January 9, 2026, 12:47 pm


S M Fatin Shadab

Published:
2026-01-08 12:50:16 BdST

এলপিজির সরবরাহ সংকট কাটছে না শিগগিরই, তৈরি হচ্ছে নানামুখী জটিলতা


দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ ও এলপিজি অপারেটরদের মধ্যে বৈঠকের পরও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। অন্যদিকে মূল্য সমন্বয় করা ও ‘হয়রানি-জরিমানা’ বন্ধের দাবি পূরণ না হওয়ায় আজ থেকে দেশব্যাপী এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রাখবে তারা। গতকাল সন্ধ্যায় সারা দেশের পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য এমন এক নোটিস জারি করে ব্যবসায়ী সমিতি। এতে বলা হয়, সব কোম্পানির প্লান্ট থেকে এলপিজি উত্তোলনও বন্ধ থাকবে।


সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান এ সংকটের দ্রুতই কোনো সমাধান নেই। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্যটির ক্রয়াদেশ দেয়ার পর অন্তত ছয় সপ্তাহের মতো সময় প্রয়োজন হয় তা দেশের বাজারে আনতে। এর বাইরে জাহাজ সংকট, ভাড়া বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। চলমান সংকটের কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।


দেশে এলপিজির এ সংকট আকস্মিকভাবে তৈরি হয়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বরং দীর্ঘ সময় ধরে আমদানি বৃদ্ধির অনুমোদন না পাওয়া, বিশ্ববাজারে এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা, আমদানিতে অপারেটর সংকট এবং বাজারে বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমদানি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

দেশের বাজারে প্রতি বছর যে পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয় তার প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য। প্রতি মাসে দেশের বাজারে গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ হয়। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, শ্রীলংকা, ভারতের ওড়িশার ধামরা সমুদ্রবন্দর দিয়ে অন্তত ৭০ হাজার টন গ্যাস আমদানি হয়। আর বাকি ৫০ হাজার টন বিশ্বের বিভিন্ন অপারেটর ও বন্দর হয়ে ইরান থেকে আসার কথা জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের এলপি গ্যাস খাতের প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইরান থেকে আমদানি হওয়া গ্যাস বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে বিকল্প সরবরাহকারী এবং দেশের বাজারে ৫০ হাজার টন এলএনজির বিকল্প উৎস তৈরি না হলে সামনের দিনে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয় আমদানিকারকদের।

এক বছর আগেও দেশের অন্তত ২৭টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করত। সেখানে বর্তমানে মূলত পাঁচটি অপারেটর এলপিজি আমদানি করছে বলে জানায় এলপি গ্যাস সমবায় ব্যবসায়ী সমিতি। দেশের বাজারে সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার থাকলেও বর্তমানে রিফিল হচ্ছে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখের মতো। সমিতির দেয়া হিসাব অনুযায়ী অন্তত ৪ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার অব্যবহৃত পড়ে আছে। এ খালি সিলিন্ডারের বড় অংশ সেসব অপারেটরের যারা আর এলপিজি আমদানি করছেন না। এসব কোম্পানির এলপিজি আমদানি বন্ধ করা এ খাতে সংকট তৈরির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বলছে, দেশের বাজারে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করে। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানির আমদানির অনুমোদন আছে। যদিও এখন মূলত পাঁচটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করছে। অন্যগুলোর আমদানি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। কোনো কোনো কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধের পথে। আবার অনেক কোম্পানি ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধেও হিমশিম খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরিতে বড় প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে সক্রিয় কিছু কোম্পানি আমদানি বাড়াতে চেয়ে বারবার আবেদন করেও দীর্ঘদিন সরকারের অনুমতি পায়নি।

