February 14, 2026, 6:29 pm


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-02-14 16:17:54 BdST

নির্বাচনে আলোচিত-সমালোচিত শিবচরনতুন নেতা হানজালার অভিষেক


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: মাদারীপুর-১ আসন

  • জেগে উঠেছে তরুণ প্রজন্ম
  • ন্যায় ও ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়াতুল্লাহর যোগ্য উত্তরসুরী
  • অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে দ্রোহ

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নতুন প্রজন্মের আইডল হিসেবে আগমন ঘটলো এক কাঙ্খিত নতুন নেতার। ঐতিহাসিকভাবে খ্যাত বৃৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে এক মানবিক নেতার আবির্ভাব ঘটেছিলো বাংলাদেশে। তিনি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের পথিকৃত হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরাজি। ২০৭-২০৮ বছর আগের সেই আন্দোলনের প্রতিধ্বনি এখনও কান পাতলেই শোনা যায়।

সেই মহান নেতার বংশ পরম্পরায় আবির্ভূত হলেন সাইদ উদ্দিন আহমেদ হানজালা। হাজী শরীয়তুল্লাহর সপ্তম পুরুষ হানজালা। তিনি মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির যৌথ প্রচেষ্টাকে ভেঙ্গে দিয়ে বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে নিলেন। এ যেন তিনি এলেন বিজয়ী বেশে সবকিছু জয় করে নিলেন।

শিবচর হচ্ছে আওয়ামী লীগের দুর্গ। সেই দুর্গের সাথে যুক্ত হয়েছে বিএনপি। অবশেষে কোন প্রচেষ্টাই থামাতে পারেনি হানজালার বিজয়কে। মূলত শিবচরের জনগণ এমন একজন নেতা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত করেছে যিনি তরুন প্রজন্ম ও শান্তিপ্রিয় শিবচরবাসীর নিকট অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচিতি লাভ করেছেন।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত সমালোচিত আসন মাদারীপুর-১। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রথম ধাপে তাদের দলীয় প্রার্থী নাম ঘোষণার পর বিএনপির অন্য একটি অংশ দলীয় মনোনয়ন না মেনে এর বিরুদ্ধে ঢাকা-ভাঙ্গা-খুলনা এক্সপ্রেসওয়েতে অবস্থান নিয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অবরোধ করে রাখে। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই অবস্থান ছিল বিএনপি জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। বর্তমান বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। দল সাথে সাথে তাদের সিদ্ধান্ত স্থগিত করে আন্দোলনকে থামিয়ে দেয়। এরপরই শিবচরে বিএনপি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এই সুযোগে একটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অন্য একটি গ্রুপের সাথে যোগাযোগ করে। 

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শিবচরের রাজনীতি চৌধুরী পরিবারের বলয় ভেদ করতে পারিনি। অবশেষে তাদের সেই কাঙ্খিত নেতাকে সাদরে বরণ করে জয়ের মুকুট পরিয়ে দাম্ভিকতা ও চৌধুরী পরিবারের বলয় ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।

দীর্ঘদিন যাবত ১৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত শিবচর এর রাজনীতিতে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ বেষ্টিত চর অঞ্চলের একটি রাজনৈতিক সিন্ডিকেট পুরো শিবচরের জনগণকে তাদের প্রজা হিসেবে মনে করেছে। সুবিধাভোগী চাটুকার একটি গোষ্ঠী নিজেদের মেরুদন্ডকে সোজা না করে তাদের তল্পীবাহক হয়ে রাজনীতি করে এসেছে। বিএনপি তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থীকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করার সাথে সাথে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়া বিএনপির মধ্যে আরেক ভাগ বিএনপি নির্বাচনের মাঠে আবির্ভূত হয়। কাউন্ট ডাউন শুরু হয় বিএনপির মৃত্যু ঘন্টা বাজানোর।

শিবচরে বিএনপি’র শক্ত প্রার্থী যাকে দলীয়ভাবে প্রথম নমিনেশন দেওয়া হয়েছিল তার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায় মেরুদন্ডীহীন বিএনপির স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। ভিতরে ভিতরে বিএনপির প্রথম নমিনেশনপ্রাপ্ত প্রার্থী কামান জামান মোল্লার প্রতিপক্ষের সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভানেত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপির দলীয় প্রার্থী নাদিয়া আক্তারের পক্ষে 'জয় বাংলা' স্লোগান দিয়ে ধানের শীষের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারনায় নেমে পড়ে। অথচ আওয়ামী লীগের দলীয় সিদ্ধান্ত ছিল নির্বাচন বর্জনের।

শিবচরের রাজনীতিতে দলের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি যে বড় তা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতি আওয়ামী লীগের সমর্থন প্রমাণ করে।

