January 29, 2026, 10:15 pm


মোস্তফা কামাল আকন্দ

Published:
2026-01-29 20:08:17 BdST

ভোলার উন্নয়নে জাতীয় সংলাপ: “টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য”


সুষ্ঠু নির্বাচন, ভোলা জেলার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্থানীয় উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা ঐক্যমতে পৌঁছেছেন।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী বক্তারা জানান, ভোলার উন্নয়ন শুধুমাত্র রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি নয়, বরং কার্যকর পরিকল্পনা ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্ভব।

আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) কোস্ট সেন্টারের ভোলা কার্যালয়ে “সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোলার উন্নয়নে আমাদের ভাবনা” শীর্ষক জাতীয় সংলাপে বক্তারা এই কথা বলেন।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশন এবং বণিক বার্তার যৌথ আয়োজনে এই জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক (প্রশাসন) মোস্তফা কামাল আকন্দ।

সংলাপে স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রার্থী, রাজনৈতিক নেতা, গণমাধ্যমকর্মী, এবং এনজিও প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা দ্বীপ জেলা ভোলার ভূমি ও খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, যোগাযোগ, মৎস্য সংরক্ষণ এবং চরাঞ্চলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিয়ে অঙ্গীকার করেন।

কোস্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক (প্রশাসন) মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, “জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এই সংলাপের আয়োজন করেছি। কোস্ট ফাউন্ডেশন জন্মেছে ভোলার চরফ্যাশন থেকে। সেই শিকড়ের টান থেকেই আমরা চাই, ভোলার ভাবনাগুলো নির্বাচনী প্রার্থীদের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে পৌঁছাক এবং এটি অন্য নির্বাচনী এলাকার জন্য মডেল হয়ে উঠুক।”

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনকালীন প্রচারণার বাইরে দূরদূরান্ত থেকে যারা এখানে উপস্থিত হয়েছেন—ভোলা-১, ভোলা-২ ও ভোলা-৩ ও ৪ আসনের প্রার্থীদের—তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, “আমাদের প্রধান দাবিগুলো হলো—ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে স্থায়ী সেতু নির্মান। এটি ভোলাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। দ্বিতীয়ত, ইলিশ রক্ষা ও উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন। কোস্ট ফাউন্ডেশন ১৯৯৮ সাল থেকে খাস জমি ও ভূমি বন্দোবস্তের জন্য ধারাবাহিক আন্দোলন চালাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রসারে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। আমাদের লক্ষ্য ভোলায় অন্তত ১,০০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন করা। এছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারে ভূমিদস্যুতা, জলদস্যুতা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ও বনায়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি।”

কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “ভোলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বাংলাদেশের মোট ইলিশের প্রায় ৩০ শতাংশ সরবরাহ হয়ে থাকে ভোলা থেকে। জাটকা নিধন বন্ধ করলে ইলিশের বাজার মূল্য কয়েক মাসে ৫০০ টাকা থেকে ২–৩ হাজার টাকায় পৌঁছানো সম্ভব, যা জেলে ও ব্যবসায়ীর উভয়ের জন্য লাভজনক।
খুব দ্রুত পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল না হলেও একটি এয়ারপোর্ট স্থাপন করা যেতে পারে, যা জরুরি রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করবে। এছাড়া ভোলার প্রায় এক লাখ একর রিজার্ভ ফরেস্ট সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এটি না হলে ভবিষ্যতে জনবসতি ও কৃষি সম্ভাবনা নষ্ট হতে পারে।”

ভোলা-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, “আমি একজন নতুন রাজনৈতিক কর্মী এবং এখানকার সন্তান। চরাঞ্চলের মানুষ চরম দারিদ্রতার মধ্যেও জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা চায়। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থায়ী বেড়িবাধ ও রাস্তা নির্মান, বিদ্যুৎ সরবরাহ,শিক্ষার উন্নয়ন, মাদক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। তাদের জীবনের বাস্তবতা বোঝা গেলে, ভোট চাওয়া কষ্ট হলেও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। নির্বাচিত হলে এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার লড়াই এর সাথে যুক্ত হওয়া হবে আমার রাজনীতিক ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।”

ভোলা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মো: নজরুল ইসলাম বলেন, “এখন পর্যন্ত ভোলায় কোনো বড় ধরনের নির্বাচনী হুমকি নেই। নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিবাচক মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি প্রার্থীর সুষ্ঠু আচরণ নির্বাচনকে স্বচ্ছ রাখবে। নারী-পুরুষ সবাই যেন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।”

