April 9, 2026, 10:10 pm


নিজস্ব প্রতিবেদক

Published:
2026-04-09 20:26:02 BdST

অনুমোদনহীন নির্মাণে ছাড় নেইরাজউকের মোবাইল কোর্টে জব্দ মিটার, লাখ টাকার জরিমানা


রাজধানীর গাবতলী, দারুস সালাম ও মিরপুর এলাকায় অবৈধ ও নকশাবহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে আবারও বড় ধরনের সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল ২০২৬) পরিচালিত এই মোবাইল কোর্টে ১২টি নির্মাণাধীন ভবনের বিরুদ্ধে একযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযানে অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, মিটার জব্দ এবং নগদ জরিমানা আদায়ের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা রাজধানীতে চলমান অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সংস্থাটির কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন।

রাজউকের জোন-৩/২-এর আওতাধীন পর্বত সিনেমা হল সংলগ্ন এলাকা এবং খালেক সিটি আবাসিক এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহনাজ পারভীন বীথি। তার সঙ্গে ছিলেন অথরাইজড অফিসার মাসুক আহমেদ, সহকারী অথরাইজড অফিসার, প্রধান ইমারত পরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে পুরো অভিযানটি পরিচালিত হয়।

অভিযান চলাকালে পরিদর্শনে দেখা যায়, অধিকাংশ ভবনই রাজউকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হচ্ছে কিংবা অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত তলা বা অংশ নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পুরো প্রকল্পই অনুমোদনবিহীনভাবে গড়ে তোলা হচ্ছিল। ১২টি নির্মাণাধীন ভবনের প্রতিটিতেই কোনো না কোনো ধরনের গুরুতর অনিয়ম পাওয়া যায়, যা নগর পরিকল্পনার মৌলিক নিয়মকে অগ্রাহ্য করার সামগ্রিক প্রবণতাকেই সামনে নিয়ে আসে।

চিহ্নিত অনিয়মগুলোর মধ্যে রয়েছে—অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ, অনুমোদিত নকশা অমান্য করে অতিরিক্ত তলা বা অংশ যুক্ত করা, নির্ধারিত সীমানা লঙ্ঘন এবং নিরাপত্তা বিধি না মেনে নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালনা। এসব অনিয়ম ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযানে মোট ৮ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় নাসির উদ্দিন গং-এর ‘স্বর্ণলতা গার্ডেন’ প্রকল্পে, যেখানে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ চলছিল। এছাড়া মনির হোসেন গং-এর ভবনে ২ লাখ টাকা এবং আরিফুজ্জামানের ভবনে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। রাজউক কর্মকর্তারা জানান, এসব জরিমানা তাৎক্ষণিকভাবে আদায় করা হয়েছে।

শুধু জরিমানাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি অভিযান। অনিয়মের মাত্রা বেশি হওয়ায় ৮টি ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছে বৈদ্যুতিক মিটার হস্তান্তর করা হয়। এতে অবৈধ নির্মাণ কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম থেকে বিরত থাকার জন্য মালিকদের সতর্ক করা হয়।

অভিযানের সময় কয়েকটি ভবনের অবৈধ অংশ তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে আংশিক অপসারণ করা হলেও বাকি অবৈধ অংশ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজ দায়িত্বে সরিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া কয়েকজন ভবন মালিককে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখিত অঙ্গীকারনামা দিতে বাধ্য করা হয়, যেখানে তারা ভবিষ্যতে রাজউকের অনুমোদন ছাড়া কোনো নির্মাণকাজ করবেন না এবং অবশিষ্ট অবৈধ অংশ নিজ উদ্যোগে অপসারণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

বিশেষ করে পর্বত সিনেমা হল সংলগ্ন এলাকায় একাধিক প্লটে অনুমোদনবিহীন নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়মের চিত্র এই অভিযানে স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অভিযানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে যেটি হচ্ছে, একই মালিকের একাধিক প্রকল্পে একই ধরনের অনিয়মের উপস্থিতি। নাসির উদ্দিন গং-এর ‘স্বর্ণলতা গার্ডেন’, ‘বনলতা গার্ডেন’, ‘তরুলতা গার্ডেন’, ‘চারুলতা গার্ডেন’ এবং ‘বিসমিল্লাহ ভবন’ প্রকল্পে নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে নিয়ম ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করে আসছিল, যা নগর ব্যবস্থাপনার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এই ধরনের নকশাবহির্ভূত নির্মাণ শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়, বরং অগ্নিনিরাপত্তা, ভূমিকম্প সহনশীলতা এবং নাগরিক সেবার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। খালেক সিটি আবাসিক এলাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে এই ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অভিযান শেষে রাজউক কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। যারা অনুমোদন ছাড়া বা নকশা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ করবেন, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে এবং কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে এই ধরনের অভিযান নিয়মিত হলেও একই এলাকায় বারবার একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক শৈথিল্য এবং প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা—এসব বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেই হবে না; বরং নিয়মিত মনিটরিং, ডিজিটাল নজরদারি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই অনিয়ম বন্ধ করা কঠিন হবে।

রাজধানীতে অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের এই চিত্র একদিকে যেমন আইন প্রয়োগের দৃশ্যমানতা তুলে ধরে, অন্যদিকে নগর ব্যবস্থাপনার গভীরে থাকা দুর্বলতাগুলোকেও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.