বিশেষ প্রতিবেদক
Published:2026-06-02 17:23:51 BdST
এনবিআর সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
বর্তমানে চরম অস্থিরতা চলছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ। ঘুষ, দুর্নীতি, নীতিমালা বহির্ভূত বদলি বাণিজ্য, দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলা সব মিলিয়ে সংস্থাটি বর্তমানে চরম ভাবমূর্তি সংকটে। বেশিরভাগ দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে সীমাহীন অস্থিরতা।
সবচেয়ে বিতর্কিত অবস্থানে রয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসন শাখার সদস্য ও ফ্যাসিবাদের দোসর ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি গত ৩ জুলাই এই পদে যোগদান করার পর নীতিমালা বহির্ভূত বদলী নিয়োগ চালিয়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া তিনি পৃথক বদলী আদেশে এ পর্যন্ত প্রায় ১১শ কর্মকর্তাকে বদলি নিয়োগ করেছেন। প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা এই বদলি খাত থেকে আয়ের অভিযোগ উঠেছে ঐ সদস্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ গ্রহণ, বদলি বাণিজ্য, শুল্ক ও ভ্যাট সংক্রান্ত অনিয়মে সহায়তা, অর্থ পাচার এবং বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনিক অঙ্গন ও রাজস্ব প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি কথিত গোপন অনুসন্ধান প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় বা প্রকাশ্য তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবুও অভিযোগগুলোর ব্যাপকতা এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার দায়িত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।
রাজস্ব প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী মোয়াজ্জেম হোসেন কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঢাকা কাস্টম হাউস, রাজশাহী ভ্যাট কমিশনারেট, যশোর ভ্যাট কমিশনারেট, চট্টগ্রাম ভ্যাট আপিলসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তিনি বিভিন্ন সময় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিশ্চিত করেছেন। কোথাও কোথাও দুর্নীতির অভিযোগের কারণে বদলি হওয়ার কথাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কমিশনার মোয়াজ্জেমের যত অপকর্ম:
২০১৮ সালে রাজশাহীর কমিশনার থাকাকালীন ভ্যাট ফাকির অভিযোগের কারনে পাবনায় অবস্থিত আওয়ামী সুবিধাভোগী ইউনিভার্সেল গ্রুপের মুসক অডিটের নির্দেশনা দেওয়া হয়।কমিশনার অবৈধ সুবিধা গ্রহনের জন্য সর্বোচ্চ জুনিয়র কর্মকর্তা এসি জনাব সন্তোস সরেনকে প্রধান করে অডিট সম্পন্ন করেন। অডিটে ২৭৩কোটি টাকা ফাকিঁর প্রমান পাওয়া সত্বেও রাজস্ব কর্মকর্তা আইয়ুবকে দিয়ে মাত্র ১ কোটি টাকার মধ্যে অডিট নিস্পত্তি করেন।ও ১১ কোটি টাকা ঘুষ প্রদানে প্রতিষ্ঠানকে চাপ দিতে থাকেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানের প্রধান সোহানী (২০২৪ সালের হত্যা মামলার আসামী)সিএফও মনিরুজ্জামান ও কমিশনার মোয়াজ্জেম প্যান প্যাসেফিক হোটেলে মিলিত হন। এরপর প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে ১১ কোটি টাকাএকটি মাইক্রোবাসে করে মোয়াজ্জেমের নির্দেশ মোতাবেক গুলশানে প্রেরন করেন। ১১ কোটি টাকা পাওয়ার পর নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানের অডিট মাত্র ৯৬ লাখ টাকায় নিস্পত্তি করে চুড়ান্ত পত্র দিয়ে নিস্পত্তি করে।
