শাহীন আবদুল বারী
Published:2026-03-27 13:17:30 BdST
রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন মাসুদ চৌধুরী
মানব পাচার মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে সাবেক প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছে।
স্বীকারোক্তিতে তিনি বলেছেন, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পট পরিবর্তন, সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, দুই নেত্রীসহ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, নানা শর্ত নিয়ে দুই নেত্রীর সঙ্গে সিরিজ বৈঠক, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং এক-এগারো সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মূল কুশীলব ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। পুলিশ রিমান্ডে ধাপে ধাপে জিজ্ঞাসাবাদে সরল স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে সব বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তার দেয়া জবানবন্দিতে ধাপে ধাপে আরো কয়েকজন ষড়যন্ত্রকারীকে গ্রেফতার করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ওয়াকিবহাল সূত্রমতে, এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তারের পর বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পুলিশ রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হয়েছিল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশে।ডিজিএফআইয়ের একটি দল তারেক রহমানকে নির্মমভাবে নির্যাতন করেছিল। মাইনাস টু ফর্মুলার নামে জিয়া পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন ১৯৭৫ সালে রক্ষী বাহিনী থেকে সেনাবাহিনীতে আসা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। এমনকি ২০০৮ সালের ১৮ জানুয়ারি দিনাজপুরে খালেদা জিয়ার মায়ের মৃত্যু হলে পরের দিন ১৯ জানুয়ারি ৬ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়ে তাকে জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এছাড়া নানির লাশ দেখার জন্য প্যারোলে মুক্তি পান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। ওই দিন প্যারোলে মুক্তির পর দুই সন্তানের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ যেন না হয় এই সিদ্ধান্তও দেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিকালে প্রথমে আরাফাত রহমান কোকোকে নানির মরদেহ শেষবারের মতো দেখার জন্য ক্যান্টনমেন্টের শহীদ মইনুল রোডের বাসায় নেওয়া হয়। কোকো দেখে চলে যাওয়ার পর তারেক রহমানকে এবং তারেক রহমান নানির মরদেহ দেখে চলে যাওয়ার পর মায়ের মুখ দেখাতে মইনুল রোডের বাসায় আনা হয় খালেদা জিয়াকে। এসব বিষয়েও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
এক-এগারো সরকারের আমলে কারা অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের ডিআইজি প্রিজন্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মেজর শামসুল হায়দার ছিদ্দিকী। তিনি বলেন, পুলিশি রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমরা সুস্থ শরীরে তারেক রহমানকে পুলিশের হাতে তুলে দিই। কিন্তু রিমান্ড শেষে তারেক রহমানকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে ফেরত আনা হয়। তখন কারাগারে তারেক রহমান একা চলতে এবং উঠতে বসতে পারতেন না।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই নেত্রীকে রাখা হয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ কারাগারে। ওই বিশেষ কারাগারে আগামী নির্বাচন, কারামুক্তি, দেশের পরবর্তী শাসনভারসহ নানা ইস্যুতে তৎকালীন সরকারের প্রতিনিধিরা খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার সঙ্গে দরকষাকষি করেছিলেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করতেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওই সময়ে মাসুদ উদ্দিনের নকশাতেই খালেদা জিয়াকে ১৩টি শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশ ও জাতির স্বার্থবিরোধী হওয়ায় তিনি কোনো শর্তই মানেননি, আপসও করেননি। তবে শেখ হাসিনা সব শর্ত মেনে নেন। এসব বিষয়ে মাসুদ উদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকারও করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মাসুদ উদ্দিন পুলিশকে বলেছেন, সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পেছন থেকে তারাই পরিচালনা করতেন। তখনকার ফখরুদ্দিন সরকারের নেওয়া সব সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আসত। আর এসব সিদ্ধান্তের বড় অংশই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দিতেন এবং সমন্বয় করতেন। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের আগে তিনি অনুমোদন দিতেন বলেও পুলিশি রিমান্ডে স্বীকার করেছেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার চেয়ারে বসানোর পুরো পরিকল্পনা কে বা কারা সাজিয়েছিল, এ ব্যাপারে মাসুদ উদ্দিন পুলিশকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় অভিযানও করা হচ্ছে।
দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে আবেদনঃ মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের দুর্নীতির মামলায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছে দুদক। গত বুধবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ গ্রেপ্তার দেখানোর এই আবেদন করেন।
ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মঈনউদ্দীন চৌধুরী আসামির উপস্থিতিতে শুনানির দিন আগামী ৯ এপ্রিল ঠিক করেছেন।
সম্পদের তথ্য তলব করবে দুদক আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সম্পদের তথ্য তলবের উদ্যোগ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
দুদকের এই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সি ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড সংশ্লিষ্ট চারজনের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। দুদক যাদের নোটিশ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তারা হলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, নূর মোহাম্মদ আব্দুল মুকিত, মেহবুবা আফতাব সাথী ও তাসনিয়া মাসুদ। এ চারজনই ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনালের অংশীদার। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এ কোম্পানির এমডি। মেহবুবা আফতাব সাথী একজন প্রতারণা।
দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারির অনুমোদন আগেই কমিশন দিয়েছিল। তবে ওই সময় তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা না যাওয়ায় নোটিশ পাঠানো হয়নি। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ায় তিনিসহ সংশ্লিষ্টদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারির প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
