February 5, 2026, 10:20 am


সামিউর রহমান লিপু

Published:
2026-02-05 04:41:58 BdST

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচননেত্রকোণায় বিদ্রোহী-কোন্দলে পাল্টে যেতে পারে ভোটের হিসাব


হাওর-পাহাড় ও সমতল অঞ্চল ঘেরা ভাটির শহর নেত্রকোনা জেলার পাঁচ সংসদীয় আসনে জাতীয় নির্বাচনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে একটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং আরেকটিতে রয়েছে দলীয় কোন্দল।

এই দুই চ্যালেঞ্জের মধ্যে হাওড়বেষ্টিত তিন উপজেলা মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুড়িতে বইছে ধানের শীষের পক্ষে জোর হাওয়া। তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনের হাওড়াঞ্চলে কেবল সবুজ ধানক্ষেত আর ভোটার-সমর্থকদের মুখজুড়ে স্লোগান ‘ধানের শীষ’।

এলাকাবাসী বলছেন, ভাটির মানুষের কোনো রাজনীতি নেই। তারা বিএনপি-আওয়ামী লীগ-জামায়াত বোঝে না। তারা বোঝে বাবর ভাই। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের একক প্রভাবে তার আসনে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও অন্তত দুটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও দলীয় কোন্দলের কারণে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট প্রার্থীরাও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলছেন বলে এলাকাবাসী বলছেন।

নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা)

গারো, হাজং ও বাঙালি অধ্যুষিত ভারতীয় সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-১ আসন।

এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের খেলাফত মজলিশের প্রার্থী (সাবেক এমপি জাতীয় পার্টি) গোলাম রব্বানী।

নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা)

জেলার সব দাপ্তরিক কার্যালয় থাকায় নেত্রকোনা সদর ও বারহাট্টা উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-২ আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি বিশিষ্ট অর্থোপেডিক্স চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১১ দলীয় জোটের হয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য ফাহিম রহমান খান পাঠান।

নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া)

ইতিহাস, ঐতিহ্যসমৃদ্ধ জেলার কেন্দুয়া-আটপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-৩ আসনটি। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

এই আসনটিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ড. মো. রফিকুল ইসলাম হিলালীর সঙ্গে স্বতন্ত্র হিসেব প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল।

সূত্র মতে, জেলা বিএনপির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিলালির বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পর তার নাম ব্যবহার করে এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে। কেন্দুয়া ও আটপাড়ায় বিএনপির উপজেলা কমিটি গঠনের নানা অনিয়মের কথা শোনা যাচ্ছে। দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে আত্মীয় ও আওয়ামী লীগের লোকজন দিয়ে পকেট কমিটি গঠন করার অভিযোগে ঝাড়ু মিছিল পর্যন্ত হয়েছে।

এদিকে, এই আসনে শুরুর দিকে যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতা মেজর সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক, পিএসসি (অবঃ) নির্বাচন করার লক্ষ্যে ব্যাপক গণসংযোগ করেন। সেই সময় এলাকায় তার ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে উঠে। তবে শেষ মুহুর্তে দলের বৃহত্তর স্বার্থে নির্বাচনী লড়াই থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন চৌকস এই সেনা কর্মকর্তা। তার অনুসারীদেরও দলীয় মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন মেজর (অবঃ) সিদ্দিক। বর্তমানে তিনি ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।

মেজর (অবঃ) সিদ্দিক ২০০৭ সাল থেকে জাতীয়তাবাদী দলকে শক্তিশালী করার জন্য দেশে বিদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যূথানের সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তরুন, জেন-জি প্রজন্ম, বিএনপি কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করতে ব্যাপক প্রচারনা চালিয়েছেন। ২৯ জুলাই হাউজ অব লর্ডস এবং হাউজ অব কমন্সে তিনি রক্তাক্ত বাংলাদেশের কথা তুলে ধরেন।

