বিশেষ প্রতিবেদক
Published:2020-01-19 02:02:34 BdST
সমবায় সমিতির আড়ালে ব্যাংকিং কার্যক্রমকেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে 'এসটিসি ব্যাংক'
তফসিলি ব্যাংকের মতো খোলা হচ্ছে সাধারণ সঞ্চয় ও চলতি হিসাব। সংগ্রহ করা হচ্ছে মেয়াদি আমানতও। ব্যাংক শব্দটি যেন গ্রাহক টানার অস্ত্র। সেজন্য ব্যাংক না হলেও প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে যোগ করা হয়েছে ‘ব্যাংক’ শব্দটি। এহেন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত স্মল ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ (এসটিসি) ব্যাংক লিমিটেড নামক একটি সমবায় প্রতিষ্ঠান।
বিভিন্ন শুভানুধ্যায়ী মহল থেকে প্রাপ্ত অভিযোগ আমলে নিয়ে আলোচিত স্মল ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ (এসটিসি) ব্যাংক লিমিটেডের বিরুদ্ধে গভীর অনুসন্ধান শুরু করে দ্য ফিন্যান্স টুডে'র একটি চৌকস টীম। এফটি টীমের কঠোর নজরদারি এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এসটিসি ব্যাংকের বিভিন্ন অনিয়ম ও ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার বিস্তারিত আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হচ্ছে।
ব্যাংক পরিচালনার কোনো লাইসেন্স বা অনুমতিপত্র ছাড়াই বাংলাদেশে নির্বিঘ্নে অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে এসটিসি ব্যাংক লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানটির মূল শাখা রাজধানীর মৌচাক মার্কেটের পূর্বে লিলি প্লাজা (সাদ রেস্তোরাঁ) ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত।
সমবায় অধিদফতর থেকে সমিতি পরিচালনার অনুমোদন নিলেও তারা শুরু করেছে ব্যাংকিং কার্যক্রম। সমবায় অধিদফতরের নির্দেশনা মোতাবেক, নারায়ণগঞ্জ এলাকার বাইরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার কোনো অনুমতি না থাকলেও আইন ভঙ্গ করেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেটসহ দেশজুড়ে ৩০০টির অধিক শাখা খুলেছে এসটিসি ব্যাংক।
রাজশাহীর সাগরপাড়ায় অবস্থিত এসটিসি'র রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক আজিম উদ্দিন প্রামাণিক এফটি টিমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, নারায়ণগঞ্জে একটি শাখা খোলার একমাত্র নথিটি তাঁর কাছেই রয়েছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কোন কর্তৃপক্ষ তাদের শাখা খোলার এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করার অনুমতি দিয়েছে?
স্থানীয় একাধিক ব্যাংকিং সূত্র জানায়, ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এসটিসির বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো অনুমোদন নেই। কিন্তু অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকের মতোই এসটিসি একটি 'বিভাগীয় শাখা' এবং উপজেলা পর্যায়ে কয়েকটি শাখা খুলে সব ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।
ব্যাংক কোম্পানি আইন ও সমবায় আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান কোনও ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে বা কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু অন্যান্য ব্যাংকের মতোই এসটিসি আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ এবং অন্যান্য সকল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের মে মাস থেকে এসটিসি ইসলামী শরিয়াহ অনুসরণ করে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার নামে সেভিংস, ডিপিএস ও কারেন্ট অ্যাকাউন্টে আমানত গ্রহণ শুরু করেছে। তবে, এই প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন না থাকায় এলাকার সচেতন লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
এসটিসির ওয়েবসাইট ও প্রসপেক্টাস থেকে দেখা যায়, কোম্পানিটি ৫টি শাখার মাধ্যমে বিভিন্ন নামে ও শর্তে নানা ব্যক্তির কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে আসছে। দৈনিক সঞ্চয় প্রকল্প, মুদারাবা মাসিক সঞ্চয়, মুদারাবা শিক্ষা সঞ্চয়, মুদারাবা হজ সঞ্চয়-এর নামে এসটিসি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করছে। এছাড়াও, এই প্রতিষ্ঠানটি ১ লক্ষ টাকা মূল্যের শেয়ারও বিক্রি করছে। এই শেয়ারগুলোর নাম হলো - পার্টনারস, ক্লোজ, কনফিডেন্স, ট্রাস্ট, ডিয়ার, মি অ্যান্ড ইউ।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে এসটিসি ব্যাংকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মাহবুব কাদের তালুকদার টেলিফোনে এফটি টিমকে জানান, তারা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাদের লাইসেন্স (অনুমোদন) নেননি। তারা আদালতে 'ব্যাংক' শব্দটি ব্যবহার করছেন। তবে তারা সমবায় অধিদপ্তর থেকে সমবায় সমিতির নামে লাইসেন্স নিয়েছেন।
