February 9, 2026, 11:20 am


সামিউর রহমান লিপু

Published:
2026-02-09 07:06:40 BdST

মধ্যরাতে এম এ কাইয়ুমের জনসভায় লাখো কর্মী-সমর্থক ও জনতার ঢলদেশ পুনর্গঠন ও জনসেবায় অভিজ্ঞ প্রার্থী বেছে নিতে হবে: তারেক রহমান


বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট হবে কারা মানুষের পাশে থাকে, সেটি দেখার ভোট। ১২ তারিখের নির্বাচনে শুধু ভোট দিলেই চলবে না; ভোট দেওয়ার আগে বুঝে নিতে হবে কারা আপনার পাশে থাকবে, আমাদের পাশে থাকবে।

তিনি বলেন, 'জাতীয় নির্বাচনে শুধু ভোট দিলেই চলবে না। সঠিকভাবে নিজেরদের জনপ্রতিনিধি বেছে নিতে  হবে। এজন্য বিবেচনায় নিতে হবে অতীতের ন্যায় জনকল্যান, জনসেবায় এবং দুঃখ কষ্টে কারা আপনাদের পাশে দাঁড়াবে, কারা মানুষ ও এলাকার উন্নয়ন করবে। শুধু তাই নয়, আপনাদের এটাও বুঝতে হবে যে, আবেগ দিয়ে সব ঠিক করা যায় না। দেশ পরিচালনায় অভিজ্ঞতাও অত্যন্ত জরুরী। এসব কিছুই আমলে নিয়ে আগামী ১২ তারিখ আপনারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং মূল্যবান ভোটটি প্রদান করে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন।'

রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টায় রাজধানীর বাড্ডা সাতারকুলের সানভ্যালী মাঠে ঢাকা-১১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এমএ কাইয়ুমের সমর্থনে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তারেক রহমান।

সাতারকুলের সানভ্যালী মাঠে অনুষ্ঠিতব্য এই জনসভা সন্ধ্যায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বিকেল থেকেই ঢাকা-১১ আসনের স্থানীয় ভোটার ও নেতাকর্মীরা সভাস্থলে জড়ো হতে থাকেন। এক পর্যায়ে লাখো কর্মী-সমর্থক ও জনতার সমাগমের ফলে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ড. এম এ কাইয়ুমের নির্বাচনী পথসভা জনসভায় রূপান্তরিত হয়।

পরবর্তীতে, সন্ধ্যা ছয়টায় কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সমাবেশ শুরু হয়। এরপর, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া করা হয়।

ড. এম এ কাইয়ুমের সভাপতিত্বে জনসভায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন। পরে সমাবেশে আগত নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের জন্য মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

তীব্র যানজট ও জনস্রোত ঠেলে রাত ১১টার দিকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সানভ্যালী মাঠে উপস্থিত হন। এসময় উপস্থিত লাখো জনতা তুমুল করতালি এবং মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রকম্পিত করে স্বাগত জানান তাদের প্রানপ্রিয় নেতাকে। তারেক রহমানও উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানান।

এদিকে, সভাস্থলের মঞ্চে উঠে দীর্ঘ দুইযুগ পর ঢাকা-১১ আসনের ভোটারদের সামনে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তারেক রহমান। পাশেই দাঁড়ানো ড. এম এ কাইয়ুমও অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। এসময় দুজনই কিছু সময় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরে, মঞ্চে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের সাথে তারেক রহমানকে পরিচয় করিয়ে দেন ড. কাইয়ুম।

বক্তব্যের শুরুতেই  তারেক রহমান বলেন, আমরা রাত জেগে কষ্ট করে বসে আছি কারণ ১২ তারিখে একটি নির্বাচন। এর আগেও কিন্তু গত ১৬ বছরে নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনে আমরা তামাশা দেখেছি। নির্বাচনের নামে নাটক হয়েছে। সেই নির্বাচনে দেশের কোনও জায়গায় কোনও মানুষ ভোট দিতে পারে নাই। কিন্তু এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারব

দেশ পুনর্গঠনের ডাক দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশকে আমাদেরই পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে এই দেশের সন্তানেরা ভবিষ্যতে সঠিক শিক্ষা পায়। এই দেশের মানুষ যাতে সঠিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে, স্বাস্থ্যসেবা পায়। এই দেশের যুবকেরা যাতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন। এই দেশের মা–বোনেরা যাতে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেন।’

