March 7, 2026, 2:04 pm


মোস্তফা কামাল আকন্দ

Published:
2026-03-07 12:25:41 BdST

৮ মার্চ: উদযাপন, নাকি সমতার অসমাপ্ত লড়াই?


“নারীর অগ্রগতি ছাড়া কোনো সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়”—এই কথাটি আমরা প্রায়ই শুনি। কিন্তু বাস্তব প্রশ্নটি হলো, আমরা কি সত্যিই সেই অগ্রগতির পথকে শক্ত করছি, নাকি বছরে একদিন ৮ মার্চ এলে কেবল কথার ফুলঝুরি আর আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করে ফেলছি?

ক্যালেন্ডারের পাতায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস একটি দিন মাত্র, কিন্তু ইতিহাসের দৃষ্টিতে এটি অধিকার, মর্যাদা ও সমতার জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সূচনা হয়েছিল শ্রমিক আন্দোলনের ভেতর দিয়ে। ১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে হাজারো নারী শ্রমিক কম কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। শিল্পবিপ্লবের যুগে নারীরা শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের কর্মপরিবেশ ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং বৈষম্যমূলক। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

বিশ্বের অনেক দেশ লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করতে বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে উদাহরণ তৈরি করেছে। আইসল্যান্ডে নারী-পুরুষের সমান মজুরি আইন দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে। রুয়ান্ডার পার্লামেন্টে নারীর প্রতিনিধিত্ব ৬০ শতাংশেরও বেশি। নরওয়ে ও সুইডেনে করপোরেট বোর্ডে নারীর নির্দিষ্ট অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ শুধু প্রতীকী নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ।

তবে উন্নয়নশীল বিশ্বের বাস্তবতা এখনও অনেক ভিন্ন। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশে অগ্রগতি হলেও সামাজিক ও কাঠামোগত বৈষম্য এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সীমিত অংশগ্রহণ—এসব সমস্যা এখনও অনেক সমাজে বিদ্যমান।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর অগ্রগতির গল্প অনেকাংশেই আশাব্যঞ্জক। নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি, তৈরি পোশাক শিল্পে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ, স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব—এসব গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিও বহু নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ খুলে দিয়েছে।

তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা সবসময় সমান ইতিবাচক নয়। যদিও দেশের আইন ও নীতিমালা নারী অধিকার ও সমতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সব পক্ষ সমানভাবে এই লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেয়—এমনটি সবসময় দেখা যায় না। কিছু ক্ষেত্রে নীতিগত অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ধীরগতিতে বোঝা যায় যে নারীর ক্ষমতায়ন এখনও সবক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে স্পষ্ট হয়—শুধু আইন বা নীতিমালা থাকলেই সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন এবং বাস্তব প্রয়াস।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস তাই কেবল উদযাপনের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রতি বছর ৭ মার্চ থেকেই নানা আয়োজনের মাধ্যমে এই দিবসকে ঘিরে আলোচনা শুরু হয়। দেশের স্বনামধন্য পত্রিকাগুলো বিশেষ লেখা প্রকাশ করে, নারী সংগঠনগুলো কর্মসূচি নেয়, প্রগতিশীল চিন্তাবিদেরা মতামত দেন এবং সমাজের নানা স্তরের মানুষ এ বিষয়ে কথা বলেন।

আমাদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন কোস্ট ফাউন্ডেশন এবং এর সঙ্গে যুক্ত দুটি কমিউনিটি রেডিও—রেডিও মেঘনা (ভোলা) ও রেডিও সৈকত (কক্সবাজার)—এই দিবসকে সামনে রেখে নানা সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, আলোচনা ও বিশেষ সম্প্রচার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু দিনশেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—এই আলোচনা ও আয়োজনের বাইরে আমরা কি আমাদের প্রতিশ্রুতির জায়গায় যথেষ্ট দৃঢ় হতে পারছি?

অনেক সময় দেখা যায়, কর্মসূচি থাকে, আলোচনা হয়; কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আমাদের অঙ্গীকার ততটা শক্ত হয়ে ওঠে না।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য “Give to Gain”—অর্থাৎ দিতে শিখলে তবেই পাওয়া যায়। এর মূল বার্তা হলো, অধিকার, সুযোগ এবং সমর্থন নিশ্চিত করলে তবেই সমাজ প্রকৃত উন্নতি লাভ করে। নারীর ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ মানে কেবল একটি গোষ্ঠীর উন্নয়ন নয়; বরং পুরো সমাজের অগ্রগতি। গবেষণা বলছে, নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়ে এবং পরিবার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

তাই ৮ মার্চের তাৎপর্য কেবল একটি দিবস উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সমতার পথ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। এই দিনটি যদি আমরা কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তবে এর গুরুত্ব কমে যাবে। কিন্তু যদি এটিকে আত্মসমালোচনা, নীতিগত পরিবর্তন এবং সামাজিক অগ্রগতির একটি সুযোগ হিসেবে দেখি—তবে এই দিন সত্যিই অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই— “নারীর অধিকার নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না; আর সমতার ভিত্তি ছাড়া কোনো সভ্যতার অগ্রগতি স্থায়ী হয় না।”

লেখক একজন উন্নয়নকর্মী ও নীতি বিশ্লেষক

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.