ভোলা জেলা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক আমিরুল ইসলাম বাসেত বলেন, “ আজকের আলোচনায় চরাঞ্চলের বাস্তবতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের লোভ না থাকলে চরগুলোর দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব। শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রান্তিক বাস্তবতা—ছেলেদের অনেকে মাদক সেবন ও শিশুশ্রমে জড়িত, মেয়েরা শিক্ষায় পিছিয়ে আছে—এটি আমাদের দেশের নির্মম বাস্তবতা।”

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “চরাঞ্চল মাছের প্রাকৃতিক ব্রিডিং গ্রাউন্ড। অবৈধ জাল ব্যবহারে প্রায় ৯০ শতাংশ মাছ ধ্বংস হয়। জেলেদের কার্ড ও বরাদ্দ সঠিকভাবে বিতরণ করা জরুরি, যাতে প্রকৃত জেলেরা লাভবান হয়। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে এখাত জিম্মি। শুধুমাত্র মৎস্য সংরক্ষণের মাধ্যমে বাস্তব উন্নয়নের পথ খুলতে পারে ।”

ভোলা জেলা সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা সুফল রায় বলেন, “ভোলা জেলায় ১লাখ ৮০ হাজার একর বনভূমি রয়েছে এবং ৯৪ হাজার ২৩৬ একর সংরক্ষিত বন রয়েছে। বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী, ইকোপার্ক ও ম্যানগ্রোভ বাগান সংরক্ষণে জনবল সীমিত। ভূমিতে যত্রতত্র মহিষ চরার কারণে বনাঞ্চলের ক্ষতি হচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন।”

ভোলা-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী মো: হাফিজ ইব্রাহিম বলেন, “ভোলার প্রধান সমস্যা কর্মসংস্থান। গ্যাস থাকলেও শিল্প-কারখানা নেই। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এলাকা পরিদর্শন করেছেন। বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার কারখানা ও হাসপাতাল স্থাপন করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে তারা ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। নির্বাচিত হলে চর ও নদীভূমি প্রকৃত মালিকের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গ্যাসভিত্তিক শিল্প, বিদ্যুৎ, ইপিজেড স্থাপন এবং ভোলা–বরিশাল সেতু নির্মান ভোলার উন্নয়নের চাবিকাঠি।”

ভোলা-১ আসনের জাতীয় পার্টি প্রার্থী আকবর হোসেন নয়ন বলেন, “ভোলার মানুষ গ্যাস, মেডিকেল কলেজ ও উন্নত শিক্ষা চায়। আমি যদি নির্বাচিত হই তাহলে দরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং স্থানীয়ভাবে মামলা-জট মীমাংসা করা—এসবই অগ্রাধিকার পাবে।”

ভোলা-৩ আসনের গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী আবু তৈয়ব বলেন, “নির্বাচিত হলে তারুণ্য নির্ভর ভোলা গড়তে চাই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন ভোলা বাসীর প্রাণের দাবি।”

ভোলা-১ আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী ওবায়েদুর রহমান বলেন, “ভোলার তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ রক্ষা, নদী ভাঙন থেকে রক্ষা, সুষ্ঠু বরাদ্দ এবং গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন—এগুলো হবে আমাদের অগ্রাধিকার।”

ভোলা-৩ আসনের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির প্রার্থী নিজামুল হক বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচিত হলে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে কাজ করবেন এমনটাই প্রত্যাশা করছি।”

ভোলা-৩ আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী মোসলে উদ্দিন বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রার্থীদের পবিত্র ও সচ্ছ মানসিকতা প্রয়োজন। নির্বাচিত হলে প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করব। চট্টগ্রাম–ভোলা ফেরিঘাটে সন্ত্রাস রোধে অবদান রাখতে চায়।”

ভোলা-২ আসনের জাতীয় পার্টি প্রার্থী এডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম রিন্টু বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং প্রার্থীদের সহনশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচিত হলে পর্যটন, কারিগরি শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ভোলা বাসীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করব।”

সংলাপের শেষ পর্যায়ে আমন্ত্রিত অতিথিদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে কোস্ট ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য মোবাশ্বের উল্লাহ চৌধুরী বলেন, “নির্বাচিত না হলেও মানুষের উন্নয়নে অনেক কাজ করা সম্ভব। সমস্যা সমাধানে যৌক্তিক প্রতিশ্রুতি দিন। ঘোষণাকৃত ২৫০ শয্যা হাসপাতালের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করুন। চর জাগার পর দখল না করে ভূমির মালিককে জমি ফিরিয়ে দিন। প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।”

সংলাপের মাধ্যমে ভোলার উন্নয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য ও টেকসই পরিকল্পনার অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার প্রসার, যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, মাছ সংরক্ষণ ও বন সংরক্ষণ—এগুলোকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ নীতিমালা প্রণয়নে সহায়ক হবে এই সংলাপ।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.