গত নভেম্বরে দেশে এলপিজি আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫ হাজার টন। ডিসেম্বরে এ আমদানির পরিমাণ বেড়ে ১ লাখ ২৭ হাজার টন হয়েছে। আমদানি বৃদ্ধির পরেও কেন বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষ বলছে, অনেকে বিশ্ববাজারের মূল্য সূচকের তথ্য থেকে এলপিজির দাম এক মাস আগে থেকে জানতে পারেন। যে কারণে পরিবেশক ও ডিলারদের বড় একটি অংশ বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নেন। খুচরা ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, তাদের বেশি দামে গ্যাস বিক্রির সুযোগ নেই। তারা পরিবেশকদের কাছ থেকে যে দামে কিনছেন তার চেয়ে ৫০-১০০ টাকা বেশিতে বিক্রি করেন। তবে শীত মৌসুমে পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেকে বাসাবাড়িতে বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের কারণে চাহিদা ও বিক্রি বেড়ে গেছে। এটাকে আকস্মিক এলপিজি সংকট তৈরি হওয়ার বড় কারণ বলে মনে করছেন তারা। আবার অনেকে মনে করেন, সরবরাহের যে চিত্র উল্লেখ করা হয় তা যথাযথ নয়।

দেশের বাজারে এলপি গ্যাসের চলমান সংকট নিরসনে রোববার অপারেটরদের সঙ্গে বসেছে জ্বালানি বিভাগ। সংকট নিরসনে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এলপিজি আমদানির সীমা তুলে দেয়া, এনবিআরের শুল্ক ও ভ্যাটসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান চেয়ে গতকাল চিঠি দেয়া হয়েছে। এছাড়া আমদানি ও মজুদসংক্রান্ত কোনো জটিলতা ও সিন্ডিকেট হচ্ছে কিনা তা তদারকি করতে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে দুটি টিম কাজ করছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপি গ্যাস সংকটের বিষয়টি নিয়ে আমরা লোয়াবের সঙ্গে বসেছিলাম। আমদানিতে তারা যেসব প্রতিবন্ধকতার কথা আমাদের জানিয়েছিলেন সেগুলো নিরসন করা হচ্ছে। এছাড়া ভ্যাট ও শুল্কের বিষয়টি নিয়ে তারা আমাদের জানিয়েছেন। জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে এনবিআরকে চিঠি দেয়া হচ্ছে এটি সমাধানের জন্য। এছাড়া আমদানি ও মজুদসংক্রান্ত বিষয় তদারকি করার জন্য জ্বালানি বিভাগের দুটি টিম চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর পরিদর্শন করেছে। অপারেটররা এলপিজি সরবরাহের যে তথ্য দিয়েছেন, তাতে দেশে এ সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। যত দ্রুত সম্ভব এ সংকটের সমাধান করা হবে।’

সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আরো বলেন, ‘শীত মৌসুমে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি, পাইপলাইনে গ্যাসের চাপসংক্রান্ত জটিলতার বিকল্প হিসেবে এলপি গ্যাসের ব্যবহার এবং বাজার থেকে অনেক অপারেটর সরে যাওয়া এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।’

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে লোয়াবের সভাপতি ও ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপি গ্যাসের সংকট নেই বিষয়টি এমন নয়, সংকট আছে। তবে বেশি দামে বিক্রি করারও তো সুযোগ নেই। কিন্তু বাজারে তা হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে সমস্যা সমাধানের জন্য লোয়াবের পক্ষ থেকে আমরা বসেছিলাম। সংকট কাটাতে তারা এলপি গ্যাস আমদানির সীমা তুলে দেয়ার অনুমতি দিয়েছে। তবে চাইলেই তো তাৎক্ষণিকভাবে পণ্যটি আমদানি করা সম্ভব নয়। এটা আসতে অন্তত ৪৫ দিন সময় লাগে। এ মুহূর্তে জাহাজ সংকটের পাশাপাশি ভাড়াও অনেক বেশি। সরবরাহ ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও ওই অর্থে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হলে আজ এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না।’

দেশে এলপি গ্যাসের সংকট দিয়ে দুই পক্ষের (অপারেটর ও এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি) বিপরীতমুখী দাবিতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে। গতকাল এলপি গ্যাসের সংকট নিরসনে সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশকদের সঙ্গে আলোচনা করে পুনরায় এলপি গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের দাবি করা হয়েছে।

