32382

04/02/2026

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদক | Published: 2026-04-01 05:37:26

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবনে প্রতিষ্ঠিত ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষত, কোনও দরপত্র ছাড়াই বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থে কাজ প্রদান, ক্রয়বিধি লঙ্ঘন এবং নিয়োগে অনিয়মের মতো নানা অভিযোগে সৃষ্ট বিতর্কের কারণে এই প্রকল্প ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে বলে আশঙ্কা করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি।

উল্লেখ্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’কে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বা ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে’ রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার। ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ‘গণভবন’কে জাদুঘরে রূপান্তরের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। দুইদিন পর, ৭ সেপ্টেম্বর গণভবন পরিদর্শন করেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের তিন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আদিলুর রহমান খান।

পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর পুনরায় গণভবন পরিদর্শন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদসহ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস। ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বাস্তবায়নে লেখক ও গবেষক এবাদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ১৭ সদস্যের এক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটিকে জাদুঘরের নকশা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৭-১৯ সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ কমিটিতে স্থপতি, আলোকচিত্রী, গবেষক এবং ছাত্র প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অভ্যুত্থানের স্মৃতিচিহ্ন, শহীদদের স্মারক ও আওয়ামী লীগ সরকারের নিপীড়নের ঘটনা তুলে ধরার জন্য গণভবনকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর করার প্রশংসনীয় এই উদ্যোগ এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এই বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্মৃতি জাদুঘর রূপান্তরের কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এই ঘটনাকে ঘিরে নানা মহল থেকেই সমালোচনা হচ্ছে।

উপদেষ্টা ফারুকীর অনিয়মের কীর্তি

জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি এবং দলিল সংরক্ষণের জন্য নেওয়া ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ প্রকল্প নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং স্বার্থের সংঘাতের প্রমাণ মিলেছে সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে।

একাধিক সূত্র জানায়, সাবেক উপদেষ্টা নিজেই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে নিজের নিয়োগকর্তা ও জাদুঘরের প্রধান পদে নিয়োগ পেয়েছেন। এই পদে যোগদানের জন্য শিক্ষাগত যে ন্যূনতম যোগ্যতার শর্ত থাকে, তা ফারুকীর সুবিধামতো শিথিল করা হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল জাদুঘরটি জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা হিসেবে পরিচালিত হবে। তবে অভিযোগ আছে, ফারুকীর প্রভাবেই এটিকে আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর অনুমোদিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, জাদুঘর পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হবেন ইতিহাস, শিক্ষা বা সংস্কৃতির কোনো বিশেষজ্ঞ। কিন্তু সভাপতি পদের নির্বাচন হওয়ার কয়েক দিন আগে ফারুকী নিজেই এই পদটি গ্রহণ করেন।

নিয়োগ বিধিমালার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবিত ১০৭টি পদের কাঠামো গ্রহণ না করে, একজন জ্যেষ্ঠ আইন উপদেষ্টার নেতৃত্বে নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়। এতে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, আগের শর্ত থাকলে ফারুকীর পক্ষে সভাপতি হওয়া সম্ভব হতো না।

অন্যদিকে, জুলাই জাদুঘরের জন্য ১৯টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ একটি বেসরকারি সংস্থাকে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকায় দেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে এই সংস্থার কোনও অভিজ্ঞতা নেই এবং এর মালিকের সঙ্গে ফারুকীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এজন্য বিশ্লেষকরা দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, সরকারি কোনও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসার জন্য যে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন, সেটি ফারুকী সাহেবের জন্য শিথিল করা হয়েছে। এটি প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত খারাপ একটি উদাহরণ হয়ে থাকলো।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১০৭টি পদের একটি পেশাদার খসড়া প্রস্তাব করেছিল, যা ফারুকী গ্রহণ করেননি। পরে, আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যোগ্যতার শর্ত কমিয়ে নতুন কাঠামো করা হয়। পুরনো শর্ত থাকলে তিনি নিজে কখনোই সভাপতি হতে পারতেন না।