মেজর সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক, পিএসসি (অবঃ) গত ১৬ বছর লন্ডন থেকে জাতীয়তাবাদী দলের হাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সোশ্যাল মিডিয়াসহ সেমিনার, সাম্পোজিয়াম এবং বিভিন্ন টকশো করে দলের পক্ষে বলিষ্ঠ ভুমিকা রাখেন। তিনি ২০১০-১১ সালে যুক্তরাজ্য বিএনপির নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৮ থেকে সেনানিবাসে বিএনপি নেতা হিসেবে কথা বলার জন্য মেজর সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিককে পিএনজি (নিষিদ্ধ) করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে 'পিএনজি' তুলে নেয়া হয়।

২০১৯ সালের ৩১ মে গুম, আয়না ঘরে নির্যাতন, ৫ দিন রিমান্ডসহ ৩ মাস কারাগারে তাকে আটক রেখে ফ্যাসিস্ট সরকার নির্যাতন করে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব মেজর সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (অবঃ) নেত্রকোনার বাউল সাধক বাউল রশিদ উদ্দিন একাডেমির চেয়ারম্যান ও জেলা সাহিত্য সমাজের উপদেষ্ঠা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নির্বাচনী এলাকার আটপাড়া উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা।

এবার হয়তো এই অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তা বিএনপির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও নিঘাত দেশপ্রেমের কারনে নিজেকে নির্বাচন করা থেকে বিরত রেখেছেন। তবে আগামীতে যে তিনি এই আসন থেকে নির্বাচন করবেন সেই বার্তাটি স্থানীয় জনগনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। নিজেকে নির্বাচনী লড়াই থেকে সরিয়ে নেয়ায় সর্বমহলে ইতিমধ্যেই ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন মেজর সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (অবঃ)।

অন্যদিকে, জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন ভুইয়া দুলাল। বর্তমানে ভোটের লড়াইয়ে তিনি বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। যদিও দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে তবে তৃনমূলে ব্যাপক জনসমর্থন থাকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে হচ্ছে।

দেলোয়ার হোসেন ভুইয়া দুলাল কেন্দুয়া উপজেলার কান্দিউড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক দুইবারের চেয়ারম্যান। ১৯৯০ সালে কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, ২০০৫ সালে কেন্দুয়া পৌরসভার মেয়র, ২০১৪ সালে কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আসাদুল হক ভুইয়াকে বিশাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

নেত্রকোনা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী)

নেত্রকোনা জেলার ভাটিবাংলা হিসেবে পরিচিত তিনটি হাওড় উপজেলা নিয়ে এই আসনে আলোচিত প্রার্থী বিএনপির সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১১ দলীয় জোট প্রার্থী ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আল হেলাল তালুকদার।

এছাড়া বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার, ইসলামী আন্দোলনের মো, মুখলেছুর রহমান ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির চম্পা রানী সরকার আসনটিতে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা)

জেলার একমাত্র একটি উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-৫ আসনে বিএনপির জনপ্রিয়তা থাকলেও নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াত জোট প্রার্থী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করছেন।

এই আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাবেক ভিপি মো. আবু তাহের তালুকদার বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। ১১ দলীয় জোট প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অধ্যাপক মাছুম মোস্তফা।

তিনি বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফলে তৃণমূল ভোটারদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা বেশি বলে জানাচ্ছেন এলাকাবাসী। পক্ষান্তরে বিএনপির দলীয় কোন্দলের কারণে আসনটিতে ১১ দলীয় প্রার্থী শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। এছাড়া আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. নুরুল ইসলাম নির্বাচন করছেন।

দলীয় সূত্র অনুযায়ী, আবু তাহের তালুকদারের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে। ১৯৭৯ সালে তিনি নেত্রকোণা জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক, নেত্রকোণা সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি নেত্রকোণা জেলা ছাত্রঐক্যের আহ্বায়ক হিসেবেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

জেলা বিএনপির রাজনীতিতে তিনি তিনবার সাধারণ সম্পাদক ও একবার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালে তিনি পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।

আবু তাহের তালুকদার বলেন, “কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের আস্থা ও ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম চালাব। সকলকে আহ্বান জানাই-চলুন ব্যক্তিগত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক পতাকার নিচে, এক প্রতীকের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হই। আজ ব্যক্তি নয়, গ্রুপ নয়-আমাদের পরিচয় বিএনপি ও ধানের শীষ। ইনশাআল্লাহ, ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আমাদের লক্ষ্য সফল হবে।”

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.