32834

05/04/2026

দুই দিনে ১৫২ চাঁদাবাজ গ্রেপ্তার: ডিএমপি কমিশনার

সামিউর রহমান লিপু | Published: 2026-05-04 04:26:41

রাজধানীতে চলমান সাঁড়াশি অভিযানে গত ৪৮ ঘণ্টায় ১৫২ জন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। আটককৃতদের মধ্যে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ৫৮ জন এবং ৯৪ জন তাদের সহযোগী। এই অপরাধীদের বিভিন্ন মামলায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে থানা পুলিশ, ডিবি এবং সিটিটিসি টিম বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চিহ্নিত এসব চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার করে। এসময় তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের খাতা, লেনদেনের তথ্য, ভিডিও ক্লিপসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। 

১ মে থেকে মহানগরজুড়ে চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি, অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এবং অনলাইন জুয়া চক্রের বিরুদ্ধে এই বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব অপরাধের অভিযোগ বাড়ায় ডিএমপির সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে চিহ্নিত অপরাধপ্রবণ এলাকায় ব্লক রেইড পরিচালনা করা হচ্ছে।

গোয়েন্দা নজরদারি ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধীদের পালানোর পথ বন্ধ করতে আট বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন।

আজ রোববার (৩ মে) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)-র ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার। 

তিনি বলেন, "তদবিরের মাধ্যমে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। চাঁদাবাজসহ অপরাধীদের ছাড়াতে কেউ তদবির করলে ধরে নেওয়া হবে সেও ওই চক্রের সঙ্গে জড়িত। কোনো অবস্থাতেই তদবিরে কাউকে ছাড়া হবে না। অপরাধীর পরিচয় আমাদের কাছে মুখ্য নয়, তিনি যত বড়ই হোন না কেন, আইনের আওতায় আনা হবে।” 

তিনি আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটাই, অপরাধীদের মূল উৎপাটন, নাগরিক জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং ঢাকা মহানগরকে আরও নিরাপদ নগরীতে পরিণত করা।

যৌথ নজরদারি 

ডিবি ও সিটিটিসি সাদা পোশাকের সদস্য, সাইবার মনিটরিং টিম এবং আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার।

বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, গত কয়েক মাস যাবৎ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিজস্ব সোর্সের দেওয়া তথ্য, এলাকাবাসীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং থানা পুলিশের কাছে থাকা তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে একটি পূর্নাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করেছেন।  এছাড়া, ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালিয়ে বিভিন্ন এলাকার নির্মাণাধীন ভবন, কাঁচাবাজার, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস কারখানা ও রাস্তার ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করেন এবং সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছেন গোয়েন্দারা।

শীর্ষ সন্ত্রাসী

সম্প্রতি, আন্ডারওয়ার্ল্ডের একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিনে মুক্তি এবং পরবর্তীতে তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং কয়েকজনের হত্যার বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, বর্তমানে শীর্ষ পর্যায়ের সন্ত্রাসীদের অস্তিত্ব না থাকলেও মাঝারি পর্যায়ের কিছু সন্ত্রাসী অন্যদের নাম ভাঙিয়ে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। 

তিনি বলেন, আধিপত্য বিস্তারে তারা নিজেরাই হয়তো মারামারি করে, কিন্তু জনগণের উপরে আক্রমণটা তেমন একটা নেই। তারপরও আমরা তাদেরকে দমনে অনলাইন নজরদারি এবং মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করেছি।

মাদকবিরোধী অভিযান 

মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শনিবার (২ মে) ৮০ কেজি গাঁজা উদ্ধারসহ এক সপ্তাহে বেশকিছু মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। অতীতে, স্বল্প পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার, বড় মাদক ব্যবসায়ী বা ছোট ছোট বিক্রেতা বা মাদকসেবীদের গ্রেফতার করা হতো। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে বড় বড় মাদকের চালান জব্দ করা হয়েছে বা উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চলমান সাড়াশি অভিযানে সক্রিয় মাদক কারবারীদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের পেছনে গডফাদার কারা আছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে মানি লন্ডারিংসহ অন্যান্য মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে।

ক্যাম্প স্থাপন

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার মো সরওয়ার বলেন, বসিলায় ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটা ক্যাম্প দেওয়া হয়েছে। যেখানে এপিবিএনের ৬৬ জন সদস্য আছেন। তাদের দিয়ে দিনে রাতে যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় ব্লকরেইড দেওয়া হচ্ছে। মোহাম্মদপুরে আরও দুইটি ক্যাম্প আছে। মোহাম্মদপুরে একটা থানা স্থাপনের জন্য আমরা প্রস্তাব রেডি করছি, রায়েরবাজার থানা স্থাপনের প্রস্তাব অলরেডি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, নতুন নতুন এলাকা চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে আরও পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে, মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, বাজার, সড়ক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন করে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার কাজ চলমান। যাতে দ্রুত আসামি শনাক্ত এবং অপরাধীদের প্রতিরোধ করা যায়।

কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স

অপরাধ দমনে পুলিশের চলমান সাড়াশি অভিযানের গোপন তথ্য যারা ফাঁস করে দিচ্ছেন, সেই সব অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন ভারপ্রাপ্ত ডিএমপি কমিশনার।

তিনি বলেন, অপরাধ দমন না করে উল্টো সন্ত্রাসী, চিহ্নিত অস্ত্র ব্যবসায়ী, মাদক ব্যবসায়ী, জুয়ার সাথে সম্পৃক্ত অপরাধীদের সাথে সখ্যতা বা যোগসাজশকারী স্থানীয় থানা পুলিশের সদস্যদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই অভিযানে তাদের কর্মকাণ্ডের উপরও গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। দায়িত্বে অবহেলা করলে কোন ছাড় দেয়া হবে না।

নিরাপত্তা জোরদার 

ডিএমপি কমিশনার বলেন, রাজধানী ঢাকার নিরাপত্তা আরও সুসংহত করতে আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনায় ডিএমপি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা এবং মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, বাজার, সড়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন করে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে, যাতে দ্রুত অপরাধী শনাক্ত ও অপরাধ প্রতিরোধ সম্ভব হয়।

তিনি আরও বলেন, এছাড়াও আগামী দিনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমরা রাজধানীব্যাপী আরও জোরালো, তথ্যভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবো। এছাড়াও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে হটস্পটভিত্তিক নজরদারি বৃদ্ধি, মাদক নির্মূলে নিয়মিত ব্লক রেইড ও বিশেষ চেকপোস্ট স্থাপন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে গোয়েন্দা তৎপরতা সম্প্রসারণ, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংসে সমন্বিত অপারেশন চালানো। সাইবার প্রতারণা ও অনলাইন জুয়া দমনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং ও জনসম্পৃক্ততা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।

ডিএমপি’র ভারপ্রাপ্ত কমিশনার আরও বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম, মাইকিং, লিফলেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

সন্দেহজনক ব্যক্তি, চাঁদাবাজ, মাদক বা অনলাইন জুয়া বা প্রতারণা সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করতে জনসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধী যেই হোক, তার পরিচয় বা প্রভাব বিবেচ্য নয়। তাকে আইনের আওতায় আসতেই হবে। চাঁদাবাজ, মাদক কারবারী, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, অনলাইন জুয়া এবং প্রতারণাকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। 

প্রেস ব্রিফিংয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম এবং অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।


Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman

Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81