নিজস্ব প্রতিবেদক
Published:2026-02-02 14:29:13 BdST
মাস্ক থেকে ট্রাম্প, এপস্টেইন ফাইলে ক্ষমতাধর পুরুষদের দীর্ঘ তালিকা
জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত কয়েক হাজার পৃষ্ঠার গোপন নথি প্রকাশ করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। এরপর বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী মহলে শুরু হয়েছে তোলপাড়। এই নথিতে টেক জায়ান্ট থেকে শুরু করে ওয়াল স্ট্রিটের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের নাম ওঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সকলেই এপস্টেইনের যৌন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করলেও নথিপত্রগুলো দেখাচ্ছে যে, এপস্টেইনের অন্ধকার জগত সম্পর্কে জানার পরেও অনেকেই তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব বজায় রেখেছিলেন। খবর এপি।
নথিতে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি হলো ব্রিটেনের সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু। অভিযোগ রয়েছে, ভার্জিনিয়া রবার্টস জিউফ্রে যখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন, তখন এপস্টেইন তাকে অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌনকর্মে বাধ্য করেছিলেন। যদিও প্রিন্স অ্যান্ড্রু বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে এই বিতর্কের জেরে তার রাজকীয় উপাধি কেড়ে নেয়া হয়। নতুন নথিতে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত ইমেইলে অ্যান্ড্রুর নাম শত শত বার এসেছে, যার মধ্যে বাকিংহাম প্যালেসে নৈশভোজের আমন্ত্রণ এবং অ্যান্ড্রুর জন্য রুশ তরুণী পাঠানোর প্রস্তাবও রয়েছে। অ্যান্ড্রুর প্রাক্তন স্ত্রী সারা ফার্গুসনও এপস্টেইনের কাছ থেকে দেনা পরিশোধের জন্য অর্থ নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে গণমাধ্যমে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষায় এপস্টেইনের পরামর্শ চেয়েছিলেন।
প্রযুক্তি জগতের শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের মধ্যে টেসলা প্রধান ইলোন মাস্কের নামও নথিতে দেখা গেছে। ২০১২ ও ২০১৩ সালের ইমেইল আদান-প্রদানে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে মাস্কের ভ্রমণের বিষয়ে আলোচনা হলেও, মাস্ক দাবি করেছেন তিনি এপস্টেইনের বারবার করা আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অন্যদিকে, গুগল সহ-প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন ও তৎকালীন সিইও এরিক শ্মিটকেও এপস্টেইনের বাড়িতে ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর তথ্য মিলেছে। মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের বিষয়ে নথিতে চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে। এপস্টেইনের নোটে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি গেটসকে বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়াতে এবং মাদক সংগ্রহে সহায়তা করেছিলেন। তবে গেটসের প্রতিনিধিরা এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল এপস্টেইনের আনাগোনা। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বিল ক্লিনটনের সঙ্গে এপস্টেইনের দীর্ঘদিনের সখ্যতার কথা আগে থেকেই জানা ছিল। নতুন নথিতে ট্রাম্প সম্পর্কে হাজার হাজার তথ্যসূত্র থাকলেও বড় কোনো নতুন অভিযোগ আসেনি। ক্লিনটনের বিষয়েও ভুক্তভোগীদের কেউ সরাসরি অপরাধের অভিযোগ তোলেনি, তবে এপস্টেইনের বাড়িতে ক্লিনটনের ছবি এবং তার বিমানে ভ্রমণের রেকর্ড নথিতে সংরক্ষিত আছে। এছাড়া ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক নিয়মিত এপস্টেইনের নিউ ইয়র্কের বাসভবনে যেতেন এবং তার বিমানে ভ্রমণ করতেন বলে জানা গেছে।
ব্যবসায়িক ও বিনোদন জগতের প্রভাবশালীরাও বাদ যাননি। ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্র্যানসন এপস্টেইনকে তার ব্যক্তিগত দ্বীপে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং এপস্টেইনকে উপদেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি বিল গেটসকে ব্যবহার করে নিজের ভাবমূর্তি ফেরানোর চেষ্টা করেন। নিউ ইয়র্ক জায়ান্টসের মালিক স্টিভেন টিশ এপস্টেইনের মাধ্যমে নারীদের সঙ্গে পরিচয়ের বিষয়ে ইমেইল আদান-প্রদান করেছেন। চলচ্চিত্র পরিচালক ব্রেট রাটনারের সঙ্গেও এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ ছবি পাওয়া গেছে। এমনকি ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক কমিটির সভাপতি ক্যাসি ওয়াসারম্যান এবং ট্রাম্পের প্রাক্তন উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে এপস্টেইনের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।
এই নথিপত্র প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রথম পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে স্লোভাকিয়ায়। এপস্টাইনের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিরোস্লাভ লাজকাক পদত্যাগ করেছেন।
জেফরি এপস্টেইন ছিলেন একজন অত্যন্ত ধনাঢ্য মার্কিন বিনিয়োগকারী, সমাজসেবী পরিচয়ের ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব যিনি বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রপ্রধান, রাজপরিবার এবং বিলিয়নেয়ারদের সঙ্গে গভীর সখ্যতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল—তিনি বছরের পর বছর ধরে একটি বিশাল আন্তর্জাতিক 'যৌন পাচার চক্র' পরিচালনা করতেন। যেখানে অসংখ্য অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে ও তরুণীকে প্রলোভন দেখিয়ে বা জোরপূর্বক নিজের এবং তার প্রভাবশালী বন্ধুদের যৌন লালসা মেটাতে বাধ্য করা হতো। ২০০৮ সালে প্রথমবার যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও তার এই অন্ধকার কার্যক্রম সচল ছিল বলে প্রমাণ মেলে। ২০১৯ সালে নতুন করে ফেডারেল যৌন পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে নিউইয়র্কের জেলে নিজ কক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষয়ের দাবি, এপস্টেইন আত্মহত্যা করেছেন। তবে তার মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক আজও পুরোপুরি থামেনি।
এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তার অপরাধের জাল কতদূর বিস্তৃত ছিল, তা নিয়ে যে তদন্ত শুরু হয়। এ নথিগুলো সেই রহস্যের গভীরে এক নতুন আলোকপাত করল। অভিযুক্তরা নির্দোষ দাবি করলেও, এই তালিকা বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক সম্পর্কের এক কুৎসিত চিত্রই তুলে ধরছে। বিচার বিভাগের নথিগুলো নতুন কোনো অপরাধের অভিযোগ না তুললেও, বিশ্বের বহু হাইপ্রোফাইল ব্যক্তির দীর্ঘদিনের অস্বস্তিকর যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত বার্তালাপ আবারও আলোচনায় এনেছে।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
