February 8, 2026, 9:07 am


সামিউর রহমান লিপু

Published:
2026-02-08 01:40:50 BdST

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও পিলখানায় শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে মতবিনিময়ক্ষমতায় গেলে বিডিআর নাম পুনর্বহাল করতে চাই: তারেক রহমান


বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নাম পুনরায় বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারেক রহমান।

শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীতে রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও পিলখানায় শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে এক মতিবিনিময় অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই প্রতিশ্রুতি দেন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক উপকমিটি এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে বরখাস্ত হওয়া সামরিক কর্মকর্তা, ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবে অংশ নেওয়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য এবং পিলখানা বিডিআর হত্যাকাণ্ডে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।

বক্তব্যের শুরুতেই এমন একটি অনুষ্ঠানে তাকে এবং তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তারেক রহমান। 

তিনি বলেন, “২০০৯ সালে বিডিআর পিলখানায় সেনা হত্যাযজ্ঞের পর ‘পতিত পরাজিত পলাতক বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তি’ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিল। এমনকি তাদের ইউনিফর্ম পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে।

“আমি আপনাদের সামনে একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি শেয়ার করতে চাই, জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বিডিআরের নাম পুনর্বহাল করতে চাই। ভবিষ্যতে যেন কখনোই এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সেই লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে পিলখানার সেনা হত্যার দিনটিকে ‘শহীদ সেনা দিবস’ অথবা ‘সেনা হত্যাযজ্ঞ দিবস’ অথবা ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।”

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের জনগণ সেনাবাহিনীকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসেবে মনে করে। সেনাবাহিনীকে ভিন্ন কাজে সংযুক্ত করা হলে সেনাবাহিনীর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়—আমি তা বিশ্বাস করি।

সেনাবাহিনীর কল্যাণে সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা হবে

তারেক রহমান বলেন, ‘‘আপনারা যারা সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, আপনাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করার আগেই সাবেক কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা এবং সদস্যদের কল্যাণে বেশ কয়েকটি সুপারিশ উপস্থাপন করেছেন।

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন, সেনা আইনের কিছু কিছু বিধিমালার পরিমার্জন কিংবা সংস্কারসহ এসব সুপারিশ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।”

তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে এতটুকু বলতে পারি, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জনগণের রায়ে আল্লাহর রহমতে ইনশাল্লাহ বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, আপনাদের এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সেনাবাহিনী সাবেক এবং বর্তমান কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে আমরা একটি কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করেছি।

“এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দাবি -দাওয়াগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে প্রতিটি সুপারিশ পর্যায়ক্রমে আমাদের বাস্তবায়নের ইচ্ছা আছে।”

তিনি বলেন, ‘‘সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এবং সদস্যদের একটি দাবি ছিল ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পে। আমি আপনাদের অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই যে, ইতোমধ্যেই আমরা বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পে’ অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছি এবং এটি আমরা বাস্তবায়নের ঘোষণা এরই মধ্যে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছি।

“ইনশাআল্লাহ বিএনপি সরকার গঠন করলে ১২ তারিখের নির্বাচনে এটি আমরা যত দ্রুততার সঙ্গে সম্ভব বাস্তবায়ন করব।”

সেনাবাহিনীর সাথে 'আত্মার বন্ধনে' আবদ্ধ জিয়া পরিবার

সেনাবাহিনীর সঙ্গে ‘আত্মিক সম্পর্কের’ কথা তুলে তারেক রহমান বলেন, “আপনাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় আমি এবং আমার স্ত্রী সত্যিকার অর্থেই কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি বা পড়ছি। বরাবরই সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনীকে আমার কাছে আমার একটি বৃহত্তর পরিবার বলেই মনে হয় বা আমরা মনে করি।

ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “এর কারণ হয়তো সেনানিবাসে আমার এবং আমার পরিবারের বেড়ে ওঠা। অনেক ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়েছি আমরা। তবে বড় হয়ে দেখেছি সেনাবাহিনীর প্রতি আমার মা মরহুমা খালেদা জিয়ারও এক ধরনের নির্ভরতা ছিল, সম্মান ছিল। আমার মা সবসময় মনে করতেন, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য বাংলাদেশের অবশ্যই একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকা দরকার।”

‘সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না’

অতীতে সেনাবাহিনীকে নিয়ে যত অনিয়ম হয়েছে তার সুষ্ঠু বিচারের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে বলে ঘোষণা দেন তারেক রহমান।

এসময় তিনি সশস্ত্রবাহিনীর মর্যাদা রক্ষায় সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীলতার উপর গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে, আধুনিক সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে বিএনপি ইতিবাচকভাবে কাজ করবে বলেও জানান তিনি।