বিশ্লেষকদের মতে, মন্ত্রী পদমর্যাদার কোনো উপদেষ্টা যদি একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ নেন, তবে তা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। ব্যক্তিগত যোগ্যতা থাকলেও নিজের সুবিধামতো যোগ্যতার মান ঠিক করা অনুচিত।

দরপত্র ছাড়াই দুটি প্রতিষ্ঠানকে শতকোটি টাকার কাজ

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর' নির্মাণ ও সংস্কার কাজে দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ১১১ কোটি ১৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়। এই কাজটি দ্রুত বাস্তবায়নের অজুহাতে কোনও ধরনের স্বচ্ছতা ছাড়াই মেসার্স শুভ্রা ট্রেডার্স ও দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড নামের দুটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়। এতে প্রতিযোগিতা না থাকায় কাজের স্বচ্ছতা ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দ্য ফিন্যান্স টুডের বিশেষ অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গণপূর্ত বিভাগ প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী শুভ্রা ট্রেডার্স জাদুঘরের ইএম অংশের কাজ করেছে; যার প্রাক্কলন ব্যয় ছিলো ৪০ কোটি ৮২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে, পূর্ত অংশের কাজ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’। এই কাজের প্রাক্কলন ব্যয় হয়েছে ৭০ কোটি ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।

ব্যয় নির্ধারণে অস্পষ্টতা

দ্রুততম সময়ে এবং বিশাল বাজেটে নির্মিত এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের কী কী নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে তার কোনো বিস্তারিত বা জনসাধারণের কাছে দৃশ্যমান মহাপরিকল্পনা বা নকশা প্রকাশ করা হয়নি যা এই প্রকল্পের অস্পষ্টতা আরও বাড়িয়েছে। উপরন্তু, এই প্রকল্পে ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারণ এবং কোন প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে কাজ দেওয়া হয়েছে—সেই বিষয়েও স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

এছাড়া, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে যে দুটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে সেখানে ব্যয়মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি কী? ব্যয়িত অর্থের ‘ভ্যালু ফর মানি’ কীভাবে নিশ্চিত হবে? এই প্রশ্নসমূহের যথাযথ উত্তর ছাড়াই এভাবে কাজ দেওয়ায় প্রক্রিয়াটি যোগসাজসমূলক এবং পক্ষপাতদুষ্ট বলে জনমনে সন্দেহ দানা বেঁধেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই কাজ দেওয়ায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ ও সদ্ব্যবহারের প্রশ্নে সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অঙ্গীকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা (টিআইবি) এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, সরকারি ক্রয়ে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তাদের মতে, সময়ের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিপন্থী।

সংস্থাটির মতে, এই প্রকল্পের সিদ্ধান্ত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই গৃহীত হয়েছিল এবং ক্রয়নীতি অনুযায়ী উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার জন্য দরপত্র ডাকাসহ যথাযথ নীতি অনুসরণের জন্য পর্যাপ্ত সময়ও হাতে ছিল। অথচ প্রায় সাত মাস সময় পার করে নির্ধারিত সময়সীমার তিন সপ্তাহ আগে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি বেছে নিয়ে সরকারি ক্রয় বিধিমালার ৭৬(১) ও ৭৬(২) ধারাকে পাশ কাটানো হয়েছে। যেখানে বলা আছে, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির ব্যবহার কোনোভাবেই অবাধ প্রতিযোগিতা এড়াতে বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শনের জন্য করা যাবে না এবং এই পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় এর প্রয়োগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের প্রক্রিয়াটি কোনো বিশেষায়িত প্রকল্প নয়; উল্লেখ করে টিআইবি বলছে, ‘এই প্রকল্পে বিদ্যুৎ ও যান্ত্রিক (ইএম) এবং পূর্ত খাতের প্রায় ১১১ কোটি টাকার কাজ পূর্বেই নির্দিষ্ট হওয়া দুটি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি দেওয়া হয়েছে। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার যে মানদণ্ড থাকা উচিত, তা এই প্রক্রিয়ায় গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে।'

এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কোন যুক্তিতে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে? কি কি যোগ্যতা বিবেচনা সাপেক্ষে এই প্রকল্পের জন্য উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানদ্বয় নির্বাচিত হলো তা অদ্যাবধি জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি।

নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে বিতর্ক

বিতর্ক যেন পিছুই ছাড়ছে না জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের। সম্প্রতি, এই জাদুঘরের ৯৬ জন কর্মকর্তা, কর্মচারী নিয়োগে তড়িঘড়ি, অনিয়ম এবং স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করার পায়তারা, প্রবিধানমালা লঙ্ঘন করে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধু মৌখিক পরীক্ষায় নিয়োগ, স্বল্প সময়ে আবেদন গ্রহণ (জানুয়ারি ২৯ - ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬) এবং নিয়োগ কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত সকল নিয়োগই স্থগিত করা হয়। 

এই বিষয়ে দ্য ফিন্যান্স টুডের বিশেষ অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সকল সরকারি চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে টেলিটকের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করতে হয়। অথচ জুলাই জাদুঘর কর্তৃপক্ষ অনলাইনে গুগল ফর্মে নিয়োগের আবেদন নিয়েছে কোন ফি ছাড়াই। আবেদন করার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৭ দিন। এছাড়া, চাকরি প্রবিধানমালা ২০২৫ অনুযায়ী, লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও, ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের পদের জন্য শুধু মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

অন্যদিকে, নিয়োগ কমিটির প্রধান হিসেবে উপসচিব বা যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা থাকার নিয়ম থাকলেও এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব এবং অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগের চেষ্টার অভিযোগ উঠে।

নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে এসব বিতর্কিত ঘটনা প্রকাশ হতেই প্রশাসনে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে, জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বিতর্ক এড়াতে ১০ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ায় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে বলে গনমাধ্যমকে অবহিত করে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘লিখিত পরীক্ষার বিধান থাকলে অবশ্যই সে অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে হবে। প্রবিধানে না থাকলে রাষ্ট্রপতিও সেটি প্রমার্জন করতে পারেন না। এরপরও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে বৈধতা নিয়ে তারা প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন। যারা নিয়োগ দেবেন তারাও জবাবদিহির আওতায় আসবেন।’

তিনি আরও বলেন, ষষ্ঠ গ্রেড শীর্ষ পর্যায়ের পদ। এই পদে লিখিত পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ দেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক হবে না। মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে কোনো প্রমাণ থাকবে না। স্বজনপ্রীতির সুযোগ থাকবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, "ষষ্ঠ গ্রেড পদ রাজস্ব খাতে সৃষ্ট। রাজস্ব পদে লিখিত পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ দেওয়া প্রশাসনিক রীতির পরিপন্থী এবং এতে ভবিষ্যতে নিয়োগ বাতিলের ঝুঁকি থাকে।"

তার মতে, "শুধুমাত্র ভাইভা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পদ্ধতি নয়, বিশেষ করে প্রথম শ্রেণির পদের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা বাদ দেওয়া স্বাভাবিক নয়। এতে নিয়োগের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।"

টিকিটের মূল্য নির্ধারণেও বিতর্ক

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের প্রস্তাবিত প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ১০০ টাকা (বাংলাদেশী) এবং শিশুদের জন্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের (২০ টাকা) তুলনায় ৫ গুণ বেশি। শুধু দেশিই নয়, জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর দেখতে বিদেশি নাগরকিদের জন্যও কয়েক গুণ বেশি ফি প্রস্তাব করা হয়েছে।

সূত্রমতে, সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ৫০০ টাকা এবং অন্য বিদেশি নাগরিকদের জন্য ২ হাজার টাকা টিকিটের মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ, বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরের সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের ৩০০ টাকা ও অন্য বিদেশিদের টিকিটের মূল্য ৫০০ টাকা।

জাদুঘরে প্রবেশে টিকিটের এই অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণকে কেন্দ্র করে এরইমধ্যে জনমনে বিষ্ময়, হতাশা, নেতিবাচক ধারণা ও চেতনা বিক্রি বা বানিজ্য ঘিরে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এই উচ্চ মূল্য নির্ধারণের পরিবর্তে টিকিটের দাম কমানো বা বিনামূল্যে প্রবেশের দাবি করেছে একাধিক মহল।

