April 17, 2026, 5:35 pm


ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন, এমবিই

Published:
2026-04-17 16:09:22 BdST

আগামীর নিরাপদ বাংলাদেশেভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার কি হতে পারে দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার নতুন দিগন্ত?


বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে—অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান উন্নয়ন আমাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে। তবে এই অগ্রগতির মাঝেও একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ আমদের নেই; সেটি হচ্ছে, আমরা একটি ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাস করি। প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো কি সম্ভাব্য বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত?

আধুনিক প্রকৌশল বলছে, ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার অনেক ক্ষেত্রে ভূমিকম্পে তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ। কারণ এগুলো মাটির সঙ্গে সমন্বয় রেখে নড়ে—ফলে ওপরের উঁচু ভবনের মতো আলাদা করে দুলে ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কম থাকে। উন্নত দেশগুলোতে নির্মিত বাঙ্কারগুলোতে থাকে শক-অ্যাবজরবিং ডিজাইন, উচ্চমানের রিইনফোর্সড কাঠামো, নিরাপদ বায়ুচলাচল, নিজস্ব বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে এগুলো শুধু আশ্রয়স্থল নয়, বরং সংকটকালীন কার্যকর “কমান্ড সেন্টার” হিসেবে কাজ করতে সক্ষম।

ইতিহাস ও সমসাময়িক বিশ্ব—দুটিই আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রপ্রধানদের বাসভবন ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার সঙ্গে গোপন বা সুরক্ষিত টানেল সংযুক্ত রয়েছে। জরুরি মুহূর্তে দ্রুত স্থানান্তর, নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য। রাশিয়া, সুইজারল্যান্ডসহ অনেক উন্নত দেশে এই ধরনের ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর। এমনকি মধ্যযুগের রাজা-সম্রাটরাও নিজেদের সুরক্ষায় গোপন পথ ও সুরঙ্গ নির্মাণ করতেন—যা আজ আধুনিক প্রযুক্তিতে আরও উন্নত রূপ পেয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। বঙ্গভবন, জাতীয় সংসদ ভবন—এসব শুধু স্থাপনা নয়, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু। একটি বড় ভূমিকম্পে যদি একসঙ্গে বহু সংসদ সদস্য, নীতিনির্ধারক বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে তা শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এক্ষেত্রে, একটি ইতিবাচক ও দূরদর্শী উদ্যোগ হতে পারে—বঙ্গভবন, সংসদ ভবন এবং অন্যান্য কৌশলগত স্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত আধুনিক ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার নির্মাণ। এগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা যেতে পারে যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া, প্রয়োজনীয় বৈঠক পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ অব্যাহত রাখা যায়। বিকল্প প্রবেশ ও নির্গমন পথ, সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত জীবনরক্ষাকারী সুবিধা এতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে—বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা, বিশেষ করে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি। তাই এই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে উন্নত জলরোধী প্রযুক্তি, ড্রেনেজ সিস্টেম, পাম্পিং ব্যবস্থা এবং বন্যা প্রতিরোধী নকশা অপরিহার্য। যেন কেউ এটিকে “আন্ডারগ্রাউন্ড সুইমিং পুল” বলে বিদ্রূপ করার সুযোগ না পায়—বরং এটি হয়ে ওঠে প্রকৌশল দক্ষতার একটি অনন্য উদাহরণ।

এই বিষয়ে দেশের শীর্ষ প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো; বিশেষ করে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের—গবেষণা ও পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি বাস্তবসম্মত, টেকসই ও ব্যয়-সাশ্রয়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব।

যুক্তরাজ্যের কিছু অভিজ্ঞ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে আলাপচারিতায়ও এই ধরনের ধারণার প্রতি ইতিবাচক মতামত পাওয়া গেছে। তারা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি প্রয়োগ করা গেলে এটি একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে।

সমাজের একটি অংশ হয়তো এই ধারণাকে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরঞ্জিত বলে ভাবতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কখনো কখনো স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন মন্তব্যও দেখা যায়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে—আজকের তরুণ প্রজন্ম, আজকের জেনারেশন জেড—তারাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যা শুধু উন্নতই নয়, নিরাপদ এবং প্রস্তুত। দূরদর্শী নেতৃত্বের কাজই হলো ভবিষ্যতের প্রয়োজন আজই উপলব্ধি করা।

কেউ কেউ রসিকতা করে বলতে পারেন, “পালানোর ব্যবস্থা থাকলে মাইলের পর মাইল টানেলই বানানো যেত”—কিন্তু বাস্তবে এটি পালানোর নয়, বরং দায়িত্বশীলভাবে টিকে থাকার প্রস্তুতি। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো এ ইকারণেই এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলেছে—এটি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একটি ধারণা।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে নিরাপত্তা অবকাঠামোতেও একই দূরদর্শিতা দেখানোর। এটি কেবল বর্তমান নেতৃত্বের জন্য নয়—ভবিষ্যতের প্রতিটি রাষ্ট্রপ্রধান, প্রতিটি নীতিনির্ধারকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি বিনিয়োগ।

আজ যদি আমরা পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে আসি, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে আরও আত্মবিশ্বাসী, আরও নিরাপদ। উন্নয়নের পাশাপাশি সুরক্ষা—এই ভারসাম্যই হতে পারে টেকসই রাষ্ট্র গঠনের মূল চাবিকাঠি। বাংলাদেশ কি সেই দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত?

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.