March 11, 2026, 3:04 pm


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-03-11 12:28:03 BdST

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং পেশাগত নৈতিকতার পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তবহু অভিযোগ স্বত্বেও বহাল তবিয়তে পরিচালক মীর সাজেদুর


পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মীর সাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং পেশাগত নৈতিকতার পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার অভিযোগ করা হলেও অদৃশ্য প্রভাবের কারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে যে, আওয়ামীপন্থী এই কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ের একজন প্রভাবশালী অতিরিক্ত সচিবের প্রশ্রয় পেয়ে থাকেন। ফলে তার বিরুদ্ধে যত অভিযোগই করা হোক না কেন, সেগুলো তদন্তের মুখ দেখে না। তার এই ধরনের কর্মকাণ্ড অধিদপ্তরের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও সুনামকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি গ্রেডেশন তালিকায় ৫১ নম্বর সিরিয়ালে অবস্থান করা সত্ত্বেও ২০২১ সালের পর থেকে আওয়ামী প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে পরিচালক পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি না পাওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী প্রভাব ও তদবিরের মাধ্যমে তিনি ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় পরিচালকের দায়িত্ব বাগিয়ে নেন, যা প্রচলিত পদোন্নতি ও প্রশাসনিক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ময়মনসিংহ বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তিনি তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে, ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ফাহমি গোলন্দাজ বাবেল এর তদবিরে তিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (আইইএম) পদে দায়িত্ব লাভ করেন।

অভ্যূত্থান পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট তিনি অফিসে এলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রোষানলে পড়েন এবং ভয়ে অফিস ত্যাগ করেন। এটি নিয়ে জাতীয় পত্রিকায় সংবাদও প্রকাশিত হয়। এরপর কয়েকদিন তিনি আত্মগোপনে থাকেন এবং অফিসে উপস্থিত হননি। পরবর্তীতে ভোল পাল্টিয়ে তিনি নিজেকে জামাতপন্থী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং পটুয়াখালী জেলার বাউফলের জামাত নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচয় দিতে থাকেন। কিছুদিনের মধ্যে পরিচালক (প্রশাসন) এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শফিকুল ইসলাম মাসুদের নির্বাচনী কার্যক্রমে সহায়তার জন্য বাউফলের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠকর্মীদের তিনি কাজ করতে বাধ্য করেছেন মর্মে অভিযোগ রয়েছে।

পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। কোনো লিখিত আবেদন বা সংশ্লিষ্ট উপ-পরিচালক কিংবা পরিচালকের অগ্রায়নপত্র ছাড়াই তিনি প্রায় ৩০০ জন চিকিৎসককে বদলি করেছেন। এই বদলি কার্যক্রমে প্রশাসনিক বিধি ও নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। এই কাজে তার সহযোগী হিসেবে ডা. সুলতান আহমেদ নামের একজন চিকিৎসক কর্মকর্তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়।

সূত্র মতে, প্রতিটি বদলির ক্ষেত্রে ১,০০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও অধিদপ্তরের অফিস সহায়ক থেকে অফিস সহকারী পদে পদোন্নতির একটি ফাইল লুকিয়ে ফেলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই বিষয়ে অভিযোগ দাখিল করা হলেও তা কোনো তদন্তের মুখ দেখেনি। অভিযোগ রয়েছে, এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে তিনি কর্মচারীদের রুমে ডেকে হুমকি-ধমকি দিয়েছেন।

মীর সাজেদুর রহমান পরিচালক (প্রশাসন) পদে দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে কোনরুপ আবেদন বা সংশ্লিষ্ট জেলা-বিভাগের কর্মকর্তার প্রত্যয়ন ছাড়াই আপন খালাতো বোন আবিদা সুলতানাকে (পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা) ১৮৯ নং স্মারকের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ৮ই জানুয়ারি বটিয়াঘাটা, খুলনা থেকে পটুয়াখালী সদরে বদলি করেন।

