নেওয়া।
সরকারে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নতজানু মনোভাব ও বিদেশীদের অতিরিক্ত প্রাধান্য দেয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা যখন বাংলাদেশে আসে তখন আমরা তাদের সম্মান করবো, আতিথেয়তা দিবো কিন্তু তাদের অন্যায্য দাবি বা প্রস্তাবে কেন সমর্থন দিবো। এক্ষেত্রে সরকারকে দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ।
তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় মানুষের কথা শুনতে চায় না। তারা শুধুমাত্র জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সাথেই কথা বলেন। এই ধরনের আচরণ পরিহার করতে হবে। কারণ স্থানীয় মানুষ এই সংকটের সবচেয়ে বেশী ভুক্তভোগী। তাদের সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান দরকার, যার জন্য দরকার একটি স্থানীয়করণ ও প্রত্যাবাসন রোডম্যাপ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাতা দেশগুলো থেকে সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বৈশ্বিক এই তহবিল সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে মোঃ শাহিনুর ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বলেন, জাতিসংঘের নেতৃত্বে প্রতিবছর রোহিঙ্গা ও স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য যৌথ সহায়তা পরিকল্পনা গ্রহণ করে আসছে।
তিনি সমালোচনা করে বলেন, এই পরিকল্পনা মূলত জাতিসংঘনির্ভর একটি পরিকল্পনা। এটা তাদের তহবিল সংগ্রহের একটা ব্যবস্থা। গত বছরের জেআরপির মোট ৯৩৪.৫ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৮৭% তহবিল জাতিসংঘের কাছে ছিল, আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে ৯% তহবিল, কিন্তু স্থানীয় এনজিওর কাছে ১% এর চেয়ে কম তহবিল।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সংকটে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে। এমনকি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সরকার এই সংকটে সহায়তা করছে। কিন্তু এসব অবদান বর্তমান জেআরপি কাঠামোয় প্রতিফলিত হয়নি। বরং এটি মূলত জাতিসংঘ-নির্ভর তহবিল সংগ্রহের একটি কাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্থানীয় এনজিওগুলোর দাবি, তাদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে না রেখে সরাসরি তহবিল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এতে করে ত্রাণ কার্যক্রমের খরচ কমানো সম্ভব।
শাহিনুর ইসলাম বলেন, জেআরপির কমপক্ষে ২৫ শতাংশ তহবিল স্থানীয় এনজিওর কাছে ও স্থানীয় মানুষের জন্য বাস্তবায়ন করতে হবে। আর কার মাধ্যমে কত তহবিল বাস্তবায়ন করা হবে, সেই পরিকল্পনা জেআরপি-তে থাকতে হবে।
ইকুইটিবিডির সমন্বয়কারী মোস্তাফা কামাল আকন্দ বলেন, বর্তমান নির্বাচিত গনতান্ত্রিক সরকারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দায়িত্ব নিতে হবে। তাই এটার জন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন গঠন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গনহত্যা চালানো হয়েছে, তাই আগামী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ন্যায়বিচার ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন করতে হবে। যার মূল উদ্দেশ্য হবে একটি প্রত্যাবাসন রোডম্যাপ গঠন করা।
মো: ইকবাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা করতে গিয়ে কক্সবাজারের পরিবেশ, বন নষ্ট হয়েছে। ৩০০ একর কৃষি জমি নষ্ট হয়ে গেছে, এসবজমি কৃষি কাজের জন্য পুনরুদ্ধার জরুরি। তাছাড়া ক্যাম্পের অপরাধ প্রবণতাও বেড়েছে এবং কক্সবাজারে প্রতিদিন গড়ে ১ জন করে মানুষ খুন হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ করতে হবে। তাই নাফ নদীর পানি পরিশোধন করে রোহিঙ্গা ক্যান্পে সরবরাহ করার আহবান জানান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের শুধুমাত্র ত্রাণ না দিয়ে তাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে কাজ করতে হবে।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81