ঘটনাটি এখানেই সমাপ্ত নয়। ধর্মের কল বাতাসে নড়ে ২০২০ সালে কাস্টমস ডিসি জাহিদের হাতে এই প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাকিঁর তথ্য চলে আসে।ডিসি জাহিদ ফ্যাক্টরির দলিলাদি যাচাই করে মোয়াজ্জেমের সময়ে অডিটটি পুনরায় চালু করে ২৭৩ টাকা ফাকি উদঘাটন করেন। অর্থাৎ ২৭৩ কোটি টাকার ফাকিমাত্র ৯৬ লাখ টাকায় মোয়াজ্জেমকে ১১ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে সরকারের ২৭২ কোটি টাকার ক্ষতি সাধন করেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশে ভ্যাট গোয়েন্দা ২৭২ কোটি টাকার ফাকিঁর বিষয়টির সত্যতা পেয়েছে।
ইউনিভার্সেল গ্রুপের প্রধান সোহানী ঘুষ প্রদানের বিষয়টি গণমাধ্যমে স্বীকার করেন। এ ঘটনার সাক্ষী (বর্তমান এসি, ঢাকা(৩০ লাখ টাকা সহ দুদকের হাতে ধরা পড়ায় দুদকের অনুসন্ধান চলমান)
রাজশাহী সোনামসজিদের সিএন্ড এফ ব্যাবসায়ী জুয়েল মোল্লার অবৈধ ব্যবসার অংশীদার ছিলেন কমিশনার মোয়াজ্জেম। এই জুয়েল মোল্লা মোয়াজ্জেমের আমেরিকা প্রবাসী ছেলের বিয়েতে ৪০ লাখ টাকার স্বর্ণের গয়না উপহার প্রদান করেন।
কমিশনার, কাষ্টমস হাউস, ঢাকা হিসেবে দূর্নীতির তথ্য:
২০২০ সালে নুসাইবা ট্রেডিং এর মিথ্যা ঘোষনার পণ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিআইসি কর্তৃক আটক করা হয়।আটক চালানে ১ কোটি টাকার উপর শুল্ক ফাঁকির প্রমান পাওয়া যায়।কমিশনার মোয়াজ্জেম দূর্নীতিবাজ সিএন্ডএফ ও ডিসি মারুফের যোগসাজসে চালানটি সিআইসির অগোচরে ছেরে দেন। ২ মাস পর বিষয়টি জানাজানি হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ করা হয়। তবে তার আত্বীয় ফ্যাসিষ্ট মোফাজ্জল চৌধুরী মায়ার হস্তক্ষেপে নথিটি আলোর মুখ দেখে নাই।
মেমোরী কার্ড দূর্নীতি:
আওয়ামী দোসর মায়া চৌধুরীর আত্বীয় এই দূর্নীতিবাজ কাষ্টমস কর্মকর্তা বিমানবন্দরের সুরক্ষিত গুদাম হতে ৬ লাখ পিস মেমারী কার্ড তশরুফ করেন। এ বিষয়ে দুদকের তদন্ত খেলা চলছে ৫ বছর। প্রকৃত অপরাধীদের তথ্য আড়াল করতে ব্যয় করা হয়েছে অনেক অর্থ। দুদক নথি নং: ০০.০১.২৬০০.৬০৩.০২.০১৮.২৩ এর তদণ্ত কর্মকর্তা ঢাকা থেকে বদলী হয়েছেন ২ বছর পূর্বেই।
মামুন হাওলাদার নামক জনৈক যাত্রী গত ১১/০৬/২০১৬ তারিখে ৪ জিবি, ৮ জিবি, ১৬ জিবি, ৩২জিবিসহ সর্বমোট ২, ১০, ০০০ মেমোরী হংকং থেকে মিথ্যা ঘোষনা দিয়ে হযরত শাহ্জালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরের গ্রীন চ্যানেল অতিক্রম কালে শুল্ক কর্তৃপক্ষ আটক করেন। বিমানবন্দর কাস্টমস আটককৃত রশিদ নম্বর-০১৬০২৪৩ তারিখ ১১/০৬/২০১৬ এর আটককৃত পণ্যের মুল্য ( ৬, ৩২, ৩১, ৬০০. ০০) ছয় কোটি বত্রিশ লক্ষ একত্রিশ হাজার ছয়শত টাকা।
যশোর কমিশনার হিসেবে দূর্নীতির তথ্য:
যশোরে পদস্থকালে ভেড়ামাড়াতে অবস্থিত আলী বিড়ি প্রতিষ্ঠান থেকে মাসিক ৪৫ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহন করা হতো। এজন্য প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ দেখিয়ে রাতের আধারে উৎপাদন কাজ টালানো হতো। এ বিষয়ে রাজস্ব কর্মকর্তা ১৪ ব্যাচের মাসুদের ভয়েস রেকর্ড শোনা যেতে পারে। এ তথ্যর ভিত্তিতে কমিশনার মোয়াজ্জেমকে সে সময় স্ট্যান্ড রিলিজে চট্টগ্রাম আপিলে বদলী করা হয়।