একইভাবে, মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস ট্রেইনিং সেন্টারের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা মাহবুবাকে ৩৮০০নং স্মারকের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জের কালপাহাড়িয়া এফডব্লিউসিতে বদলি করা হয়৷ কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই আবার তাকে পূর্বের পদে ফিরিয়ে আনা হয়।এছাড়াও নেত্রকোনা জেলার অফিস তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ নুরুল হককে ২০ জুলাই ২০২৫ তারিখের ২৬০৫ নং স্মারকে ময়মনসিংহ জেলায় সংযুক্ত করা হয়।

মীর সাজেদুরের বিরুদ্ধে এই ধরনের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রাক্তন মহাপরিচালক সাইফুল্লাহ হিল আজম বিদায় নেয়ার আগে ও পরে কয়েক দিনের নথিপত্র তদন্তের আওতায় আনলে অস্বাভাবিক বদলি-পদায়ন সংক্রান্ত বহু তথ্য পাওয়া যাবে।

প্রশাসন ইউনিটের তৎকালীন একজন কর্মকর্তা জানান নজিরবিহীন ভাবে পরিচালক (প্রশাসন) এর নির্দেশে অনেক ফাইল পিছনের তারিখ দেখিয়ে মহাপরিচালক এর বাসা থেকে অনুমোদন করে আনা হয়েছিলো। অত্যন্ত চতুরতার সাথে অনুমোদিত এসকল ফাইলের জিও গুলো একসাথে জারি না করে ধীরে ধীরে করা হয়েছিলো। তিনি আরও আশংকা প্রকাশ করে বলেন, এই বিষয়ে তদন্ত করলে অনেকেরই চাকরি থাকবে না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই সুযোগে তৎকালীন প্রশাসন ইউনিটের একজন কর্মকর্তা উপপরিচালক পদে একটি জেলায় মন্ত্রণালয়ের আদেশে পদায়িত হয়ে থাকা স্বত্বেও ওই আদেশটি বহাল থাকা অবস্থায় অধিদপ্তরে নিজের আরেকটি আদেশ করান।

এই বিষয়ে মন্ত্রনালয়ে যোগাযোগ করলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান- “ওই কর্মকর্তা উপরিচালক হিসেবে পদায়নের সেই আদেশটি বাতিল না করেই পরিচালক (প্রশাসন) এর সহযোগিতায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে আদেশটি করিয়েছেন যার কপি এ বিভাগে প্রেরণ করার মাধ্যমে জানতে পারি।”

এথেকেই বুঝা যায় স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ওই প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিষয়টি জানলেও অজানা কারণে চুপ ছিলেন। এই বিষয়ে অধিদপ্তরের একজন পরিচালক জানান, “পরিচালক (প্রশাসন)- মীর সাজেদুর রহমান জ্ঞাতসারেই নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য এ ধরণের প্রশাসনিক বিশৃংখলার সুযোগ করে দিয়েছেন। তা না হলে মন্ত্রণালয়ের আদেশাধীন অথচ বাস্তবায়িত হয়নি এই ধরনের প্রশাসনিক ফাইল উপস্থাপন এবং একাধিক কর্মকর্তা হয়ে অনুমোদনের সুযোগ নেই। তাঁর কর্মকালীন সময়ের সকল নথি তদন্ত করলে এধরনের অনেক অনিয়ম বের হয়ে আসতে পারে।”

