সামিউর রহমান লিপু
Published:2026-04-29 21:54:04 BdST
তদবির ব্যতিরেকে নিয়োগের প্রত্যাশা সর্বমহলেরএনবিআর চেয়ারম্যান পদে হঠাৎ পরিবর্তনের জোর গুঞ্জন
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর চেয়ারম্যান পদে হঠাৎ করে পরিবর্তনের জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার আড়াই মাসের মাথায় একদিনে ১৫টি দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তার পদে পরিবর্তনের ফলে সব মহলেই আলোচনা হচ্ছিলো এনবিআরের চেয়ারম্যান পদেও হয়তো পরিবর্তন হবে। এছাড়া সংস্থাটির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের বিতর্কিত কিছু কর্মকাণ্ড সামনে আসার পরিপ্রেক্ষিতে এই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে হঠাৎ কেন এই পরিবর্তন নিয়ে এত আলোচনা? এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে দ্য ফিন্যান্স টুডে বেশ কিছু সূত্রের সন্ধান পেয়েছে যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তনের নেপথ্যে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বলে প্রতীয়মান হয়।
প্রেক্ষাপট
এনবিআর-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ, যারা এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে গত বছর আন্দোলন করেছিলো তারা বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের ওপর 'বিশ্বাস ও আস্থার অভাব' প্রকাশ করে তার অপসারণ দাবি করেছেন। এছাড়া, উক্ত আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বদলির প্রতিবাদে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কলম বিরতি পালন করেন এবং চেয়ারম্যানকে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন। এমনকি তাকে এনবিআর-এ 'অবাঞ্ছিত'ও ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কে ভেঙে 'রাজস্ব নীতি' ও 'রাজস্ব ব্যবস্থাপনা' নামে দুটি পৃথক বিভাগ করার যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, সেটি নিয়েও কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
মূলত এনবিআরের সংস্কার নিয়ে লুকোচুরি, রাজস্ব নীতি প্রনয়ণ নিয়ে অযৌক্তিক বিতর্ক এবং সরকারের ঊর্ধতন মহলে তথ্য আড়াল করার অভিযোগে এমন অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান
এছাড়াও আবদুর রহমান খানের ব্যক্তিগত অনিয়ম, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সঙ্গ ও ক্ষমতার অপব্যবহার এই অসন্তোষের আগুনে ঘি ঢেলেছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
উল্লেখ্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার পূর্বে আবদুর রহমান অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদে থাকাকালীন অধীনস্থ একটি সংস্থার দুর্নীতিবাজ কিছু কর্মকর্তার সাথে আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে তাদেরকে সুবিধা দিতেন। এনিয়ে বিস্তারিত দ্য ফিন্যান্স টুডে আগামীতে প্রকাশ করবে।
এমন পরিস্থিতিতে আগামী বাজেট প্রনয়নের পরপরই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরণের রদবদলের সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সম্ভাব্য পদ প্রত্যাশী
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচনের গুরুত্ব নিয়ে যে আলোচনা হয়েছিল, সেটি আরও বিস্তৃত হয়েছে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে।
একাধিক সূত্র থেকে সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এনবিআরের চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ে এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র একজনেরই নাম আলোচিত হচ্ছে। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য এম এম ফজলুল হক। অদ্যাবধি তিনি ব্যতীত অন্য কেউ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব গ্রহনে আগ্রহ প্রকাশ করেননি।
তবে এই আলোচনায় ফজলুল হকের যোগ্যতার পরিবর্তে তদবির, প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং তার অতীত কর্মকাণ্ড ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক নিয়েই কথা হচ্ছে। মূলত এই বিষয় নিয়েই দ্য ফিন্যান্স টুডের আজকের প্রতিবেদন।
কে এই এম এম ফজলুল হক?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য এম এম ফজলুল হক
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য এম এম ফজলুল হক ট্রেড ক্যাডারে ১১তম বিসিএসে যোগদান করলেও পরবর্তী সময়ে ১৩তম বিসিএস ট্যাক্স ক্যাডারে যুক্ত হন।
