মোস্তফা কামাল আকন্দ
Published:2026-02-26 20:49:01 BdST
রাষ্ট্র বনাম বাজার: পেশাগত নীতি না রাজনৈতিক আস্থা?অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ: ব্যবসায়ী গভর্নরের রাজনৈতিক পাঠ
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল এক ধরনের নীতিগত উচ্চারণ দিয়ে—প্রশাসনে দক্ষতা, অর্থনীতিতে প্রজ্ঞা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার ছিল সেই ঘোষণার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু রাষ্ট্রের বয়স যত বাড়ছে, মনে হচ্ছে সেই অঙ্গীকার ধীরে ধীরে “ব্যবহারিক বাস্তবতা” নামক এক নতুন দর্শনের কাছে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া সেই বাস্তবতারই এক উজ্জ্বল—অথবা বলা ভালো, অত্যন্ত শিক্ষণীয়—উদাহরণ। এটি কেবল একটি নিয়োগ নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনের এক নীরব বিপ্লব।
রাষ্ট্র পরিচালনার পুরোনো নিয়ম: দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রতিষ্ঠান
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদগুলোতে নিয়োগের একটি অলিখিত মানদণ্ড ছিল। অর্থনীতিবিদ, আমলা, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করা পেশাজীবী, গবেষক—সংক্ষেপে যারা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যন্ত্রপাতি কীভাবে চলে তা জানতেন, তারাই সাধারণত এসব পদে আসীন হতেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ তো আরও স্পর্শকাতর—এখানে দায়িত্ব শুধু সুদের হার নির্ধারণ নয়, বরং পুরো অর্থনীতির রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা। রাষ্ট্র তখন ভাবত—অর্থনীতি পরিচালনা ব্যবসা পরিচালনার মতো নয়।
এখন মনে হচ্ছে রাষ্ট্র নতুন করে ভাবছে—ব্যবসাই তো অর্থনীতি, সমস্যা কোথায়?
ব্যবসায়ীর যুক্তি বনাম রাষ্ট্রের যুক্তি
ব্যবসায়ী লাভ দেখেন। রাষ্ট্র স্থিতিশীলতা দেখে। ব্যবসায়ী ঝুঁকি নেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঝুঁকি কমায়। ব্যবসায়ী বাজারের সুযোগ খোঁজেন। গভর্নর বাজারের সীমা নির্ধারণ করেন।
এই মৌলিক পার্থক্য দীর্ঘদিন রাষ্ট্র বুঝেছিল বলেই দুই ভূমিকাকে আলাদা রাখা হয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এই পার্থক্য অতিরঞ্জিত। অথবা রাষ্ট্র বিশ্বাস করতে শুরু করেছে—যিনি ঋণ নেন তিনিই ঋণ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে দক্ষ।
নতুন রাজনৈতিক অর্থনীতি: আস্থাই এখন যোগ্যতা
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সরকার আস্থাভাজন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সেই আস্থা পেশাগত দক্ষতার জায়গা দখল করে নেয়, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে স্বাধীনতা হারায়। প্রতিষ্ঠান তখন নীতির ভিত্তিতে নয়, সম্পর্কের ভিত্তিতে চলে। এবং রাষ্ট্র তখন প্রশাসনিক কাঠামো থেকে সরে গিয়ে আস্থার ওপর দাঁড়ানো এক ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় রূপ নেয়। এটি হয়তো নতুন প্রশাসনিক দর্শন—“যোগ্যতার চেয়ে বিশ্বস্ততা নিরাপদ।”
বিরলতার মাহাত্ম্য
বিশ্বে ব্যবসায়ী থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হওয়ার ঘটনা আছে, তবে তা বিরল। কারণ এখানে স্বার্থের সংঘাত, নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং বাজার প্রভাবের প্রশ্ন জড়িত থাকে। বাংলাদেশে যেখানে ব্যাংকিং খাত ইতিমধ্যেই ঋণখেলাপি সমস্যা, তারল্য সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে রয়েছে, সেখানে এই নিয়োগ অর্থনীতির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। বিরল সিদ্ধান্ত সাধারণত বার্তা দেয়। এখানেও দিয়েছে।
রাষ্ট্রের চরিত্র বদলের লক্ষণ?
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাদের বসানো হচ্ছে—এই প্রশ্ন রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে। যদি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়, রাষ্ট্র টিকে থাকে। যদি ব্যক্তি শক্তিশালী হয়, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। আজকের রাষ্ট্র কি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করছে, নাকি প্রতিষ্ঠানকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলছে—এই প্রশ্ন এখন আর তাত্ত্বিক নয়। এটি দৃশ্যমান বাস্তবতা।
দক্ষতার নতুন সংজ্ঞা
সম্ভবত আমরা দক্ষতার নতুন সংজ্ঞার যুগে প্রবেশ করেছি। যেখানে নীতিনির্ধারণের অভিজ্ঞতার চেয়ে “ব্যবস্থাপনা দক্ষতা” গুরুত্বপূর্ণ, অর্থনৈতিক গবেষণার চেয়ে “ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা” মূল্যবান, এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের চেয়ে “পারস্পরিক বোঝাপড়া” প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র হয়তো এখন আরও বাস্তববাদী হয়েছে। অথবা আরও সরল।
শেষ কথা: রাষ্ট্র না বাজার?
একজন ব্যবসায়ী গভর্নর হতে পারেন—যোগ্যতা থাকলে আপত্তি নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যোগ্যতার মানদণ্ড কে নির্ধারণ করছে? রাষ্ট্র, নাকি ক্ষমতা?
রাষ্ট্র কি এখন বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি বাজার রাষ্ট্রকে পরিচালনা করবে? এই প্রশ্নের উত্তর একটি নিয়োগে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশ। কারণ ইতিহাস বলে—আজকের ব্যতিক্রমই আগামী দিনের নিয়ম হয়ে যায়।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