সাম্প্রতিক সময়ে উপসচিব পদে পদোন্নতির প্রস্তাব প্রেরণের ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। ব্যক্তিগত রোষানলের কারণে বেশ কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তার আবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে, যার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা মহাপরিচালকের কাছেও অভিযোগ করেছেন মর্মে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদপ্তরের একজন উপপরিচালক জানিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, মীর সাজেদুর রহমান তার অপকর্মের সহযোগী ৩১তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা নাজমুর রওশন সুমেলকে পদোন্নতি না পাওয়া সত্ত্বেও ময়মনসিংহ বিভাগে সহকারী পরিচালক হিসেবে পদায়ন করান। নিজে অধিদপ্তরে আসার পরে তাকে আইইএম ইউনিটে নিয়ে আসা হয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলে এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে সুমেলের ইশারা ছাড়া কোনো ফাইলের কাজ হয় না। আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক বিষয়ে তিনি মীর সাজেদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মীর সাজেদুর রহমান ময়মনসিংহ বিভাগে পরিচালকের দায়িত্ব পালনের সময় নাজমুর রওশন সুমেলের উত্থান শুরু হয়। নিজে পদোন্নতি ব্যতিত সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণসহ বিভাগীয় অফিসের মাধ্যমে বদলী-পোস্টিংয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখায় এই জুনিয়র কর্মকর্তা। এমনকি জেলার তৎকালীন নিয়োগেও তাদের নিয়মবহির্ভূত হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। মীর সাজিদের প্রশ্রয়ে প্রশাসন ইউনিটের যেকোন ফাইলে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক সময়ের আইইএম ইউনিটের একজন অফিস সহায়ককে নাজমুর রওশন সুমেল এর ইন্ধনে অধিদপ্তরের বাহিরে বদলী করা হয়েছে বলে জানা যায়।

সাম্প্রতিক নিয়োগ কার্যক্রম নিয়েও তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগের ফলাফল প্রকাশের আগে ফলাফল টেম্পারিং করা হয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। যেখানে মীর সাজেদুর রহমানের পাশাপাশি দুর্ণীতির দায়ে তদন্তাধীন নাজমুর রওশন সুমেল-এর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এই কাজে সহযোগিতা করতে চাপ দেওয়া হলে প্রশাসন ইউনিটের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা অধিদপ্তর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা যায়।

যেখানে উপপরিচালক সায়মা রেজা-কে কেন্দ্র করে একটি অস্বচ্ছ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সায়মা রেজা সংশ্লিষ্ট পদ না থাকা সত্ত্বেও প্রায় ১০ বছর ধরে সংযুক্তিতে পেনশন ইউনিটে কাজ করছেন এবং এই ইউনিটে থাকার জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে দুটি ভিত্তিহীন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পেনশন সংক্রান্ত ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অলিখিতভাবে সায়মা রেজা ও পরিচালক (প্রশাসন) মীর সাজেদুর রহমানকে অর্থ প্রদান করতে হয়। অর্থ প্রদান না করলে মাসের পর মাস ফাইল অগ্রসর হয় না, কিন্তু অর্থ দিলে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়। পেনশন সহজীকরণের কথা সরকার থেকে বলা হলেও সায়মা রেজা অযাচিত ব্যাখ্যা চেয়ে কাল ক্ষেপণ করে। পেনশন ইউনিটের আবেদনসমূহ এবং নিষ্পত্তির কাজে সহযোগিতার জন্য প্রায় ছয় মাস আগে একজন কল্যাণ কর্মকর্তাকে পেনশন ইউনিটে পদায়ন করা হলেও তাকে কোনো দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি এবং তাকে অন্যত্র বদলি হয়ে যেতে চাপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও সায়মা রেজার সঙ্গে মীর সাজেদুর রহমানের ব্যক্তিগত ও অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ বিভিন্ন মহলে আলোচিত। সায়মা রেজা নিয়মিত বাসা থেকে তার পছন্দের খাবার রান্না করে নিয়ে আসেন এবং প্রতিদিন দুপুরে প্রায় এক ঘণ্টা অফিসের দরজা বন্ধ রেখে তারা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। এমনকি এই বিষয়টি পারিবারিক পর্যায়ে জানাজানি হলে তাঁর স্ত্রী একাধিকবার অফিসে এসেছেন বলেও জানা যায়।অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন ইউনিটের অনেক ফাইল সায়মা রেজার সঙ্গে আলোচনা ছাড়া মীর সাজেদুর রহমান অনুমোদন করেন না। এতে ওই ইউনিটের অন্যান্য কর্মর্তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এসব অভিযোগের কারণে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা ও সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তাই জনস্বার্থে উল্লিখিত অভিযোগসমূহের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.