এই প্রসঙ্গে সমবায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আমিনুল ইসলাম এফটি টিমকে জানান, সমবায় অধিদপ্তর ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোনো লাইসেন্স দেয় না, দিতেও পারে না। কোনো প্রতিষ্ঠান এমন কাজ করলে তা সমবায় আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কেউ নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে সমবায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত বছরের ২৭ নভেম্বর অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং দমন কার্যক্রম জোরদার করতে গঠিত টাস্কফোর্সের অষ্টম বৈঠক বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মো: রাজি হাসানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় বিতর্কিত 'স্মল ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ (এসটিসি) ব্যাংক লিমিটেড'র কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় 'এসটিসি ব্যাংক' নামে একটি সমবায় সমিতি 'ব্যাংক' শব্দটি ব্যবহার করে অবৈধভাবে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই কার্যকলাপ বন্ধ করতে স্থানীয় প্রতিনিধি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর গৃহীত পদক্ষেপের প্রতি কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
সভা চলাকালে বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মো: রাজি হাসান বলেন, বিএফআইইউ আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংকের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সিআইডি-তে পাঠিয়েছে এবং ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের প্রতিবেদনটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া, এসব বিষয়ে আইনি সহায়তা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশনস অ্যান্ড পলিসি বিভাগ ব্যারিস্টার আজমালুল হক কিউসি-কে নিয়োগ দিয়েছে।
এফটি টিমকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো সমবায় সংস্থা ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র কঠোর গোপনীয়তা এবং নিবিড় অনুসন্ধানের ফলে এসটিসি ব্যাংকের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। অচিরেই এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সমবায় আইনের সংশোধিত উপ-ধারা অনুসারে, একটি সমবায় সমিতি হিসাবে তার কার্যক্ষেত্রের বাইরে কার্যক্রম পরিচালনা করা সমবায় সমিতি প্রবিধানের ২০০৪ সালের ধারা ১২(২) এর পরিপন্থী। অধিকন্তু, ২০০২ সালে সংশোধিত সমবায় সমিতি আইন ২০০১ এবং ২০১৩ সালের আইনের ধারা ২৩(১) অনুসারে কোনো সমবায় সমিতি তার শাখা কার্যালয় খুলতে পারবে না এবং ধারা ২৬ নং অনুসারে, সমবায় সমিতি তার সদস্য ব্যতীত অন্য কারো কাছ থেকে কোনো আমানত গ্রহণ করতে বা কোনো ঋণ বিতরণ করতে পারবে না।
অথচ সমস্ত নিয়মকানুন অমান্য করে এসটিসি ‘সমবায় সমিতি’ শব্দটির পরে ‘ব্যাংক’ শব্দটি যোগ করে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছিলো।
২০১৯ সালের ২৫শে নভেম্বর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে এসটিসি ব্যাংকের ঠাকুরগাঁও শাখাটি সিলগালা করে দেয়।
এই বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, সংগঠনটি দেশজুড়ে শাখা খুলে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই ব্যাপারে ঢাকাস্থ সমবায় অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জেলা সমবায় কার্যালয়ে একটি লিখিত নির্দেশনা এসেছে।
এই প্রসঙ্গে এসটিসি-র রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক আজিম উদ্দিন প্রামাণিক বলেন, ব্যাংকটির দেশব্যাপী শাখা খোলার অনুমতি চেয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করা হয়েছে এবং তিনি আশা প্রকাশ করেন যে রায় তাদের পক্ষেই আসবে। একারণেই এসটিসি শাখা খোলার মাধ্যমে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ব্যাংকটি কখনো 'দেউলিয়া' বা 'হায় হায়' কোম্পানিতে পরিণত হবে না।
তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল হক মোবাইল ফোনে এফটি টিমকে জানান যে, স্মল ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ (এসটিসি) ব্যাংক লিমিটেড নামে কোনো ব্যাংককে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এসটিসি কীভাবে কোনও অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছিল, সেই বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
