সামিউর রহমান
Published:2026-04-29 00:57:25 BdST
আবারও উত্তপ্ত ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডনিউমার্কেটে অজ্ঞাত আততায়ীর গুলিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন নিহত
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শাহনেওয়াজ হোস্টেলের সামনে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন (৩৮)। তার পুরো নাম খন্দকার নাঈম আহমেদ।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে নিউ মার্কেটের পাশের বটতলা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত টিটন রাজধানীর জিগাতলার হাজারীবাগ এলাকার ফখরুদ্দিন আহম্মেদের ছেলে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সময় টিটন নীলক্ষেত সংলগ্ন বটতলা এলাকার শহীদ শাহ নেওয়াজ হলের ১ নং গেটের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় একটি মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। এসময় স্থানীয় জনতা ঘাতকদের ধাওয়া করার চেষ্টা করলেও তারা ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এলাকা ত্যাগ করে। হামলাকারীদের মাথায় ক্যাপ এবং মুখে মাস্ক থাকায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরে, মুমূর্ষু অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত সাড়ে আটটার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, নিহত টিটনের শরীরে মোট ৫টি গুলি চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নিহতের মাথায় ৩ রাউন্ড, বাম হাতে ১ রাউন্ড ও বাম হাতের বগলের নিচে ১ রাউন্ড গুলিবিদ্ধ হয়।
ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, নিউমার্কেটে এলাকা থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এক ব্যক্তিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়েছিল। পরে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে ওই ব্যক্তির নাম পরিচয় জানা না গেলেও পরে পিবিআই ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করে। নিহতের মরদেহ বর্তমানে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে রাখা হয়েছে।
এই হত্যাকান্ডের ঘটনার নিকটতম প্রত্যক্ষদর্শী রতন নামে এক যুবক বলেন, নিহয় টিটন হেঁটে বটতলা এলাকা থেকে নিউমার্কেটের দিকে যাচ্ছিলেন। শহীদ শাহ নেওয়াজ হলের গেটের কাছে একটি মোটরসাইকেলে দুইজন অপেক্ষা করছিলেন। ওই যুবক আসতেই একজন মোটরসাইকেল থেকে নেমে ৪ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে টিটন মাটিতে পড়ে গেলে হামলাকারী এগিয়ে গিয়ে মাথায় আরেকটি গুলি করে। সেসময় আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা তাদের লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়ে। পরে মোটরসাইকেলে তারা পালিয়ে যায়।
রাজধানীর নিউমার্কেটের মতো জনবহুল একটি এলাকায় এমন দুঃসাহসিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং ঘাতকদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধ জগতের পুরনো শত্রুতা ছাড়াও এই খুনের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের একাধিক সূত্র দাবি করেছে যে, আপন বোনজামাইয়ের সঙ্গে আধিপত্য নিয়ে বিরোধে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর টিটন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পুনরায় সক্রিয় হন। এতে টিটনের উপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন তারই দুলাভাই ইমন। এই বিষয়টি টিটন হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী শীর্ষ সন্ত্রাসী ক্যাপ্টেন ইমনের সঙ্গে টিটনের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। সম্পর্কের দিক থেকে নিহত টিটন ছিলেন ক্যাপ্টেন ইমনের শ্যালক। এই পারিবারিক ও অপরাধ জগতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরেই এই খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কে এই টিটন?
খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন ঢাকার রায়েরবাজার ও হাজারীবাগ এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের শ্যালক (ইমন টিটনের ছোট বোন নীলাকে বিয়ে করেন)। মূলত ইমনের দাপটেই তিনি অপরাধ জগতে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তারা দুজনই মোহাম্মদপুর এলাকার হারিছ-জোসেফ গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং টিটনের তৎপরতা ছিল ধানমণ্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায়।
টিটনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার একাধিক মামলা রয়েছে। বিএনপি-জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল; সেই তালিকার দ্বিতীয় নাম্বারে ছিল এই টিটন।
নব্বইয়ের দশকে অপরাধ জগতে হাতেখড়ি হওয়া টিটনের অপরাধের তালিকা দীর্ঘ। ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান আসামি ছিলেন তিনি। ২০০৪ সালে ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেফতার হওয়ার পর ২০১৪ সালে তিনি বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় কারাবন্দী থাকার পর ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর টিটন জামিন পান। কিন্তু আইনি জটিলতায় কারামুক্তি হয়নি। তবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান।
এদিকে, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর টিটন নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেননি এবং বর্তমানে পলাতক ছিলেন। তার অনুপস্থিতির কারণে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
তবে, মুক্তির মাত্র কয়েক মাসের মাথায় এই হত্যাকাণ্ড ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পদচারণায় ঢাকার অপরাধজগৎ আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে কি না, তা নিয়ে জনমনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
