January 14, 2026, 3:12 pm


নিজস্ব প্রতিবেদক

Published:
2026-01-14 13:44:42 BdST

মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে কয়েক পরিবারের বসতভিটা দখলের চেষ্টার অভিযোগ


প্রভাবশালী মহলের ইশারায় কয়েকটি পরিবারের বসতভিটা অবৈধভাবে দখলের চেষ্টা ও অবৈধভাবে সাইনবোর্ড টানানোর অভিযোগ উঠেছে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

আজ বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার ষোলঘর এলাকার পালবাড়ির বাসিন্দারা।

সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে পালবাড়ির বাসিন্দা কাজী লুৎফে হাবীব বলেন, আমাদের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার পাঁয়তারা করছে। সম্প্রতি প্রভাবশালী মহলের ইশারায় তাদের ৮০ বছরের পুরনো পৈত্রিক বাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে। এসব নিয়ে আদালতে করা মামলার রায় ও বিভিন্ন আদেশ থাকার পরও আমাদের হয়রানির করছে। বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা প্রশাসককে অবহিত করেছি আমরা।

তারা জানান, ষোলঘর জেল এল নং ১২০ পুরাতন, বর্তমান জেল নং ৩২, সিএস খতিয়ান নং ২১৮৪ এসএ খতিয়ান নং ১৪৫৯, ১৪৬০; আরএস খতিয়ান নং ২৪৬, ২৭২৪; সিএস দাগ ৩১৬৮; আরএস দাগ ৬০৭৩। জমির পরিমনা ২৪ শতাংশ। এই জমির মালিকানায় রয়েছি আমি লুৎফে হাবীব, নাঈমা হাবিব, ইমরান হাবিব ও নাসিমা হাবিব এবং কিছু অংশের মালিক শারমিন রহমান ও কাজী রুবেল।

হাবীব বলেন, উক্ত সম্পত্তিতে আমাদের পূর্বাধিকারীগন সিএস রেকর্ডীয় মালিনগনের ওয়ারিশদের নিকট থেকে হস্তান্তর সূত্রে মালিক হয়ে ১৯৪৩ ইংরেজি সাল থেকে বাড়িঘর নির্মান করে ভোগ দখল করে আসছি। পরবর্তীতে তারা এবং তাদের বর্তমান ওয়ারিশ হিসেবে আমরা সীমানা প্রাচীর এবং ১০/১২টি সেমিপাকা ঘর নির্মান করে ভাড়াটিয়ার মাধ্যমে বাড়ি এবং দোকানঘর হিসেবে ভোগ দখল করে আসছি। এমতাবস্থায় একটি প্রভাবশালী মহল ২০০৭ সালের দিকে আমাদের স্বত্ব দখলীয় সম্পত্তির কিছু অংশে অন্যায়ভাবে রাস্তা নির্মানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ওই প্রভাবশালী মহল তৎকালীন জেলা প্রশাসককে দিয়ে সিনিয়র সহকারী জজ শ্রীনগর মুন্সীগঞ্জ আদালতে ৭/২০০৭ নং দেওয়ানী মামলা দায়ের করে আমাদের সত্ব দখলীয় উল্লেখিত দশমিক ২৪ একর জমির থেকে দশমিক একুশ একর সরকারি খাস ভূমি হিসেবে ঘোষণা এবং আমাদের পূর্বপূরুষদের নামে প্রস্তুত এবং প্রকাশিত এসএ এবং আরএস খতিয়ান সমূহ এবং আমাদের নামীয় রেজিষ্ট্রিকত দলিল সমূহ ভুল ঘোষণার আবেদন করেন।

বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত শ্রীনগর মুন্সীগঞ্জ বিগত ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ইং তারিখে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ইংরেজি তারিখে ডিক্রিমূলে উক্ত মামলাটি খারিজ করে দেয়।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ তার রায়ে উল্লেখ করেন যে, বাদী উল্লেখিত সম্পত্তি সরকারের খাস সম্পত্তি ও সম্পত্তিতে তার স্বত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। উক্ত রায়ে আরও উল্লেখ করা হয় যে, বিবাদী পক্ষ অর্থাৎ আমাদের স্বত্ত্ব ও মালিকানা দখলের প্রমাণ রয়েছে। ওই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক মুন্সীগঞঘ্জ ৬৭/২০১৮ নং স্বত্ব আপীল দায়ের করলে অতিরিক্ত জেলা জজ বিগত ৭ জুলাই ২০২৪ এবং ১১ জুলাই ২০২৪ ইং দারিথে রায় ও ডিক্রিমূলে আপীলটি খারিজ করে দেন এবং নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন। উক্ত রায়ে বলা হয়, জেলা প্রশাসক উক্ত সম্পত্তিতে তার স্বত্ব ও দখল এবং সরকারি খাস জমি প্রমাণ করতে সম্পুর্ণ রূপে ব্যর্থ হয়েছে। পক্ষান্তরে ওই জমি বিবাদীগণের দীর্ঘদিন যাবৎ দখলে রয়েছে।

বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের উল্লেখিত রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক মুন্সীগঞ্জ মহামান্য হাইকোর্টে ৫০০২/২৪ নং সিভিল রিভিশন দায়ের করেন। হাইকোর্ট বিভাগের একটি একক বেঞ্চ বিগত ১৯ আগষ্ট ২০২৫ ইং তারিখে রায় ও আদেশমূলে ৭/২০০৭ সত্ত্ব মোকাদ্দমা পুন:বিচারের জন্য নিম্ন আদালতে প্রচার করেন।

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের উক্ত রায়ের কতিপয় পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে আমরা বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের ৫৩/২০২৬ সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপীল দায়ের করেছি। যাহা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে নালিশি সম্পত্তি সরকারের খাস সম্পত্তি এই মর্মে কোন সিদ্ধান্ত দেন নাই। রায়ে শুধুমাত্র উল্লেখ আছে যে, সরকার যদি উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করতে পারেন যে, নালিশি সম্পত্তি মালিক বিহীন পরিত্যাক্ত সম্পত্তি সে ক্ষেত্রে উপযুক্ত দেওয়ানী আতালত উহা খাস সম্পত্তি হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ৭/২০০৭ স্বত্ব মোকাদ্দমাটির বিচার নিস্পত্তির আগেই মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ বিগত ১৯ আগস্ট ২০২৫ তারিখের রায় ও আদেশের অপব্যাখ্যা করে জেলা প্রশাসক বিগত ৮ জানুয়ারী ২০২৬ তারিখে রাতে আধাঁরে আমাদের সত্ব দখলীয় বসতবাড়ীর একটি ঘরের পাশে বেআইনী অনুপ্রবেশ করে একটি সাইনবোর্ড টানিয়েছে। যাতে যা লেখা রয়েছে তাতে আমরা মনে করি উক্ত সাইনবোর্ড উত্তোলন ও সাইবোর্ডের লেখাসমূহ মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ গত ৯ আগস্ট এক রায় ও আদেশের পরিপন্থি এবং উক্ত লেখা সমূহ আদালত অবমাননার শামিল।

আমরা ইতোমধ্যে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের বিগত গত ১৯ আগস্ট রায়ের অপব্যাখ্যা করে উক্ত সাইনবোর্ড তোলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগনের বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে আদালত অবমাননার একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিয়েছি। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক কর্তৃক আমাদের জমিতে বেআইনী অনুপ্রবেশ করে উক্ত সাইনবোর্ড টাঙ্গানো সম্পুর্ণ বেআিইনী ও আদালত অবমাননার অপরাধ এবং ন্যায় বিচার ও আইনের পরিপন্থি।