দীর্ঘ সরকারি কর্মজীবনে তিনি চট্টগ্রাম কর অঞ্চল–৪, ঢাকা কর আপিল অঞ্চল–৪ এবং ঢাকা কর অঞ্চল–৩–এ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া, ঢাকা কর অঞ্চল–৭ এর অতিরিক্ত কর কমিশনার এবং কর অঞ্চল–২ এর কোম্পানি সার্কেলে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ১৯শে ডিসেম্বর কর প্রশাসনের উচ্চপদস্থ এই কর্মকর্তা অবসরে যান।
সৃষ্ট বিতর্ক
বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্টে দুর্নীতি দমন কমিশন এনবিআরের যে ১৭ জন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু করে সেই তালিকার শীর্ষে ছিল এম এম ফজলুল হকের নাম। তার বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ীগোষ্ঠীকে বড় ধরনের কর ফাঁকি দিতে সহায়তা করা এবং ব্যক্তিগত লাভের জন্য সাধারণ ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।
তদন্তের স্বার্থে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। দুর্নীতির এসব অভিযোগের সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো প্রমাণিত না হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে—এই তদন্ত চলমান।
দুদকের তৎকালীন মহাপরিচালক মো: আখতার হোসেন
এই বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের তৎকালীন মহাপরিচালক মো: আখতার হোসেন বলেন, 'দুদক আইন, দুদক বিধিমালা অনুযায়ী ১৭ কর্মকর্তাকে নির্ধারিত ফরমে সম্পদ ও দায়-দেনার বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রাথমিক তদন্তে দেখা গিয়েছিল উক্ত কর্মকর্তারা নিজের নামে বা অন্য কারও নামে সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং এসব সম্পদ তাদের বৈধ আয়ের উৎসের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই কারনে কমিশন তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে।'
প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, শক্তিশালী কয়েকটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সহায়তায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য তিনি সক্রিয় তদবির চালাচ্ছেন।
যে ছবিটি প্রচারিত হয়েছে, সেটিকে সংশ্লিষ্টরা ব্যক্তিগত লবিংয়ের সময় তোলা বলে দাবি করছেন। যদিও এসব দাবির বিষয়ে ফজলুল হকের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদবিরের রাজনীতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে তদবির বা ব্যক্তিগত গোষ্ঠীর চাপ—এসব বিষয় দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যদি লবিং-নির্ভর নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সরকারের রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দুষ্টচক্রের প্রভাব বেড়ে যাবে, করনীতি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ঝুঁকি আরও গভীর হতে পারে।
সরকারের করনীয়
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সরকারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দু। দেশের রাজস্ব সংগ্রহ, করব্যবস্থা সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে এই প্রতিষ্ঠানটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার নেতৃত্বে বসানো উচিত একজন সৎ, নিষ্ঠাবান, পেশাদার এবংরাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক চাপ থেকে মুক্ত তথা সাহসী ও দূরদর্শী একজন ব্যক্তি। এছাড়া রাজস্ব খাতে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনও আমলা।
সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে এমন একজন কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-কে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার।
প্রত্যাশা
দেশের রাজস্বব্যবস্থার বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন শক্ত নেতৃত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা। প্রশাসন ও অর্থনীতিবিদরা আশা করছেন—সরকার পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সকল প্রকার তদবির ও চাপকে উপেক্ষা করে প্রকৃত যোগ্য ও নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তাকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নেবে।
একমাত্র সঠিক নেতৃত্বই পারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুর্নীতি ও অদক্ষতার বলয় থেকে বের করে এনে অর্থনৈতিক উৎকর্ষের পথে এগিয়ে নিতে। এর ব্যতয় ঘটলে দুষ্টচক্রের হাতে এনবিআরের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে। এতে বিদ্যমান সংকট আরও ঘনীভূত হবে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকগন।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
