February 3, 2026, 3:44 pm


মোস্তফা কামাল আকন্দ

Published:
2026-02-03 13:56:08 BdST

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ কক্সবাজার, চাপ বাড়ছে পানি ও পরিবেশে


ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট, পানি শোধন এবং প্লাস্টিক আলাদা করে পুনর্ব্যবহার—এই তিনটি ক্ষেত্রেই কক্সবাজারে উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হলেও শহরের ১২টি ওয়ার্ডে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনও গড়ে ওঠেনি। এই প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সভা, আলোচনা ও নীতিনির্ধারণী ফোরামে তুলে ধরছেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী।

তাঁর মতে, কক্সবাজারের বর্জ্য সংকট কোনো প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার ফল নয়; বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা, দপ্তরগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের প্রতিফলন। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আজও কাগজের পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ।

কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন নগর। প্রতিদিন এখানে বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক, স্যুয়ারেজ ও ফিকাল স্লাজ উৎপন্ন হয়। অথচ শহরজুড়ে এখনো বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুনর্ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শহরের পানি, মাটি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর।

কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ দিন দিন বাড়ছে। ডিপিএইচই কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইবনে মায়াজ প্রামাণিক জানান, সদর উপজেলার ঝিলংজা ও ভারুয়াখালীতে ৪০–৬০ ফুট, ঈদগাঁওয়ে ২৫–৪৫ ফুট, রামুতে ২০–২৮ ফুট, চকরিয়ায় ২০–৪০ ফুট এবং পেকুয়ায় ১২–৪০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যাচ্ছে। এসব এলাকায় প্রতিবছর গড়ে ২–৫ ফুট করে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। রাজাপালং ও পালংখালী ইউনিয়নের কিছু এলাকায় এখন ১০০–১১০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে প্রতিবছর স্তর ৮–১৪ ফুট করে নিচে নামছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অনিয়ন্ত্রিত নলকূপ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেড়েছে।

বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার মো. জাকারিয়া বলেন, “কক্সবাজার একটি জটিল হাইড্রোজিওলজিক্যাল এলাকা। কনফাইনড ইকুয়েফার থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। মহেশখালী চ্যানেল ও বাঁকখালী নদীর লবণাক্ততার প্রভাবও ভূগর্ভস্থ পানিতে পড়ছে।”

শহরের স্যুয়ারেজ ও ফিকাল স্লাজের একটি বড় অংশ সরাসরি খোলা জায়গা, খাল ও নিচু জমিতে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্য ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে পানি দূষিত করছে। ফলে নিরাপদ পানির সংকট বাড়ছে এবং পরিশোধিত পানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

এই পরিস্থিতির কারণে কক্সবাজারে বাণিজ্যিক পানি বাজারও দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। জেলায় বর্তমানে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান পরিশোধিত পানি বিক্রি করছে। শহরেই রয়েছে প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, শহরে প্রতিদিন এক লাখ লিটার বাণিজ্যিক পানি সরবরাহ হচ্ছে।

কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট করা গেছে, সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট হচ্ছে, প্লাস্টিক আলাদা করে পুনর্ব্যবহারও সম্ভব হয়েছে। তাহলে কক্সবাজার শহরের ১২টি ওয়ার্ডে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যাবে না কেন? এটি অসম্ভব কিছু নয়।”

তিনি আরও বলেন, উৎসস্থলে বর্জ্য আলাদা করা, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি এবং ফিকাল স্লাজ নিরাপদভাবে প্রক্রিয়াজাত—এই চারটি কাজ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে কক্সবাজারের পরিবেশ ও পানির ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

বিশ্বের অনেক পর্যটন শহর ইতোমধ্যে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করেছে। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে কমিউনিটি-ভিত্তিক বর্জ্য পৃথকীকরণ ও রিসাইক্লিং ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। ভারতের আলাপ্পুজা শহর ‘ডিসেন্ট্রালাইজড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর মাধ্যমে ল্যান্ডফিল ছাড়াই বর্জ্য ব্যবস্থা করছে। শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট ও সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট একীভূতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারের মতো শহরে এসব মডেল বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে সহজ, কারণ এখানে ওয়ার্ড সংখ্যা সীমিত এবং পৌরসভাভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো বিদ্যমান।

বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালু হলে পৌরসভার প্রায় ৫৫ শতাংশ পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। তবে শুধু পানি সরবরাহ বাড়ালেই সমস্যা সমাধান হবে না। নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে না।

কক্সবাজারকে টেকসই পর্যটন নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখনই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে মৌলিক অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.