April 6, 2026, 8:24 am


নেহাল আহমেদ, রাজবাড়ী

Published:
2026-04-06 06:32:07 BdST

ক্ষতিকর তামাক চাষে লাভ বেশী


সামাদ মন্ডল দুই বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছেন। মানবদেহের জন্য তামাক অত্যন্ত ক্ষতিকর, আপনি কি জানেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে নির্লিপ্ত কন্ঠে তিনি বললেন, জানি। জানার পরও কেন তামাক চাষ করছেন সেই বিষয়ে জানতে চাইলে এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, অন্য ফসলের চেয়ে তামাক চাষে মুনাফা বেশী।

স্থানীয় বেশ কয়েকজন কৃষকেরর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তামাক চাষ করতে নিজস্ব কোন পুঁজি প্রয়োজন হয় না। চাষের শুরু থেকেই বীজ, সার ও নগদ অর্থ সরবরাহ করে টোব্যাকো কোম্পানী। এরপর মৌসুম শেষে তামাক পাতা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হলে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা চলে আসে। আবার অন্য ফসলের চেয়ে লাভও অনেক বেশি। এই কারণে অনেকেই এখন তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।

রাজবাড়ীতে চলতি বছর ৩৩ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি। বাস্তবে এর আবাদ হয়েছে আরও কয়েকগুন। কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করতে সভা সেমিনার করেও কৃষককে এর আবাদ থেকে সরানো যাচ্ছে না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী গত বছর জেলায় ২৫ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছিল। চলতি বছর ৩৩ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় ৮ হেক্টর জমি বেশি। জেলার পাঁচ উপজেলার মধ্যে সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলায় ১০ হেক্টর করে, কালুখালী উপজেলায় ৮ হেক্টর, বালিয়াকান্দিতে ৪ হেক্টর ও পাংশায় ১ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের চরনারায়ণপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা-তীরবর্তী এলাকায় বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠ। মাঠে বেশির ভাগ জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে। কিছু জমিতে সবুজ ভুট্টার গাছ বাতাসে দোল খাচ্ছে। মাঠের বিভিন্ন স্থানে তামাক পাতা শুকানোর জন্য বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী ঘর তৈরি করা হয়েছে। কোন কোন ঘরে তামাক পাতা প্রায় শুকিয়ে গেছে। কেউ কেউ তামাক গাছ থেকে তামাকের পাতা ভাঙছেন। কেউ পাতাগুলো রশির সাহায্যে টঙ ঘরে রৌদ্রে শুকাতে দিচ্ছে। কোন কৃষক আবার ক্ষেত থেকে তামাক পাতা তুলে মাথায় করে সেগুলো বাড়িতে নিচ্ছেন। এসময় কৃষকদের সঙ্গে তাদের পরিবারের নারী সদস্যদেরও তামাকের জমিতে কাজ করতে দেখা যায়।

চরনারায়ণপুর ছাড়াও সদর উপজেলার মহদেবপুর, সাবেক মহাদেবপুর, জৌকুড়া, কালুখালীর মহেন্দ্রপুরসহ বিভিন্ন মাঠে একই চিত্র দেখা যায়।

চরনারায়ণপুর গ্রামের কৃষক মান্নান মন্ডল দুই বিঘা (৬০ শতাংশ) জমিতে তামাকের আবাদ করেছেন। মান্নান মন্ডল বলেন, ‘তামাক চাষ করতে প্রচুর কষ্ট। কিন্তু টাকাও বেশি। তামাকে যে পরিমান টাকা পাওয়া যায় তা অন্য কোন ফসলে আসে না। দুই বিঘা জমিতে এক লাখের উপরে লাভ হবে। কোম্পানি আমাদের বীজ, সার ও নগদ অর্থ দিয়েছে। এখন তাদের কাছে বিক্রি করলে তারা আগে সেই টাকা কেটে নেবে।’

তামাকের জমিতে কাজ করলে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি রয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে মান্নান মন্ডল বলেন, তামাকে শরীরের ক্ষতি হয় এটা তিনি জানেন। তারপরও টাকার জন্য তিনি এই চাষাবাদ করছেন তিনি।

সুজন সরদার নামে আরেক কৃষক বলেন, তিনি ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দুই বিঘা জমি ইজারা নিয়ে তামাক চাষ করেছেন। গতবছরও এই জমিতে তামাকের আবাদ করেছিলেন। গত বছর ভালো লাভ হয়েছিল। টোব্যাকো কোম্পানির কাছে তিনি ট্রেনিং নিয়েছেন। তাকে তামাকের জমিতে কাজ করতে বুট, হ্যান্ডগ্লাভস সহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়েছে। কোম্পানির কাছ থেকে তিনি নগদ আর্থিক সুবিধাও পেয়েছেন। ধান চাষে যে পরিমান খরচ হয় তাতে বেশি লাভ হয় না। তামাক চাষে লাভ অনেক বেশি হওয়ায় তিনি এর আবাদ করেছেন। তার মতো অনেক কৃষকই এই বছর তামাক আবাদ করেছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, তামাক একটি মাদক জাতীয় ফসল। এটি চাষে আইনগতভাবে তেমন কড়াকড়ি বা নিষেধাজ্ঞা নেই। কৃষক তার ইচ্ছানুযায়ী ফসল চাষাবাদ করে। আমরা কৃষকদের বিভিন্ন সভা সেমিনারে তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি তামাকজাত ফসলের পরিবর্তে উচ্চমূল্যের ফসল চাষাবাদে উৎসাহ দিচ্ছি। বিভিন্ন কোম্পানীর আর্থিক সহযোগিতায় কৃষক এই ফসল উৎপাদন করছে।  কোম্পানীগুলোর আর্থিক সহযোগিতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.