বিগত দিনে শিবচরের রাজনীতিতে ও উন্নয়নে যে সব কর্মকাণ্ড চলে এসেছে জনগণ তার দুই ভাবে মূল্যায়ন করেছে। সাবেক চীফ নূর-ই আলম চৌধুরী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যেসব উন্নয়ন শিবচরের জন্য করেছেন  জনগণ তা সারা জীবন মনে রাখবে। বিপরীতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর তার চারপাশের নেতাদের আত্মঅহমিকা ও নেতিবাচক সামাজিক কর্মকান্ডে জনগণ তুষের আগুনে জ্বলছে।

লিটন চৌধুরীকে সর্বদাই তার চারপাশে আষ্টে-পৃষ্ঠে থাকা চাটুকার শ্রেণীর নেতাদের শৃংখল ভঙ্গ করে বের হয়ে আসতে না পারায় তার উন্নয়ন কর্মকান্ড জনগণের মাঝে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখার পিছনে কাঁটা হয়ে বিধেছে।

সাবেক চীপ হুইপ এমন কিছু ব্যক্তিকে নেতা বানিয়েছে যারা সর্বদাই তোষামদিতে ব্যস্ত ছিলো। এদের অধিকাংশেরই নেই কোন শিকড়, নেই কোন শিক্ষা ও সিএসআরএস। তারা শুধু টাকাই বানিয়েছে। কিন্তু নেতার দুর্দিনে সবাই পালিয়েছে। নেতার দূরদর্শী চিন্তার অভাব ঘটলে এমন পরিনতি অপরিহার্য।

শিবচরে আওয়ামী লীগের দুুর্গে যে ভয়াবহ পতন এবং করুন পরিনতি ঘটেছে তার দৃশ্যমান প্রমান নির্বাচনী ভরাডুবিতে। পেশিশক্তির ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু সাধারণ জনগণ তা ব্যালটের মাধ্যমে গুড়িয়ে দিয়েছে।

নতুন যুগের সুচনা

সাইদ উদ্দিন আহমেদ হানজালা শিবচরের নবনির্বাচিত নেতা। তিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে আইডল। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মহান পুরুষ হাজী শরীয়ত উল্লাহর যোগ্য উত্তরসূরী হানজালা। শিবচরের মাটির রাজনীতিতে হানজালা নতুন হলেও তার পূর্বপুরুষ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলো আজ থেকে ২০৭-২০৮ বছর পূর্বে। দীর্ঘদিন যাবত ন্যায় ও ইনসাফ কায়েমের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে একদল তরুণ যার নেতৃত্ব রয়েছেন হানজালা।

শিবচরের সাধারণ জনগণ তার কর্মকাণ্ডকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। হানজালা নতুন বাংলাদেশে নতুন রাজনীতি ও ইনসাফ কায়েমের যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তাতে শুধু শিবচর নয় পুরো বাংলাদেশ হাজী শরীয়তুল্লাহর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম জেগে উঠেছে ইতিবাচক ধারার রাজনীতিতে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র যৌথ প্রচেষ্টাও তার ইতিবাচক ধারার রাজনীতির কাছে ধরাশায়ী হয়েছে।

আলোচিত-সমালোচিত শিবচরের জনগণ ন্যায়বিচারের পক্ষে রায় দিয়েছে। নির্বাচোনাত্তর শিবচরের ঐতিহাসিক বাহাদুরপুর ময়দানে গতকাল শুক্রবারের জুম্মার নামাজে লাখো জনতার উপস্থিতি বলে দেয় এই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের নেতৃত্বে আগামীতে ইতিবাচক ধারার ন্যায় ও ইনসাফের রাজনীতির পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। শিবচরে দীর্ঘদিনের পেশী শক্তির ও অপশক্তির কবর রচিত হবে বলে শিবচরবাসীর প্রত্যাশা।

১১ দলীয় জোটের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সাইদ উদ্দিন আহমেদ হানজালা তার বক্তব্যে মাদকমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত ও দখলদারমুক্ত ন্যায় ও ইনসাফের শিবচর গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। নতুন প্রজন্মকে তিনি অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। বৈষম্যহীন শিবচর গড়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

উল্লেখ্য যে, মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে বিএনপির দলীয় ও আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী নাদিরা আক্তার সর্বমোট ভোট পেয়েছে ৬৪,২৯১টি ও সাইদ উদ্দীন আহমেদ হানজালা পেয়েছে ৬৪,৯০৯টি।

জয়-পরাজয়ে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে পোষ্টাল ব্যালটের ভোট। এক্ষেত্রে হানজালা পেয়েছে ১৩৯৮ ভোট ও নাদিরা আক্তার পেয়েছে ২৩৩ ভোট।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.