June 6, 2026, 1:37 pm


সালাহউদ্দিন মিঠু

Published:
2026-06-06 12:12:37 BdST

বিশ্ব পরিবেশ দিবস"পৃথিবী বাঁচাও, ভবিষ্যৎ বাঁচাও"


প্রতি বছর ৫ জুন সারা বিশ্বে পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭৩ সাল থেকে 'জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি' (ইউএনইপি) এই দিনটি পালন করে আসছে।

২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের বৈশ্বিক আয়োজক দেশ আজারবাইজান এবং এবারের পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে "প্রকৃতির অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।"

এবারের দিবসটিতে মূল মনোযোগ দেওয়া হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের জরুরি সংকেতসমূহ বোঝা এবং বিশ্বজুড়ে টেকসই জলবায়ু পদক্ষেপের ওপর।

দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন আজ বৈশ্বিক বাস্তবতা। এর বিরূপ প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা দেশের জনজীবন, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’

তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।’

অন্যদিকে বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষিকে টেকসই, আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু ভিত্তিতে পুনর্গঠনের জন্য সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) ও জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ও দূরদর্শী নীতি কাঠামো অনুসরণ করছে।’

সামগ্রিক বিবেচনায় পৃথিবী আজ এক কঠিন সময় পার করছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের ভূমিকা নগণ্য হলেও পরিবেশ ধ্বংস ও দূষণের ক্ষেত্রে একেবারে প্রথম কাতারে। জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের ভূমিকা কম হলেও পরিবেশ সংরক্ষণে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

পরিবেশ সংরক্ষণে দায়িত্ব অবহেলার কারণে ঢাকা শহর পৃথিবীর অন্যতম দূষিত স্থান। ঢাকাসহ দেশের যতগুলো জলাভূমি আছে তার প্রায় সবগুলোই চূড়ান্ত দূষণ মাত্রায় রয়েছে। খাল, নদী, নর্দমা যেন ময়লার ভাগাড় ও শিল্প বর্জ্যের নিরাপদ ডাম্পিং গ্রাউন্ড। বুড়িগঙ্গা, তুরাগের মতো নদী শিল্পবর্জ্য আর ময়লায় মৃতপ্রায়। খাল, নদী, পাহাড় কাটা, জলাভূমি ভরাট ও বনভূমি ধ্বংস করে আমাদের প্রেক্ষাপটে পরিবেশ বিপর্যয় স্বাভাবিক ঘটনা। নির্বিচারে বন কাটার ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে, ঋতুর ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ইটভাটার দূষণ, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শব্দযন্ত্রের যথেচ্ছাচার ব্যবহার, অপরিকল্পিত দালানকোঠা ও অবকাঠামো তৈরি পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনছে। সবচেয়ে ভয়ংকর সমস্যা প্লাস্টিক। একটা প্লাস্টিকের বোতল মাটিতে মিশতে ৪৫০ বছর লাগে। সমুদ্রের কচ্ছপ, পাখি প্লাস্টিক খেয়ে মারা যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, নদীভাঙন হচ্ছে, বন্যা আর খরা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করেছেন—এখনই পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে অনেক উপকূলীয় এলাকা পানির নিচে চলে যাবে।

কিন্তু সমাধান অসম্ভব না। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় “প্রকৃতিকে শোষণ নয়, লালন করতে হবে”। ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, অপচনশীল বর্জ্য সঠিক স্থানে ফেলা, বেশি বেশি গাছ লাগানো এবং পানির অপচয় রোধ করার মাধ্যমে আমরা পরিবেশ দিবসের প্রতি সম্মান জানাতে পারি। আমাদের এই ছোট ছোট কাজই বড় পরিবর্তন আনবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশের উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্বনেতা ও সরকারের উচিৎ কার্যকর আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা। এক্ষেত্রে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকাও অপরিসীম। নদী দখলমুক্ত করা, শিল্পকারখানার বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বাধ্যতামূলক করা, সবুজায়ন বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। 

এছাড়া, বিশ্বের সকল দেশ, সরকার, ও সাধারণ নাগরিককে পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা প্রয়োজন। মানুষ যাতে পৃথিবীর বুকে অন্য সমস্ত জীব ও প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে এক সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে, সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল। ঘূর্ণিঝড় থেকে উপকূলকে রক্ষা করে এই বন। তাই সুন্দরবন ও দেশের অন্যান্য বনভূমি রক্ষা এখন সময়ের দাবি। বছরে অন্তত একটি গাছ লাগানো এবং তার যত্ন নেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

পরিশেষে বলব, পরিবেশ দিবস মানে শুধু ৫ জুন র‍্যালি আর সেমিনার না। এটি একটি অঙ্গীকারের দিন। প্রত্যেক বিবেকবান ও সচেতন নাগরিকের অঙ্গীকার—আমি আমার পৃথিবীকে ভালো রাখব। কারণ মানুষের জন্য পরিবেশ, পরিবেশের জন্য মানুষ নয়। “পৃথিবী আছে বলেই আমরা আছি”। তাই আসুন, আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটি করে গাছ লাগাই, একটি প্লাস্টিক কম ব্যবহার করি। আমাদের এই ছোট ছোট পদক্ষেপই পারে পৃথিবীকে বাঁচাতে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.