মোস্তফা কামাল আকন্দ
Published:2026-03-05 02:11:13 BdST
টেকসই রাষ্ট্রের সূত্রউন্নয়ন মানুষকে এগোয়, সুশাসন তাকে সঠিক রাখে
উন্নয়ন— শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে উঁচু সেতু, প্রশস্ত সড়ক, আলোকিত শহর, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে যায়—এই দৃশ্যমান অগ্রগতির ভিত কতটা দৃঢ়? সেখানে কি ন্যায় আছে, জবাবদিহি আছে, আইনের সমতা আছে? যদি না থাকে, তবে উন্নয়ন কেবল কাঠামো; প্রাণহীন, শেকড়হীন।
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কেবল জিডিপির পরিসংখ্যানে নয়; বরং তার নৈতিক ভিত্তি, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং নাগরিক আস্থায় নিহিত। উন্নয়ন ও সুশাসন তাই আলাদা দুই অধ্যায় নয়—একই দর্শনের দুই অনিবার্য উপাদান। উন্নয়ন মানুষকে সামনে এগিয়ে দেয়; আর সুশাসন নিশ্চিত করে, সে অগ্রগতি যেন সঠিক পথে থাকে।
প্রাচীন এথেন্সের দার্শনিক সক্রেটিস আত্মসমালোচনাকে জীবনের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর উক্তি—“অপরীক্ষিত জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য নয়”—রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য। যে রাষ্ট্র নিজের নীতি, কর্মপদ্ধতি ও সিদ্ধান্তকে পর্যালোচনা করে না, সেখানে উন্নয়ন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহিই সুশাসনের সূচনা।
প্লেটো তাঁর দি রিপাবলিক-এ যে “দার্শনিক-রাজা”-র ধারণা দিয়েছেন, তা মূলত নৈতিক নেতৃত্বের এক উচ্চ আদর্শ। তাঁর মতে, ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকা উচিত, যারা জ্ঞান ও ন্যায়ের চর্চায় নিবেদিত। উন্নয়ন যদি প্রজ্ঞাহীন বা স্বার্থনির্ভর নেতৃত্বের হাতে পড়ে, তবে তা বৈষম্য ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে। কিন্তু জ্ঞানভিত্তিক ও নৈতিক নেতৃত্ব উন্নয়নকে করে মানবিক।
এরিস্টটল রাষ্ট্রকে দেখেছেন মানুষের “সুন্দর জীবন” অর্জনের মাধ্যম হিসেবে। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কেবল টিকে থাকা নয়, বরং কল্যাণ নিশ্চিত করা। তাঁর “আইনের শাসন” ধারণা আজও সুশাসনের মূল স্তম্ভ। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—এই নীতিই উন্নয়নকে সমানভাবে বণ্টিত করতে সাহায্য করে।
বিংশ শতাব্দীতে এসে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান উন্নয়ন-সুশাসনের সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্লেষণ করেছে। ম্যাক্স ভেবার তাঁর বৈধ-যৌক্তিক কর্তৃত্ব তত্ত্বে দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো নিয়মতান্ত্রিক ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই হবে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। যখন প্রশাসন দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়, তখন উন্নয়ন স্থায়িত্ব পায়।
স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন সতর্ক করেছিলেন 'অর্থনৈতিক উন্নয়ন যদি রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের সঙ্গে তাল না মেলায়, তবে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।' তাঁর বিশ্লেষণ আমাদের শেখায়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রবৃদ্ধি ঝুঁকিপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন উন্নয়নকে কেবল আয় বৃদ্ধির প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেননি; তিনি একে মানুষের সক্ষমতা ও স্বাধীনতার সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মতপ্রকাশ ও ন্যায়বিচারের সুযোগ পায়। সুশাসন সেই সুযোগগুলো নিশ্চিত করে।
একবিংশ শতাব্দীতে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতির গুণগত মান ও আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
এই কারণেই বিশ্ব ব্যাংক সুশাসনের সূচকে জবাবদিহি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই সূচকগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়; বরং আস্থা নির্মাণও।
সমাজের দিকে তাকালে আমরা দেখি, সুশাসনের অনুশীলন মানুষকে সুশৃঙ্খল করে তোলে। নিয়ম মানার সংস্কৃতি, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা সামাজিক আচরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। উন্নয়ন সেই সংস্কৃতিকে দৃশ্যমান শক্তি দেয়—স্কুল, হাসপাতাল, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে।
উন্নয়নকে যদি ধরা হয় চলমান রথের গতি, তবে সুশাসন হলো তার লাগাম। গতি ছাড়া রথ এগোয় না; লাগাম ছাড়া রথ পথভ্রষ্ট হয়। রাষ্ট্রের টেকসই অগ্রগতির জন্য তাই এই দুইয়ের সমন্বয় অপরিহার্য।
শেষ পর্যন্ত, একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে অগ্রসর হয়, যখন উন্নয়ন মানুষকে সামনে এগিয়ে দেয় এবং সুশাসন তাকে ন্যায়, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার পথে স্থির রাখে। এই সমন্বয়েই গড়ে ওঠে টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা—যেখানে অগ্রগতি শুধু দৃশ্যমান নয়, নৈতিকভাবেও সুসংহত।
লেখক একজন উন্নয়ন কর্মী ও নীতি বিশ্লেষক
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
