April 8, 2026, 5:02 am


Staff reporter

Published:
2026-04-07 17:25:01 BdST

জোড়াতালির সমাধানে সময় ও অর্থের অযাচিত অপচয়আবারও সংসদে শব্দ বিভ্রাট; দায়ী কে?


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশন শুরুর পর থেকেই সংসদে সাউন্ড সিস্টেম বিভ্রাট পুরো সংসদের কার্যক্রমকেই ক্ষতিগ্রস্থ করছে। জুলাই আন্দোলনের পর পুরো সংসদ ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সংসদ ভবনের মূল গ্যালারীতে প্রবেশ করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, আসবাবপত্র, স্থাপনা ও সংসদ কার্যক্রম পরিচালনা করার যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্থ করে উৎসুক জনতা। পরবর্তীতে, সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সেগুলো পুনঃনির্মাণ, পুনঃস্থাপন ও মেরামতের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

তথ্যসূত্র বলছে, সংসদ ভবনের মূল গ্যালারী যে পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তা পুনরায় সচল ও মেরামত করতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, যথাযথ কর্তৃপক্ষ সেই পরিমাণ বরাদ্দ পায়নি।

দায় কার?

গত সোমবার জাতীয় সংসরে অধিবেশন চলাকালে পুরো সাউন্ড সিস্টেম প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে অধিবেশনের শুফুর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। জাতীয় সংসদের মত গুরুত্বপূর্ণ স্থানেই যদি প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও  তার রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করা না যায় তাহলে দেশের প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এই চিত্র রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সকল প্রতিষ্ঠানেই বিরাজমান।

আরও পড়ুন: সংসদে ‘৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার’ সাউন্ড সিস্টেম অচল, পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ

সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম বিভ্রাট নিয়ে এখন বিব্রত স্ংসদ সচিবালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। বারবার সাউন্ড সিস্টেম কার্যক্রম অচল, ইতোপূর্বে হেডফোন কেলেঙ্কারির রেশ কাটতে না কাটতেই সাউন্ড সিস্টেম বিভ্রাট সংকটের নতুনমাত্রা যুক্ত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় সংসদ ভবনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থানে কেন জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করা হলো। সবকিছু তো আর জোড়াতালি দেয়া সম্ভব না। এখন তো পুরো সাউন্ড সিস্টেমই বদলে ফেলতে হবে। তাহলে ইতোপূর্বে যে পরিমাণ অর্থ ও সময় অপচয় হলো এর দায়ভার কে নেবে?

একাধিক সূত্রমতে, অধিদপ্তরের ভিতর পর্যাপ্ত হাইটেক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার মত জনবলের মারাত্মক সংকট রয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ইতোমধ্যে এই বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্বীকারও করেছেন। তাহলে বিকল্প উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

প্রযুক্তিতে পিছিয়ে গনপূর্তের ই-এম বিভাগ

এবার পর্যালোচনা করা যাক গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই-এম বিভাগ নিয়ে। ই-এম বিভাগ সর্বদাই প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত। যেভাবে দিন দিন হাইটেক প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হচ্ছে সেভাবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মরত প্রকৌশলীগণ আধুনিক হচ্ছেন না।

প্রযুক্তির ব্যবহারে দুর্বলতার কারণে ঠিকাদারগণ যা বুঝিয়ে দিচ্ছে তাতেই বাধ্য হয়ে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর গিলছেন প্রকৌশলীরা। কারণ কোনও প্রকৌশলীই নিজের সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতা স্বীকার করবেন না। জাতীয় সংসদের মত গুরুত্বপূর্ণ স্থানেই যদি প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও  তার রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করা না যায় তাহলে দেশের প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এই চিত্র রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সকল প্রতিষ্ঠানেই বিরাজমান।

সংসদ ভবন কি আদৌ সুরক্ষিত?

