May 3, 2026, 10:44 pm


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-05-03 21:14:11 BdST

২৯২৬ কোটি টাকার দুর্নীতি, ২৪৯ কোটি আত্মসাৎ, বিদ্যুৎ ক্রয়ে অসম চুক্তি জালিয়াতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যে গতিহারা সৌরবিদ্যুৎ


ছয় প্রকল্পে ২৯২৬ কোটি টাকার দুর্নীতি; পাঁচটিতে জমি অধিগ্রহণে জালিয়াতি, লোপাট ২৪৯ কোটি; টেন্ডার ছাড়াই পছন্দের ব্যক্তিদের কাজ প্রদান; বাজারমূল্যের বেশি দরে বিদ্যুৎ কেনার অসম চুক্তি

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটে সৌরবিদ্যুৎ হতে পারত সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী বিকল্প। কিন্তু অনেক সম্ভাবনার এই খাতটি নজিরবিহীন দুর্নীতি, জালিয়াতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে গতি হারিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সৌরবিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করা হয়েছিল ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’-এর মাধ্যমে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো টেন্ডার বা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়াই ‘ক্লিন এনার্জি’র দোহাই দিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের কাজ দেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি দরে বিদ্যুৎ কেনার অসম চুক্তি (পাওয়ার পারচেস অ্যাগ্রিমেন্ট-পিপিএ) করতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদন বলছে, ‘আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে গড়ে ৮ কোটি টাকা। সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৬ প্রকল্পে গড়ে প্রতি মেগাওয়াটে ব্যয় হয়েছে ১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ কেবল ৬টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পেই প্রায় ২ হাজার ৯২৬ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে।

অন্যদিকে, ৫টি প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ২৪৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কৃষিজমিকে অকৃষি দেখিয়ে এবং ভুয়া মৌজা দর ব্যবহার করে প্রকল্পের ব্যয় আকাশচুম্বী করা হয়।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতের এই লুটপাটের নেপথ্যে ছিল উচ্চপদস্থ আমলা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

এi বিষয়ে এক্সিলন বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবতাহী ইসলাম শুভ বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতিমন্ত্রীর রেফারেন্স না থাকলে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) পাওয়া সম্ভব ছিল না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে যেখানে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একটা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প শেষ করতে সময় বেঁধে দেওয়া হতো ১৮ মাস, সেখানে এলওআই পেতেই সময় লেগে যেত ২ থেকে ৩ বছর। প্রায় ৩২ ধাপ পার হওয়া এই এলওআই অনুমোদন পাওয়া মানেই; কিন্তু কাজ শুরু করা নয়, বরং এরপর নানা ধাপ পার হয়ে পিপিএ সম্পাদন হলে তবেই কাজ শুরু হয়।’

শুভ আরও বলেন, ‘এই ধরনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কারণ, পণ্যের দাম, আমদানি খরচ, ব্যাংকের সুদ হার কোনোটিই ৩ বছর আগের মতো থাকে না। এভাবে অনেক দক্ষ প্রতিষ্ঠান প্রকল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। কিন্তু মোটা অঙ্কের আন্ডার হ্যান্ড ডিলিংস কিংবা তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর সুদৃষ্টি থাকার কারণে অনেক অদক্ষ প্রতিষ্ঠানও কাজ পেয়েছে নির্বিঘ্নে।’

আওয়ামী আমলের নানা অনিয়মের কথা স্বীকার করেন দেশের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান এইচডিএফসি সিন পাওয়ার লিমিটেডের স্থানীয় কর্ণধার গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এসকেএম শফিকুল ইসলামও। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের পরিস্থিতি সৌরবিদ্যুৎ প্রসারের জন্য মোটেই অনুকূল নয়।’

জ্বালানি বিশ্লেষক প্রকৌশলী ফরিদ আহমেদ পাঠান বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলো যখন সৌরবিদ্যুৎকে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান উৎস বানাচ্ছিল, তখন বিগত আওয়ামী সরকার একে লুটপাটের মাধ্যমে পকেট ভারী করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ভারতে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম যখন মাত্র ৩ সেন্ট, পাকিস্তানে ০.৩২ সেন্ট ও চীনে ০.৪৫ সেন্ট তখন বাংলাদেশে গড় দাম ছিল ১২ সেন্টের বেশি। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় চারগুণ বেশি দামে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ কেনে তৎকালীন আওয়ামী সরকার। এ পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতে আওয়ামী আমলে কতটা দুর্নীতি হয়েছে। তাদের এই লুটপাট কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর চরম আঘাত।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী আমলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালাই ছিল না। অনেকটা বিশৃঙ্খলভাবে বিভিন্ন নীতিমালায় ২০৫০ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। আর সেটাও ছিল অগোছাল। যেমন– নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় ২০২৩-এ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ, ২০৪১ সালে ৩০ শতাংশ, আবার ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যানে (আইইপিএমপি) ২০৩০ সালে ১০ এবং ২০২৫ সালে ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আবার জলবায়ু সমৃদ্ধ পরিকল্পনায় (২০২২) ২০৩০ সালে ৩০ শতাংশ, ২০৪১ সালে ৪০ শতাংশ ও ২০৫০ সালে ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি সংকট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে নিজস্ব ও নবায়নযোগ্য উৎসের গুরুত্ব কতটা। আওয়ামী লীগের আমলে সৌরবিদ্যুৎ খাতকে যদি স্বচ্ছতার ভিত্তিতে গড়ে তোলা হতো, তবে আজ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে এতটা ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.