ভূমিকম্পে কতটা ঝুঁকির মধ্যে ঢাকা

Published: 27 June 2026 15:06

১৮৮৫ সালের বেঙ্গল ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.১ এবং এর রিটার্ন পিরিয়ড ১৩২ বছর পেরিয়ে গেছে। নেচার জিওসায়েন্সের গবেষণা বলছে, এই অঞ্চলের ফল্ট থেকে ৮.২ থেকে ৯.০ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে।

সালাহউদ্দিন মিঠু

ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ মেগাসিটির একটি। দ্রুত নগরায়ন, ঘনবসতি, নিম্নমানের ভবন ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে এখানে বড় ভূমিকম্প হলে মানবিক বিপর্যয় অনিবার্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় প্রশ্ন নয় ভূমিকম্প হবে কি না, প্রশ্ন কখন হবে।

বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ঢাকার ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে মধুপুর ফল্ট, ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ডাউকি ফল্ট এবং পশ্চিমে ধলেশ্বরী ফল্ট সক্রিয়। ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.১ এবং এর রিটার্ন পিরিয়ড ১৩২ বছর পেরিয়ে গেছে।

নেচার জিওসায়েন্সের গবেষণা বলছে, এই অঞ্চলের ফল্ট থেকে ৮.২ থেকে ৯.০ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। ফল্টের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ১৪ কোটি মানুষ বাস করে, যার মধ্যে বৃহত্তর ঢাকায় ১ কোটি ৭০ লাখ।

রাজউক ও বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা অনুযায়ী মধুপুর ফল্টে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে ঢাকা শহরের ৮ লাখ ৬৫ হাজার ভবন ধসে পড়বে, যা মোট ভবনের প্রায় ৪০ শতাংশ। দিনের বেলায় ঘটলে ২ লাখ ১০ হাজার মানুষ নিহত ও ২ লাখ ২৯ হাজার গুরুতর আহত হতে পারে। রাতের বেলায় এই সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়াতে পারে।

বুয়েটের জরিপে দেখা গেছে, ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ১ থেকে ৩ লাখ মানুষ হতাহত হতে পারে এবং শহরের ৩৫ শতাংশ ভবন ধসের মুখে পড়বে। আর্থিক ক্ষতি পরিবহনে ১ বিলিয়ন ডলার, পানি ও পয়ঃব্যবস্থায় ৮৮৭ মিলিয়ন ডলার এবং বিদ্যুতে ২৭.১ মিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে। ২০০৯ সালের জাইকা রিপোর্ট বলছে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ৭২ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস ও ১ লাখ ৩৫ হাজার ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তখন ৭ কোটি টন কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ তৈরি হবে।

কেন ঢাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?

প্রথমত, মাটির গঠন। ঢাকার পশ্চিমে মিরপুর, কল্যাণপুর, গাবতলী থেকে পাগলা এবং পূর্বে উত্তরখান, বাড্ডা থেকে ডেমরা পর্যন্ত এলাকা উচ্চ পিক গ্রাউন্ড অ্যাক্সিলারেশন জোন। নরম পলিমাটি ও জলাবদ্ধ স্তরের কারণে ৫.৬ মাত্রার ভূমিকম্পেই ০.৩ থেকে ০.৩৫ জি কম্পন তৈরি হতে পারে। এই মাটি ভূমিকম্পের সময় তরলীকরণ হয়ে ২০ তলা ভবনও কাত করে ফেলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ভবনের মান। ঢাকার মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ ভবন বিল্ডিং কোড মেনে ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরি। বেশিরভাগ ভবন নিম্নমানের রড সিমেন্ট দিয়ে তৈরি, ফাউন্ডেশন দুর্বল। ১৯৭৯ সালের পর দেশে হালনাগাদ সিসমিক জোন ম্যাপ হয়নি।

তৃতীয়ত, ঘনবসতি ও সরু রাস্তা। স্বাভাবিক দিনেই ঢাকার রাস্তা যানজটে অচল থাকে। ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপ রাস্তা বন্ধ করে দিলে উদ্ধারকারী দল, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারবে না।

চতুর্থত, অগ্নিঝুঁকি। প্রায় প্রতিটি ভবনে গ্যাস সংযোগ আছে। বড় ভূমিকম্পে গ্যাস লাইন ফেটে একযোগে শত শত স্থানে আগুন লাগার আশঙ্কা রয়েছে।

সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও সতর্কবার্তায় যা দেখা যায়,
২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এটি ২০০৭ সাল থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রেকর্ড শুরু হওয়ার পর ঢাকার আশপাশে সর্বোচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প। এতে ১০ জন নিহত ও ৬২৯ জন আহত হন। পুরান ঢাকায় ইটের রেলিং ভেঙে তিনজন, গাবতলীতে ছাদ ধসে তিনজন এবং নারায়ণগঞ্জে দেয়াল ধসে এক নবজাতক মারা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী আতঙ্কে হল থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হন।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কম্পন ফোরশক হতে পারে। একই এলাকায় বারবার মৃদু ভূমিকম্প মানে ফল্টে শক্তি জমছে। মধুপুর ফল্টে সঞ্চিত শক্তির মাত্র ১ শতাংশ বের হয়েছে, বাকি ৯৯ শতাংশ যেকোনো সময় ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতান্তই অপ্রতুল।

রাজউকের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের ৫৬৮ কোটি টাকার কাজ দেড় বছর ধরে আটকে আছে। ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা অডিট শুরু হয়নি। ভূমিকম্প সহনীয় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা ড্যাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দেশে বেসরকারি পর্যায়ে মাত্র ৫০টি প্রতিষ্ঠান স্ট্রাকচারাল অডিট করতে সক্ষম। সরকার ২,৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও যন্ত্রপাতি ও জনবল অপর্যাপ্ত।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো দ্রুত ভবনগুলোকে সবুজ, হলুদ ও লাল ক্যাটাগরিতে ভাগ করা। লাল ক্যাটাগরির ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অবিলম্বে খালি করে রেট্রোফিটিং করা জরুরি। বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নিয়মিত মহড়া, স্মার্ট সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। মনে রাখতে হবে ভূমিকম্প মানুষ মারে না, দুর্বল ভবন ও অপ্রস্তুতি মানুষ মারে। ঢাকাকে বাঁচাতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

Shamiur Rahman

Related