এবার দৃষ্টি ফেরানো দরকার জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে। সামগ্রিক বিবেচনায়  সংসদ ভবন এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের শিথিলতার কারণেই গনপূর্তের গোডাউন থেকে কোটি কোটি টাকার তামার বার চুরি হয়ে যায়। এই তামার বার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিলো ই-এম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলীর। কিন্তু তারা এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণও করতে পারেননি, একইসঙ্গে চুরি হওয়াও ঠেকাতে পারেননি।অথচ এই দুই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আমলনামায় কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য উঠে এসেছে। উক্ত সম্পদের উৎস কোথায়? সংসদের মত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় চুরি করতেও কি বুক কাঁপেনি?

গুরু পাপের লঘু দন্ড

 

সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলী—অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল হক চৌধুরী, গণপূর্ত ইএম বিভাগ-৭ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেন, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম।

 

তবে, এই ঘটনায় সাথে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন ও উপসহকারী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিনকে শুধু চাকুরী থেকে অন্য স্থানে বদলী করেই দায় সেরেছে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর।

সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও শব্দ বিভ্রাটের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে যে, বারংবার একই ধরনের সমস্যা ঘটলেও কেন যথাযথ তদারকি এবং ঘটনার সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সংসদ সচিবালয় থেকে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে, দুদকের সংশ্লিষ্ট একটি বিভাগ এই বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করছে বলে জানা গেছে।

সরকারি চাকুরী এমন একটি সোনার হরিন যা একবার পেয়ে গেলেকত  শত অপরাধ করলেও চাকুরী খোয়াতে হবে না। দিনের পর দিন হয় চাকুরী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলী অথবা প্রবীন কার্যালয়ে সংযুক্তি করেই দায় শেষ করছে যথাযথ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে রয়েছে শত শত টেন্ডার দুর্নীতি ও অনিয়মের মত গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ। প্রত্যেক প্রকৌশলীর রয়েছে নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদের পাহাড়।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় দেশের বহুল জনপ্রিয় দ্য ফিন্যান্স টুডে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এসবকালো বিড়ালদের মুখোশ ইতোপূর্বে উন্মোচন করেছে। যতটুকু শোনা যাচ্ছে সংসদ ভবনের কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত আরো কয়েকজন কর্মকর্তা শাস্তির আওতায় আসতে পারে। তবে, শাস্তির মাত্রা কেমন হতে পারে সেটি সকলের কাছেই অনুমেয়।

ইতোমধ্যে ই-এম বিভাগের একজন দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী যিনি ই-এম বিভাগের শীর্ষ পদে আসীন রয়েছে, তিনি সংসদ এলাকায় পদ পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে উক্ত কর্মকর্তা প্রধান কার্যালয় কর্মরত আছে। সংসদ ভবনের সাথে সম্পৃক্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী; এদের প্রত্যেকের আমলনামা ও দুর্নীতির চিত্র ভয়াবহ। এদের কারও নামে-বেনামে শত কোটি টাকার সম্পদেরও তালিকা রয়েছে দ্য ফিন্যান্স টুডের হাতে। যা আমাদের পূর্বেকার একাধিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। শুধু তাই নয় প্রধান কার্য়ালয়ের অর্থাৎ অধিদপ্তরের ই-এম বিভাগের শীর্ষ একজন প্রকৌশলী যিনি সংসদ বিভাগের বদলী হওয়ার জন্য যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে হয়তো তিনি  সফলও হবেন। তার  হাতে রয়েছে অবৈধ শত  কোটি টাকা। চাকুরী জীবনের বাকী সময়টায় বদলী হয়ে মহালুটপাটের পরিকল্পনাও রেখেছে।

বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। কিন্তু সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আছে দুর্নীতি। গণমাধ্যমে এঈ বিষয়দ নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি হলেও বাস্তবিকঅর্থে দুর্নীতিবাজরা এখনও শাস্তির আওতায় আসেনি। জাতীয় সংসদ ভবন ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তা নিয়োগ প্রদানে দুর্নীতি কমে আসবে ও দপ্তরগুলো থাকবে সুরক্ষিত।

জাতীয় সংসদের স্পিকার সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে পুরো সাউন্ড সিস্টেম প্রক্রিয়া নতুন করে সেটআপ করার কথাও বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই-এম বিভাগ-৭ এর আওতাধীন সংসদ ভবন ও সংসদ সচিবালয়। 

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.