February 26, 2026, 4:39 am


নিজস্ব প্রতিবেদক

Published:
2026-02-26 01:18:08 BdST

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ শেষ পর্যন্ত অপমানিত হয়েই বিদায় নিলেন গভর্নর


কর্মকর্তাদের তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিবাদের মুখে অপমানজনক পরিস্থিতির শিকার হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিদায় নিলেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।

গতকাল রাজধানীর মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তোপের মুখে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাঙ্গন ত্যাগ করেন।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলমান আন্দোলন, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার, বদলি আদেশ বাতিল এবং গভর্নরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে গভর্নরের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন ও আপত্তি তুললে সরকার তাঁকে সরিয়ে দেয়।

গভর্নরের বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে একাধিক কর্মকর্তা উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ জানান। এতে গভর্নর বিব্রত অবস্থায় পড়েন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে গভর্নর তড়িঘড়ি বাংলাদেশ ব্যাংক ত্যাগ করেন। এই ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতারা জানান, গভর্নরের ‘স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক আচরণে’ প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে গুরুতর একগুচ্ছ অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল।

এসব অভিযোগে বলা হয়, সম্প্রতি গভর্নর ও তার ঘনিষ্ঠদের কতিপয় সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, নিয়মনীতি ও নৈতিকতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সূত্রমতে, বিএফআইইউ থেকে অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য নিয়ে গভর্নরের স্ত্রী এবং গভর্নরের একান্ত সচিবের যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেটের কাছে পাচার করা হয়েছে। এই সিন্ডিকেটটি বন্ধ থাকা বিভিন্ন একাউন্ট সচল করে দেয়ার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ‘তদবির বাণিজ্য’ করে।

বিএফআইইউর অপারেশনাল স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে তথ্যের এই অপব্যবহার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ জমা ও উত্তোলন সংক্রান্ত ক্যাশ ট্রানজ্যাকশন রিপোর্ট (সিটিআর), সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট (এসটিআর), গোয়েন্দা (ইনটেলিজেন্স) প্রতিবেদন, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ ও আনফ্রিজ সংক্রান্ত তথ্য এবং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণসংক্রান্ত স্পর্শকাতর নথি বিএফআইইউ থেকে গভর্নরের কাছে পাঠানো হয়েছে।

নথিতে দেখা যায়, গভর্নরের কাছে পাঠানো তথ্যের তালিকায় রয়েছে বিএফআইইউতে প্রাপ্ত অভিযোগ, সিটিআর ও এসটিআরের সংখ্যা এবং এসব অভিযোগের বিপরীতে গৃহীত ব্যবস্থার বিবরণ; অনুমোদিত ইনটেলিজেন্স রিপোর্ট কোন কোন সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে এবং সেগুলোর বর্তমান অগ্রগতি; কতগুলো ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে ও সেগুলোর বর্তমান অবস্থা; অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ ও আনফ্রিজ করার কারণসহ বিস্তারিত তথ্য; এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সংক্রান্ত জারি করা সার্কুলার, নীতিমালা ও বিধিবিধানের বিবরণ।

এছাড়া ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ সময়কালের তথ্যও বিএফআইইউ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, গভর্নরের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে কর্মরত অতিরিক্ত পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা অফিসের সার্বক্ষণিক গাড়ি ব্যবহার করা সত্ত্বেও নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা ‘গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা’ উত্তোলন করছেন।

গভর্নরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকে এই ধরনের প্রকাশ্য আর্থিক অনিয়ম গভর্নরের মৌন সম্মতি ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে কর্মকর্তারা মনে করেন। উচ্চপদে আসীন একজন কর্মকর্তার এমন কর্মকাণ্ড ব্যাংকের প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ওপর চরম আঘাত বলেও মনে করেন তারা।