তারেক রহমান বলেন, “সেনাবাহিনীর হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেওয়া হবে, আমি এ ধরনের কথা বলতে চাই না। বরং গৌরব ফিরিয়ে দেওয়া যায় না, গৌরব অর্জনের বিষয়, গৌরব ধারণ করার বিষয়।

তিনি বলেন, “সেনাবাহিনীর গৌরব সেনাবাহিনীকে রক্ষা করতে হবে। সেনাবাহিনীর নিজেদের সম্মান এবং মর্যাদা সম্পর্কে নিজেদেরকে সতর্ক এবং সচেতন থাকতে হবে।"

এসময় তিনি বলেন, আমার কথাটা হয়ত একটু ছন্দপতন…কিন্তু আমি বিষয়টি যেভাবে বিশ্বাস করি, যেভাবে দেখি, আমি আপনাদের সামনে সেভাবেই উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। তবে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে, একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে আমি এতটুকু বলতে পারি, জনগণের রায়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার গঠনে সক্ষম হলে সেনাবাহিনীকে অবশ্যই বিতর্কমুক্ত রাখা হবে এবং কোনোভাবেই রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।”

তিনি বলেন, “সেনাবাহিনীর গৌরব ভূলণ্ঠিত হয়, এমন কিছু বিএনপি অতীতে কখনো করেনি, বর্তমানেও করছে না এবং ইনশাল্লাহ ভবিষ্যতেও করবে না। কারণ বিএনপি সবসময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষশক্তি। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি রাজনীতির মাঠে শক্তিশালী থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও শক্তিশালী থাকে। ”

তিনি বলেন, ‘‘সেনাবাহিনীর গৌরব এবং মর্যাদাও ইনশাল্লাহ অক্ষুন্ন থাকবে। সেনাবাহিনী অবশ্যই রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন থাকবে। তবে রাজনীতিতে বিলীন হয়ে যাওয়া অবশ্যই উচিত হবে না।

তিনি আরও বলেন, “রাজনীতির চাদরে যেন পেশাদারিত্ব আচ্ছাদিত না হয়ে যায়, সেই ব্যাপারে সেনাবাহিনীর সকল কর্মকর্তা এবং সদস্যকে অবশ্যই অত্যন্ত সচেতন থাকা জরুরি। ”

এর আগে, উত্তরবঙ্গের ৩টি জেলায় নির্বাচনী প্রচারণা ও জনসভায় অংশ নিয়ে ঢাকায় ফিরেই এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন তারেক রহমান। অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেই তিনি হেঁটে হেঁটে উপস্থিত সকল অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।

এসময়, তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের এডিসি কর্নেল (অব.) হারুনুর রশিদ খান, মেজর (অব.) সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক, মেজর (অব.) জামাল হয়দার, বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের সন্তান রাকিন আহমেদসহ আরও অনেকে।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নাইমের পরিচালনায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত এবং দোয়ার মাধ্যমে এই অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর প্রয়াত জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত হয়।

এই মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি চেয়ারম্যানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর। 

স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, "বাংলাদেশের ইতিহাস সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে জড়িত। আমরা চাই সশস্ত্র বাহিনী তাদের গৌরব ফিরে পাক।”

ফজলে এলাহী আরও বলেন, “আমরা পিলখানা বিডিআর হত্যাকাণ্ড, মেজর সিনহার হত্যাকাণ্ড এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের উপর নির্যাতনের বিচার চাই। আমরা কেবল ন্যায়বিচার চাই। আমরা নিশ্চিত করতে চাই, আমাদের সদস্য এবং সন্তানরা ভবিষ্যতে যেন আর কখনও অপমানিত না হন।”

তিনি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান, স্বাধীনতা উত্তর রাজনীতি ও বিএনপির ইতিহাস তুলে ধরেন। মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ৪৪ বছরের রাজনীতির ইতিহাসের উপরও আলোকপাত করেন।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের সামনে অতীতের নানাবিধ রাজনৈতিক সংকট নিরসন ও দেশের বহু ক্রান্তিলগ্নে খালেদা জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং তার অবদান তুলে ধরেন তিনি।

এরপর, মেজর (অব.) মিজানুর রহমান অনুষ্ঠানে উপস্থিত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আগামী নির্বাচনে জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে তারেক রহমানকে সমর্থন দেবেন। তিনি গণতান্ত্রিক পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান।

তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে মেজর (অব.) মিজানুর রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে তিনি যে নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। গুলশানের বাসা থেকে স্ত্রী-সন্তানের সামনে তাকে তুলে নেওয়ার ঘটনার ট্রমা এখনও কাটেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

একটি নিরাপদ বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তারেক রহমান দৃঢ় থাকলে সবাই মিলে একটি প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি। পরে, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সম্মানে নৈশভোজে যোগ দেন তারেক রহমান।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.