March 19, 2026, 7:51 am


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-03-19 04:47:57 BdST

গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগসংসদে ‘৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার’ সাউন্ড সিস্টেম অচল, হেডফোনে শব্দ বিভ্রাট


দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনেই ঘটে গেল প্রযুক্তিগত বিপর্যয়। প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা নতুন সাউন্ড সিস্টেম এবং হেডফোন ব্যবস্থায় মারাত্মক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় অধিবেশন চলাকালে মাইক কাজ করেনি, স্পিকারকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে হয়েছে আর সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেছেন নিম্নমানের হেডফোন ব্যবহারের ফলে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ করেই সাউন্ড সিস্টেমে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। স্পিকার মাইকে কথা বললেও তা স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সংসদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হন স্পিকার। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে অধিবেশন পরিচালনা করতে হয়। এসময় প্রায় ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়। বিরতির পর অধিবেশন আবার শুরু হলেও কিছু সময় পর্যন্ত শব্দ বিভ্রাট অব্যাহত ছিল। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় উপস্থিত সংসদ সদস্যদের মধ্যেও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

এই ঘটনার পর প্রাথমিক অনুসন্ধানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলীর গাফিলতি ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কেন এমন বিপর্যয় ঘটলো।

“হেডফোনে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা”: সংসদ সদস্যদের অভিযোগ

প্রথমে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমেদ বিন কাশেম (ব্যারিস্টার আরমান) সংসদে দেওয়া হেডফোনের মান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

গত বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেন, “সংসদে দেওয়া হেডফোনের মান এতটাই খারাপ যে এটি ব্যবহার করতে গিয়ে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা শুরু হয়েছে। সাউন্ড কোয়ালিটিও অত্যন্ত নিম্নমানের।”

তিনি আরও দাবি করেন, সংসদের পুরোনো ডিভাইসগুলোও সম্ভবত এর চেয়ে পরিষ্কার অডিও দিত। এই বিষয়টি তাকে হতাশ করেছে বলেও উল্লেখ করেন ব্যারিস্টার আরমান।

তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কেনা সরঞ্জামের মান যদি এমন হয়, তবে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তোলে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘হেডফোনের জন্য মনে হয় একটা বাজেট করেছিল, আর ওখান থেকে লুটপাট বাহিনীরা একটা বিল করে খাওয়ার জন্য এ ব্যবস্থা করেছেন। সাউন্ড সিস্টেমটা সুন্দর করার জন্য একটি সাধারণ হেডফোন দিলে আমরা শুনতে পাব। কিন্তু এত বড় বোঝার দরকার নেই। হেডফোন ছাড়াও সংসদের সাউন্ড সিস্টেমটা আধুনিকায়ন করলে খুশি হব’।

১৫ই মার্চ (মঙ্গলবার) জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত (পয়েন্ট অব অর্ডার) আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন। স্পিকারের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, 'আমরা তো আরও দুবার সংসদে এসেছি, আপনিও এসেছেন। কিন্তু এত বড় একটা (হেডফোন দেখিয়ে) বোঝা মাথার ওপর দিয়ে এক-দুই ঘণ্টা বসা সবার জন্য কষ্টকর হচ্ছে।'

এছাড়া, অধিবেশন চলাকালে আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন যে তাদের ব্যবহৃত হেডফোন ঠিকভাবে কাজ করছিল না। স্পিকারের মাইকও ছিলো বন্ধ!

নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বক্তব্য দিতে গিয়ে দেখেন মাইক কাজ করছে না। কয়েকবার চেষ্টা করেও শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে তাকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হয়। স্পিকার তখন বলেন, “যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে কথাবার্তা ঠিকমতো শোনা যাচ্ছে না। সবাইকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।” পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। বিরতির পর আবার অধিবেশন শুরু হয়।

নিম্নমানের মালামাল ক্রয়ে হরিলুট; পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ

সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলী—অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল হক চৌধুরী, গণপূর্ত ইএম বিভাগ-৭ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেন, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সংসদ অধিবেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সাউন্ড সিস্টেম চালুর আগে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ দিন নিবিড় পরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এবার সেই প্রক্রিয়া ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়েছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকৌশলীরাই সাউন্ড সিস্টেম কেনা ও স্থাপনের পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করেছেন।

এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল হকের নাম। কারণ ২০১৮ সালে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সংসদ ভবনে প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছিল। অধিবেশন চলাকালে প্রায় ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিলো সংসদ ভবনে। এই বিষয়টি নিয়ে সেই সময়ও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু এত বড় একটি ঘটনার পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেন প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপন অমান্য করে এপিপির কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান করে আমানত এন্টারপ্রাইজ সহ পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংসদ ভবন এলাকার পূর্বনির্ধারিত কাজের ৭০ ভাগ কাজের দরপত্র তিনি ওটিএম পদ্ধতিতে আহবান করেছেন যা সম্পুর্ন বিধিবহির্ভুত।

সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও শব্দ বিভ্রাটের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বারবার একই ধরনের সমস্যা ঘটলেও কেন যথাযথ তদারকি এবং ঘটনার সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

প্রশাসনিক সূত্র বলছে, সংসদ ভবনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। অনেক সময় দেখা যায়, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতার চেয়ে প্রশাসনিক প্রভাব বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে প্রকৃত যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন না হয়ে অন্য বিবেচনায় অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে বড় ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নানা ধরনের ত্রুটি দেখা দেয়।

অনভিজ্ঞ ঠিকাদারকে কাজ!

প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমটি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চালু করা হয়েছিল এবং মাত্র দুই বছর ছয় মাস ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ‘শিওর’-এর তৈরি করা এই সিস্টেমের স্বাভাবিক কার্যকাল ধরা হয় ১০ বছর। এর আগে, সাউন্ড সিস্টেম সরবরাহের কাজ করেছিলো কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে জাতীয় সংসদ ভবনে আন্দোলনকারীদের হামলায় প্ল্যানারি হলের উল্লিখিত সাউন্ড সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের জন্য কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী এনে সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করানো হয়। কিন্তু রহস্যজনকভাবে এই কোম্পানিকে বাদ দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সংসদ ভবনের হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপনের এই কাজটি করেছে  'আমানত এন্টারপ্রাইজ' নামে একটি প্রতিষ্ঠান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানের আগে সংসদ ভবনে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। অথচ দীর্ঘদিন সংসদের অডিও সিস্টেমের কাজ করা প্রতিষ্ঠান 'কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড'কে বাদ দিয়ে নতুন এই ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়।

এই বিষয়ে কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সাথে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান জোয়ারদার বলেন, “আমরা বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে সিস্টেম পরীক্ষা করেই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিয়েছিলাম। কিন্তু সুকৌশলে আমাদের বাদ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়।”

এই বিষয়ে কথা বলতে আমানত এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার দুলাল মিয়াকে একাধিকবার ফোন দিলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

স্বাভাবিকভাবেই এখন প্রশ্ন উঠেছে যে, যে প্রতিষ্ঠানটির অতীতে কখনও সংসদ ভবনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কাজ করার অভিজ্ঞতাই নেই তাহলে কোন যোগ্যতায় এবং কিভাবে আমানত এন্টারপ্রাইজ এই কাজের দায়িত্ব পেল। তাদের সরবরাহকৃত সরঞ্জামের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে কি না এবং সরঞ্জাম সরবরাহের আগে যথাযথ কারিগরি যাচাই করা হয়েছিল কি না।

সচেতন নাগরিকদের মতে, সাউন্ড সিস্টেম সরবরাহের দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে কাজ সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত যারা যুক্ত ছিলেন, তাদের সবাইকেই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। যথাযথ কারিগরি মূল্যায়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি নাও হতে পারত বলে মনে করছেন অনেকেই।

কোটি টাকার কাজ, দায় নিতে কেউ রাজি নয়

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, সংসদ ভবনে এসি, আলো, মাইক্রোফোন ও অডিও সিস্টেমসহ প্রায় ১২ কোটি টাকার কাজ বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। একেকটি গুজনেক মাইক্রোফোনের দাম ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং হেডফোনের দাম প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। অতীতের ন্যায় এবারও যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় অডিও ব্র্যান্ড ‘শিওর’-এর তৈরিকৃত হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন বসানো হয় সংসদে। তবে, অনভিজ্ঞ ঠিকাদার দিয়ে কাজ করানোর কারণেই এই বিপত্তি ঘটেছে। তারা ঠিকমতো হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপন করতে পারেনি।