এই বিষযে জানতে চাইলে জুলাই আন্দোলন থেকে গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও সহশিক্ষা সম্পাদক মাহাবুব আলম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি ধারণা দিতে প্রবেশ ফি পুরোপুরি ‘ফ্রি’ করে দেওয়া উচিত ছিল। তা না করে, জাতীয় জাদুঘরের তুলনায় বেশি ফি করা কোনোভাবেই উচিত হয়নি।

প্রবেশ ফি'র বিষয়টি নিয়ে তাদের পার্টির বর্ধিত সভায় আলোচনা সাপেক্ষে সংসদ অধিবেশনে টিকিটের মূল্য পুনঃনির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হবে বলেও জানান এই এনসিপি নেতা।

জাদুঘর উদ্বোধন ঘিরে সংশয়

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের সবকিছুই নাকি প্রস্তুত। সংগ্রহ করা হয়েছে লাশ বহনকারী রিকশা থেকে শুরু করে শহীদদের রক্তমাখা জামা-কাপড়সহ ব্যবহার্য জিনিসপত্র। গণভবনের পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে শত শত প্রতীকী কবর। আচমকা কেউ দেখলে মনে হবে এ যেন কোনও এক কবরস্থান। প্রকল্প সংশ্লিষ্টসহ ইউনূস সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিজে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে শহীদদের ব্যবহার্য এসব জিনিসপত্র সংগ্রহ করেছেন। ড. ইউনূসের আমলে কয়েকবার এই জাদুঘরটি খুলে দেওয়ার তারিখ চূড়ান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাদুঘর খুলবে কবে তা কেউই জানে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস প্রকল্পটি একাধিকবার পরিদর্শন করেন। বিদেশিদেরও পুরো গণভবন এলাকা ঘুরিয়ে দেখান তিনি। নিজে উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলাদাভাবেও দেখেছেন। বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের বলতেন যে, অবিলম্বে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে এই জাদুঘর। তারপরও ১৮ মাসের শাসনামলে তৈরি করা জুলাই স্মৃতি জাদুঘরটি তিনি সবার জন্য উন্মুক্ত করে যেতে পারেননি।

সূত্র জানিয়েছে, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কেউই জানেন না কবে খুলে দেওয়া হবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। এই সংক্রান্ত কোনও বার্তা নাই তাদের কাছে। ২০২৫ সালের ১ জুন তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসেই অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট জাদুঘরটি চালু করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেইদিনও জাদুঘরটি চালু করা সম্ভবপর হয়নি।

এদিকে, নতুন সরকারের সংশ্লিষ্টরাও জানেন না কবে উন্মুক্ত করা হবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই ‘কিছু কাজ বাকি আছে’ জানানো হলেও কী কাজ বাকি আছে, তা জানাচ্ছেন না কেউ। দ্রুতই খুলে দেওয়া হবে বলা হলেও আদতে কবে হবে সেই বিষয়ে সন্দিহান সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিরা।

জাদুঘর উদ্বোধনের বিষয়ে জানতে চেয়ে প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী এম এ সাত্তারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

অন্যদিকে, এই বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর কবে নাগাদ খুলে দেওয়া হবে, সেটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এর কারণ হিসেবে কিছু কাজ বাকি আছে, মূলত সেজন্যই দেরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। কী কাজ বাকি আছে, সেই ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করে বলেন যে, চলতি বছরের মধ্যে উদ্বোধনের সম্ভাবনা আছে তবে মাস বা তারিখ এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।

তবে, জুলাই জাদুঘর সর্বস্তরের মানুষের জন্য খুলে দেওয়ার বিষয়ে বর্তমান সরকারের শীর্ষ নেতাদের অনেকটাই অনীহা রয়েছে বলে জানা গেলেও এর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সার্বিক বিবেচনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের একাধিক মহল ও বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, ন্যায্যতার ভিত্তিতে বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ১৭ মাস দেশ শাসন করা সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কার্যত প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যাপক বৈষম্য, অন্যায্যতা ও পক্ষপাতমূলক পদক্ষেপ গ্রহন করেছে যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রকল্প।


Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman

Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81