ভোটারদের সতর্ক করে তারেক রহমান বলেন, ‘একটি মহল কিন্তু ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে, কীভাবে নির্বাচনকে বানচাল করা যায়, নির্বাচনকে বিতর্কিত করা যায়।’ তিনি বলেন, ‘পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় নজর রাখতে হবে, যাতে এই সব “গুপ্তরা” গিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে না পারে। কেউ যাতে পকেটে করে নকল সিল ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যেতে না পারে, সেই বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।'

তিনি বলেন, ‘পত্রিকার পাতায় খবর দেখেছি, গুপ্ত বাহিনীর সদস্যরা ব্যালট পেপারে সিল দেওয়ার নকল সিল তৈরি করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে।’

ধানের শীষে ভোট চেয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিএনপি বাংলাদেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল, যাদের দেশ পরিচালনা করার মতো অভিজ্ঞতা রয়েছে, যাদের দেশ পরিচালনা করার মতো পরিকল্পনা রয়েছে, যাদের দেশ পরিচালনা করার কর্মসূচি রয়েছে।’

বিএনপির রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস জনগণ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘কাজেই জনগণ যদি আমাদের সঙ্গে থাকে, জনগণ যদি আমাদের সমর্থন দেয়, জনগণ যদি ধানের শীষে ভোট দেয়, ইনশাআল্লাহ আপনাদের সামনে যে সকল প্রতিশ্রুতি আমরা রেখেছি, সেগুলো পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা বাস্তবায়ন করব।’

আগামী ১২ তারিখ সঠিক জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার মাধ্যমে দেশ পুনর্গঠনের রাজনীতি শুরুর কথাও উঠে আসে বিএনপির চেয়ারম্যানের বক্তব্যে। তারেক রহমান বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রে আপনারা যাবেন, দেশের আইন অনুযায়ী ভোট দেবেন। কিন্তু ভোট দিয়ে চলে এলে হবে না, হিসাব–নিকাশ বুঝে নেবেন।’

দীর্ঘ বক্তব্যে তারেক রহমান নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া কারিগরি ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ঘরে বসে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানজনক ভাতার ব্যবস্থা করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।


বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে তারেক রহমান বলেন, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেশের মানুষ প্রকৃত অর্থে ভোট দিতে পারেনি। নির্বাচনের নামে নাটক হয়েছে।

দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি গত ১৬ বছর এই দেশে অনেক মেগা প্রজেক্ট হয়েছে সাথে মেগা দুর্নীতিও হয়েছে। মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তেমন কোনও কাজ হয় নাই। যদি হতো তাহলে আজকে এখানে যে ধানের শীষের প্রার্থী কাইয়ুম এই এলাকার কিছু সমস্যার কথা বলেছেন সেগুলো থাকার কথা না। এই সমস্যাগুলো এখনো বিদ্যমান কারণ গত ১৬ বছরে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কোনও কাজ হয়নি। উন্নয়নের নামে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এর ফলেই আজ তরুণদের একটি বড় অংশ বেকার। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করা হবে।
তারেক রহমান বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় উন্নয়নের সুফল পৌঁছাতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল উন্নতি জরুরি। সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করা হবে। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হবে, যেখানে সবাই নিরাপদে থাকবে। ’
বাড্ডা ও সাঁতারকুল এলাকার স্থানীয় সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান জানান, অতীতে বিএনপি যতবার ক্ষমতায় এসেছে, দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশ ও মানুষের স্বার্থে ধানের শীষে ভোট দিতে সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে, বক্তব্যের শেষের দিকে তারেক রহমান বিএনপির নির্বাহী কমিটির ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. এম এ কাইয়ুমকে নিজের কাছে ডেকে নেন। পরে, ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী হিসেবে এম এ কাইয়ুমের হাতে ধানের শীষের প্রতীক তুলে দেন এবং তাকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তারেক রহমান।

এর আগে, তারেক রহমান রাজধানীর পৃথক ৫টি আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের আয়োজিত পথসভায় উপস্থিত হয়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন এবং দলীয় প্রার্থীদের ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেয়ার আহবান জানান। প্রতিটি পথসভাতেই লাখো কর্মী-সমর্থক ও জনতার ঢল ছিলো চোখে পড়ার মতো।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.