গভর্নরের পুরোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক রক্ষার হীন উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে গভর্নর নজিরবিহীন তাড়াহুড়ো করেন বলেও তারা অভিযোগ করেন।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, একক গোষ্ঠীর কাছে ১০ শতাংশের অধিক মালিকানা থাকার ক্ষেত্রে যে কঠোর আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে, তা গভর্নর তোয়াক্কা করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বোর্ড মিটিংয়ে কর্মকর্তাদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে গভর্নরের এই ব্যক্তিগত এজেন্ডাটি বাধাগ্রস্ত হলেও এর মাধ্যমে গভর্নরের ‘স্বার্থের সংঘাত’ জনসমক্ষে নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে বলে কর্মকর্তারা মনে করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জরুরি বৈঠকে ‘ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স’ আটকে যাওয়ার পর আহসান এইচ মনসুর আদালতের স্থগিতাদেশের মধ্যেই বেসরকারি খাতের লাভজনক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদকে বিক্রি করে দেওয়ার পাঁয়তারা চালিয়েছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন।

শুধু তা-ই নয়, ব্যাংকের মেডিকেল সেন্টারে প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত থাকা সত্ত্বেও গভর্নর নিজে নিয়মিতভাবে বিশেষ কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে ‘নো-স্টক’ স্লিপ নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই ওষুধগুলো গভর্নর প্রকৃত অর্থে ব্যবহার করেন না, বরং বাইরে থেকে কেনার নামে বানোয়াট বিল তৈরি করে অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে, যা আর্থিক অনিয়ম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে আসীন একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই ধরনের অনিয়ম সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছেন বলে কর্মকর্তারা মনে করেন।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে ইতিপূর্বে বিভিন্ন বেসরকারি, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুদান দেওয়ার চর্চা থাকলেও সরকারি বিদ্যালয়ে কোনো ধরনের অনুদানের নজির নেই। শুধু গভর্নরের শৈশবের বিদ্যাপীঠ বিবেচনায় সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানকে সিএসআর ফান্ড থেকে অনুদান দিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একইভাবে চুয়াডাঙ্গায় অবস্থিত গভর্নরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর উদ্যোগে তৈরি এই প্রতিষ্ঠানটিতে ক্যানসার ও কিডনি আক্রান্ত রোগীদের সহায়তা করার জন্য এর সক্ষমতা বিবেচনার সুযোগ যাচাই-বাছাইয়ে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে তড়িঘড়ি করে ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা দিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বাধ্য করা হয় মর্মে অভিযোগ রয়েছে।

টাঙ্গাইলের করটিয়ায় মনসুরের মালিকানাধীন বাগানবাড়ির সন্নিহিত বিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে নিজ দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে বিদ্যালয়টিতে অনুদান দেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি স্বার্থের সংঘাত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের জন্য গাড়ির বরাদ্দ ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা অথচ গাড়ি কেনা হয়েছে ২ কোটি ৫৬ লাখ টাকায়। নিয়ম অনুযায়ী প্রগতি থেকে উন্মুক্ত দরপত্রে গাড়ি না কেনায় এই গাড়ির রেজিস্ট্রেশন আটকে দিয়েছে বাংলাশে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের জন্য গত বছর গাড়ি কেনা এবং এর পেছনে সরকারি বিধি ও ক্রয়নীতিমালা মানা হয়নি এমন অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা ও প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। অন্যথায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের গভর্নরদের জন্য সাধারণত একটি মিতসুবিশি পাজেরো গাড়ি বরাদ্দ থাকত। গভর্নরের স্ত্রীর সেই গাড়ি পছন্দ হয়নি। পরে তার জন্য আরও আরামদায়ক ও বহুমুখী একটি এমপিভি (মাল্টি পারপাস ভেহিকেল) গাড়ি কেনা হয়েছে। আর সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে ‘সান্ড্রি সাসপেনস অ্যাকাউন্ট’ ডেবিট করে। সাধারণত এই হিসাব ব্যবহৃত হয় অজ্ঞাত উৎসের অর্থ, আংশিক পরিশোধ বা সাময়িক হিসাব-সংক্রান্ত জটিলতার ক্ষেত্রে। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে মাত্র একটি গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে এই ধরনের হিসাব ব্যবহার অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.