March 27, 2026, 4:43 pm


ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন, এমবিই

Published:
2026-03-27 13:23:27 BdST

প্রতিভা থেকে নেতৃত্ব


বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে উপনীত—যেখানে অব্যাহত উন্নয়নের গতি সুনিশ্চিত রাখার পাশাপাশি একটি জ্ঞাননির্ভর, নৈতিকভাবে বলিষ্ঠ এবং দূরদর্শী নেতৃত্বসম্পন্ন জাতি গঠনের অপরিহার্যতা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের কার্যকর উত্তরণ নিহিত রয়েছে দেশের সুপ্ত ও বিকাশমান মেধাশক্তির যথাযথ অনুসন্ধান, প্রজ্ঞাসম্পন্ন লালন এবং রাষ্ট্রনির্মাণের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় তাদের সুনিপুণ অন্তর্ভুক্তির মধ্যেই। অতএব, একটি সুপরিকল্পিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট “জাতীয় প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি” পুনরুজ্জীবনের দাবি আজ আর বিলম্ব সহ্য করে না।

বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসে এমন এক দূরদর্শী ও অনন্য উদ্যোগের দীপ্ত উদাহরণ বিদ্যমান, যেখানে মেধার মর্যাদা ও প্রেরণার এক অনুপম সমন্বয় ঘটেছিল। ‘হিজবুল বাহার’ জাহাজভ্রমণকে কেন্দ্র করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদানের যে প্রজ্ঞাময় প্রয়াস গৃহীত হয়েছিল, তা কেবল স্বীকৃতির পরিসরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা নবীন প্রজন্মের অন্তরে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের বীজ সুদৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছিল। সমকালীন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রজ্ঞা ও কাঠামোগত উৎকর্ষের মাধ্যমে পুনর্গঠন করা সময়ের অপরিহার্য অনুষঙ্গ।

প্রস্তাবিত কর্মসূচির কাঠামোয় প্রতি বছর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের প্রতিটি শিক্ষা বোর্ড থেকে শীর্ষস্থানীয় শিক্ষার্থীদের নির্বাচন করে একটি সমন্বিত জাতীয় প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করা যেতে পারে। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক বহুত্ব এবং সামাজিক পটভূমির বহুমাত্রিকতা থেকে আগত এই প্রতিভাবান তরুণদের পারস্পরিক সংলাপ ও অভিজ্ঞতা-বিনিময়ের সুযোগ প্রদান তাদের চিন্তার পরিসরকে বিস্তৃত করবে এবং গড়ে তুলবে একটি সুদৃঢ় বুদ্ধিবৃত্তিক নেটওয়ার্ক—যা ভবিষ্যৎ জাতীয় উন্নয়নের জন্য এক অমূল্য সম্পদে পরিণত হতে পারে।

এই কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণীয় উপাদান হতে পারে প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের মহিমায় আবিষ্ট এক অনুপ্রেরণামূলক শিক্ষা-ভ্রমণ—যা সুন্দরবনের মতো বৈশ্বিক গুরুত্বসম্পন্ন পরিবেশগত সম্পদকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হতে পারে। এই ভ্রমণ শিক্ষার্থীদের কাছে কেবল একটি অভিজ্ঞতা নয়; বরং এটি হবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু সংকট, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং টেকসই উন্নয়নের গভীর উপলব্ধির এক বাস্তব পাঠশালা। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ এই জ্ঞান তাদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগ্রহণে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করবে।

ভ্রমণকালীন আয়োজনসমূহে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বুদ্ধিবৃত্তিক সেমিনার, নেতৃত্ব বিকাশ কর্মশালা, নীতি-নির্ধারণমূলক আলোচনাসভা এবং বিশিষ্ট জাতীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে প্রজ্ঞাময় মতবিনিময়। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্লেষণী সক্ষমতা, সৃজনশীলতা, কৌশলগত চিন্তন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বোধকে শাণিত করবে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা, দলগত কর্মকৌশল এবং সহমর্মিতা-নির্ভর কার্যক্রম তাদের ব্যক্তিত্বে সমন্বয়সহ মানবিক নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে সহায়ক হবে।

এই উদ্যোগের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হতে পারে জাতীয় নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব যদি এই কর্মসূচির পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন এবং নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিবিড় সময় অতিবাহিত করেন, তবে তা নবীন প্রজন্মের চেতনায় এক গভীর অনুপ্রেরণার সঞ্চার করবে। নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে মূল্যবোধনির্ভর কর্মকাণ্ড এই কর্মসূচিকে এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করতে সক্ষম।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে কেবল একাডেমিক কৃতিত্ব কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনে পর্যাপ্ত নয়। এর সঙ্গে আবশ্যক সৃজনশীল মনন, উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি, জটিল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা। একটি সুসংহত জাতীয় প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি এই বহুমাত্রিক গুণাবলির সমন্বিত বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে—যার ফলে তরুণ প্রজন্ম কেবল সফল শিক্ষার্থী হিসেবেই নয়, বরং দূরদর্শী জাতীয় ও বৈশ্বিক নেতৃত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

অধিকন্তু, এই কর্মসূচি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি দৃঢ় সেতুবন্ধন প্রতিষ্ঠা করবে, যা জাতীয় সংহতি ও ঐক্যের ভিতকে সুদৃঢ় করবে। এটি সুস্থ প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক নতুন সংস্কৃতি নির্মাণে সহায়ক হবে।

অতএব, সময়ের দাবি অনুধাবন করে এখনই এই দূরদর্শী উদ্যোগ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। অতীতের সফলতা, বর্তমানের প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে সমন্বিত করে একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই জাতীয় ট্যালেন্ট হান্ট কর্মসূচির প্রবর্তন বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। জাতির দীর্ঘমেয়াদি অগ্রযাত্রায় এই বিনিয়োগই হতে পারে সর্বাপেক্ষা দৃঢ় ও টেকসই ভিত্তি।

লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, আন্তর্জাতিক মানব সংগঠক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে অবস্থিত নিউ হোপ গ্লোবাল এর চেয়ারম্যান এবং ব্রিটিশ রাজার পক্ষ থেকে প্রদত্ত মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার বিজয়ী।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.