দেশে এলপি গ্যাস নিয়ে সৃষ্ট এ সংকট এখন ভোক্তা, পরিবেশক ও ব্যবসায়ীদের (অপারেটর) মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে। সংকটের মূল কারণ সমাধান না করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বাজারে মূল্য নির্ধারণ করায় বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন এলপি গ্যাস সমবায় সমিতি। তাদের অভিযোগ, এলপিজির মূল্য নির্ধারণে বিভিন্ন সময় সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে একাধিকবার বিইআরসিকে আলোচনা করতে চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিইআরসি বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে কখনই বসেনি।

এলপি গ্যাস নিয়ে দেশব্যাপী তৈরি হওয়া সংকট নিরসনে বিইআরসি কী করছে জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখানে রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে বিইআরসির ওই অর্থে কিছু করার নেই। তবে এলপি গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে বিইআরসির পক্ষ থেকে অপারেটরদের জানানো হবে। সেই সঙ্গে সৃষ্ট এ সংকট নিরসনে অপারেটর ও এলপি গ্যাস সমবায় সমিতির নেতাদের সঙ্গে আগামীকাল (আজ) বিইআরসি বসবে। এলপি গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সৃষ্ট এ সংকটে হঠাৎ করে সমবায় সমিতির ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামের কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

প্রসঙ্গত, প্রতি মাসে এলপিজির মূল্য সমন্বয় করে বিইআরসি। সর্বশেষ ৪ জানুয়ারি নতুন মূল্য ঘোষণা করে কমিশন। এ নিয়ে গতকাল সকালে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিইআরসি পরিবেশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই মূল্য সমন্বয় করেছে। এলপিজি সিলিন্ডারের সংকট দূর করায় জোর না দিয়ে বাড়তি দাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।

দেশের বাজারে বড় আকারে এলপি গ্যাস সরবরাহ করছে ফ্রেশ এলপি গ্যাস লিমিটেড। মেঘনা গ্রুপের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানটির আড়াই লাখ টন আমদানি সক্ষমতা রয়েছে। তারা নতুন করে আরো এক লাখ টন আমদানি বাড়াতে চায়। জ্বালানি বিভাগ থেকে অনুমোদন পেলে দ্রুত আমদানি কার্যক্রম শুরু করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। বিদ্যমান এলপিজি সংকটের পেছনে আমদানি সক্ষমতা বৃদ্ধির অনুমোদন ঝুলে থাকার বড় দায় আছে বলে মনে করেন কোম্পানিটির শীর্ষ নির্বাহীরা।

জানতে চাইলে ফ্রেশ এলপি গ্যাসের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) আবু সাঈদ রাজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফ্রেশ এলপি গ্যাস আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দুই বছর আগে মন্ত্রণালয়ে অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল। এর মধ্যে বগুড়া প্লান্টের জন্য ৬০ হাজার টন এবং মোংলা প্লান্টের জন্য ৯০ হাজার টন চাওয়া হয়েছিল। এতদিন তা অনুমোদন দেয়া হয়নি। যদিও সৃষ্ট সংকটের কারণে এখন ঝুলে থাকা এ প্রস্তাব অনুমোদনের আশ্বাস দেয়া হয়েছে। যদি এ অনুমোদন আরো আগে থেকে দেয়া হতো তাহলে হয়তো এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।’

এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সেলিম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপিজি নিয়ে গত ২০ বছরেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ২৭টা অপারেটরের মধ্যে মাত্র পাঁচটি গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে। বাজারে গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, সেটি কতটুকু আছে তা পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে। আমরা বিষয়টির সমাধান চাই। এরই মধ্যে বিইআরসির চেয়ারম্যান আমাদের ডেকেছেন, কাল (আজ) বেলা ৩টায় এটা নিয়ে বৈঠক হবে।’

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.