সাংবাদিক সম্মেলনে আরও বলা হয়েছে, এর আগে লিখিত অভিযোগ দিয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে বিষয়টি অবহিত করেছি। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। আমরা অভিযোগে উল্লেখ করেছি, একটি ভয়ানক কুচক্রী মহলের চক্রান্তে পালবাড়িটি খাস জমি এবং সরকারি রাস্তা রয়েছেএই মর্মে ২০০৭ সালে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক জমির মালিকদের বিবাদী করে আদালতে মামলা করেন। অথচ ওই জমির বাসিন্দারা সাবকবলা দলিলমূলে মালিকানায় আছেন। সেটি কখনোই জমিদারি বা সরকারি খাস সম্পত্তি ছিল না। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় সরকার পক্ষ মামলা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। জমিতে সরকারি কোনো অংশ বা ম্যাপে কোনো রাস্তা নেই। ফলে আদালত ২০১৮ সালে বিবাদী পক্ষে রায় দেয়। পরে সরকার পক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করে। কিন্তু সেখানেও ২০২৪ সালে মুন্সীগঞ্জ জেলা নিম্ন আদালতে পুনরায় রায় পান বিবাদী পক্ষ। তাদের জমিতে ৬ থেকে ৭ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট পাকা বাউন্ডারি ও ৮-১০টি পাকা ঘর নির্মাণ করা আছে। যেখানে বর্তমানে অন্তত ২০ জন ভাড়াটিয়া বসবাস এবং তারা নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করছেন।

ছয়-সাত মাস আগে একজন সার্ভেয়ারসহ কিছু অচেনা ব্যক্তি হঠাৎ তাদের জমির চারপাশে গিয়ে মাপজোক শুরু করেন। উপস্থিত ভাড়াটিয়া প্রতিবাদ করে এবং তাদের কাছে মাপজোকের কারণ জানতে চায়। তারা জানায়, ওই জমির ওপর দিয়ে রাস্তা করা হবে। খবর পেয়ে জমির মালিকরা লিখিতভাবে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসককে বিষয়টি অবগত করেন। জমিরা মালিকরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানান, ওই জমি তাদের পৈতৃক, সেখানে তারা শান্তিপূর্ণভাবে ভোগ দখলে আছেন। সরকারি জমি বা ম্যাপে কোনো রাস্তা নেই। তাদের ওপর যাতে অন্যায় না হয়, সেই বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চান।

জেলা প্রশাসক তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে অন্যায়ভাবে কিছু করা হবে না। এরপরই সহকারী কমিশানার (ভূমি) জমির মালিকদের নামে থাকা নামজারি বাতিলের নোটিস দেন।

এর কারণ জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার ভূমি বলেন, ‘তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। উপরের নির্দেশে সব করতে হচ্ছে।’ তার কাছে নামজারি বাতিলের সার্টিফায়েড কপি চাইলে তিনি তা দিতে তালবাহানা করেন। কিন্তু সহকারী কমিশনার সার্টিফায়েড কপি দেওয়ার আগেই শিল্প মন্ত্রণালয়ে বদলি হন। ফলে দীর্ঘদিন পর নতুন সহকারী কমিশনার যোগ দিয়ে জমির মালিকদের সার্টিফায়েড কপি দেন। তারা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর কাছে আপিল করেন। ইতিমধ্যে সরকার পক্ষ হাইকোর্টে আপিল করে উল্লেখ করে ওই জমিতে তাদের দখল আছে, জমির মালিকরা তাদের কাজে বাধা দিচ্ছে। জমি প্রকৃত মালিকদের দখলে আছে। সেখাতে তারা বসতবাড়ি ও দোকানপাট করে ভাড়া দিচ্ছে। সরকার পক্ষে আপিলে কাজী রুবেলসহ জমির মালিকরা পক্ষভুত হন এবং পরবর্তী সময় শুনানির জন্য দিন ধার্য আছে।

আদালতে মামলাটি বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও জোরপূর্বক পাকা দেয়াল ও ঘরবাড়ি ভেঙে রাস্তা নির্মান করার অপচেষ্টা চলছে। আমাদের জমিতে অবৈধভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। এই বিষয়ে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা, মাননীয় ভূমি উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের সুদৃষ্টি কামনা করি।

এই বিষয়ে জানতে চেয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সৈয়দা নূর মহল আশরাফীর মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, অবৈধ দখলের অভিযোগ সঠিক নয়। সেখানে কিছু সরকারি খাস জমি রয়েছে। সেই অনুযায়ী জেলা প্রশাসন সাইনবোর্ড দিয়েছে। ওই ব্যক্তিদের মালিকানার পক্ষে কোন নথিপত্র বা আদালতের রায় থাকলে তাদেরকে নথিপত্র নিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.