এদিকে, অনভিজ্ঞ কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার বিষয়টি গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তাই স্বীকার করেছেন। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার দায় নিতে রাজি নন কেউই। এই বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “হেডফোন ও মাইক্রোফোন কাজ করেনি—এটা শুনেছি। কিন্তু বিস্তারিত জানি না। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এই বিষয়ে জানেন। তিনিই ভালো বলতে পারবেন কেন এমন ঘটনা ঘটলো।"

এই বিষয়ে কথা বলতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের (সংসদে দায়িত্বপ্রাপ্ত) নির্বাহী প্রকৌশলীর নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি

অন্যদিকে, সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা সরাসরি বলেন, “এর দায় আমার না। তাই এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না।”

প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ?

এই বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে আরেকটি ঘটনা। সংসদে প্রযুক্তিগত ত্রুটির অভিযোগ যেসকল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উঠেছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার কারিগরি প্রশিক্ষণের নামে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণে আটজন কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন। তারা হচ্ছেন,  অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল হক, উপসচিব মো. নাজমুল আলম, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফিরোজ হাসান, প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাজু আহমেদ, নির্বাহী স্থপতি সিদ্দিকা নাসরিন সুলতানা এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রিসালত বারী।

উপসচিব মো. নাজমুল আলম বলেন, “এই সফরের সব ব্যয় বহন করবে ‘ডানহাম–বুশ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাদের টাকায় বিদেশ যাওয়া হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই।”

এই বিষয়ে দ্য ফিন্যান্স টুডের বিশেষ অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হকের কয়েক মাস পর অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা সত্ত্বেও তিনি বিদেশে কারিগরি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাচ্ছেন।

এই প্রশিক্ষণের বিষয় হচ্ছে এইচভিএসি বা হিটিং, ভেন্টিলেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ। সাধারণত এই ধরনের প্রশিক্ষণ মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী বা প্রযুক্তিবিদদের জন্য বেশি প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা কর্মকর্তারাও এই প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এই প্রশিক্ষণ আদৌ প্রয়োজনের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে, নাকি এটি কেবল বিদেশ সফরের একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

স্বার্থের দ্বন্দ্ব: টিআইবি

এই বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের টাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ যাওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক সমস্যা। এতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয় এবং সরকারি ক্রয়নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আর একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টাকায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নৈতিকতার পরিপন্থী।

তার মতে, বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমেই প্রযুক্তিগত অনেক তথ্য জানা সম্ভব। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এসব সফর বাস্তবে প্রশিক্ষণের চেয়ে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি এতে স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ও জড়িত থাকে।

সচেতন মহলের প্রশ্ন

জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোটি টাকার নতুন সাউন্ড সিস্টেম প্রথম অধিবেশনেই অচল হয়ে পড়ার ঘটনায় প্রশাসনিক মহল, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে এমন প্রযুক্তিগত বিপর্যয়কে অনেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেম বসিয়েও উদ্বোধনী অধিবেশনেই মাইক অচল, হেডফোনে অভিযোগ, অধিবেশন স্থগিত— এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো ?

সচেতন মহলের প্রশ্ন— এটি কি শুধুই প্রযুক্তিগত ত্রুটি, নাকি কমিশন–নির্ভর ঠিকাদারি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার ফল? নাকি সুনিপুণ কোনো দুরভিসন্ধী?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এখানে সামান্য ত্রুটিও বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রতিটি যন্ত্রপাতি স্থাপন থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্যন্ত সবকিছুতে সর্বোচ্চ মানের পেশাদারিত্ব প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখলে মনে হচ্ছে সেই পেশাদারিত্বের ঘাটতি রয়েছে।

এদিকে, এই ঘটনার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকে যাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। এরকম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর প্রযুক্তিগত মান আন্তর্জাতিক মানের হওয়া উচিত। কারণ সংসদের প্রতিটি কার্যক্রমে দেশের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকে। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতাই প্রকাশ করে না, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক মান নিয়েও প্রশ্ন তুলে দেয়।

অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে দেখলে চলবে না। এর পেছনে যদি গাফিলতি, দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনার কোনো বিষয় থেকে থাকে, তবে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে সেজন্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.