মাগুরায় ভুয়া মামলায় ভিশন ড্রাগস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ১ কোটি টাকার ঘুষ দাবির ঘটনায় মাগুরা কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় তারা হলেন-রাজস্ব কর্মকর্তা রাহারুল ইসলাম ভুইঁয়া এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-মনসুর। তারা মুলত কমিশনারের পক্ষে ঘুষ গ্রহন করেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে এই দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে ব্যপক ঘুষের বিপরীতে বদলী বাণিজ্য শুরু হয়েছে। এ কাজে সয়ং সদস্য মোয়াজ্জেম ঘুষের হাট খুলে বসেছেন। তার কাজে বাধা দেওয়ায় একাধিক কর্মকর্তাকে শাখা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। এআরও সরোয়ার হাসান, আবু বকর সিদ্দিক, শাহ মোহাম্মদ আশিকুর রহমান, অজিত প্রসাদ রুদ্র, (১৯/১১/১৯৮২) মো: আবুল বাশার, সানাউল হক (১০/১০/১৯৮৯), বাবুল সিংহ, (০১/০১/১৯৮৭), আব্দুল কাদের (১৮/১১/১৯৮৮), ছানাউল্লাহ (০১/০১/১৯৯২), শামীম হোসেন (১৫/০৮/১৯৮৯), বনজ কান্তি রায় (২৭/০৭/১৯৮৭), আবু হোসেন (২৫/১০/১৯৮৬), শারমিন জাহান (০৮/১০/১৯৮৬), শাহ্জাহান কবির (০৯/০২/১৯৯১), কপিল দেব গোস্বামী (৩১/১২/১৯৮৮), প্রভুতি কর্মকর্তাদের নিকট ২০-২৫ লাখ টাকা ঘুষের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বদলী নীতিমালা লংঘন করে বদলী বানিজ্য করেছে। সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের বদলী থেকে মোট ১৫ কোটি টাকা বানিজ্য করা হয়েছে।
আমেরিকায় অর্থ পাচার:
মোয়াজ্জেমের ছেলে আমেরিকার জন হপ্সকিন তে সেমিষ্টার প্রতি ৩৫ হাজার ডলার প্রদান করে লেখাপড়া করে। মোয়াজ্জেম হুন্ডির মাধ্যমে এই টাকা আমেরিকায় প্রদান করেন। ছেলে রাগিব এই মোয়াজ্জেমের এই লেখাপড়ার খরচ কোন মাধ্যেমে বিদেশে প্রেরন করেছেন তার কোন বৈধ উৎস নেই। আমেরিকারবাল্টিমোরে সমপ্রতি একটি বাড়ি ক্রয় করেছেন ছেলে ও ছেলের বউ আদিবা গফ্ফারের নামে।
নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে ৮ তলা ভবনের কাজ সম্পন্ন করেছেন। ঢাকার ধানমন্ডি ও উত্তরাতে ক্রয় করেছেন ২ টি ফ্লাট। তার স্ত্রী মারজিয়া সুলতানা (শশুর) আওয়ামী উপজেলা চেয়ারম্যান এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী ফাতেমা জলিল সাথী এয়ারপোর্ট থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন।
এনবিআর সদস্য প্রশাসন মোয়াজ্জেমের এহেন ঘুষ বানিজ্যের ফলে প্রশাসনে চলমান অস্থিরতা নিরসনে ভুক্তভোগী কর্মকর্তাগন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টার আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সদস্য প্রশাসন মোয়াজ্জেম’র বিরুদ্ধে নীতিমালা বহির্ভূতভাবে ১১শ কর্মকর্তাকে পোস্টিং বাণিজ্য অর্ধশত কোটি টাকা ঘুষ গ্রহনের অভিযোগ:
এআরও, আরও, এসি, ডিসি, জেসি, কমিশনার পর্যায়ের বেশিরভাগ কর্মকর্তাকেই বদলি করা হয়েছে। মোটা অংকের বিনিময়ে লোভনীয় পোস্টিং আবার চাহিদা মোতাবেক ঘুষ দিতে না পারায় ডাম্পিং পোস্টিং নিয়েও কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এনবিআর’র সার্বিক কর্মকান্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বদলি বাণিজ্য করে অর্ধশত কোটি টাকা গ্রহণের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। এহেন ঘুষ কেলেঙ্কারির বিষয়টি জানাজানি হলে সম্প্রতি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা রায়হান মেহেবুব সহ শাখার সৎ কর্মকর্তারা মোয়াজ্জেমের সাথে দায়িত্ব পালনে অপারগতা জানালে ৩৩ ব্যাচের ঐ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। এ নিয়েও কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
সূত্রমতে এআরও সারোয়ার হোসেন, আবু বকর সিদ্দিক, শাহ মোহাম্মদ আশিকুর রহমান, আজিজ প্রসাদ রুদ্র, মো: আবুল বাশার, সানাউল হক, বাবুল সিংহ, আ: কাদের সানাউল্লাহ, শামীম হোসেন, বনজ কান্তি রায়, আবু হোসেন, শারমিন জাহান, শাহজাহান কবির, কপিল দেব গোস্বামী, প্রভৃতি কর্মকর্তাদের কাছ
থেকে ২০-২৫ লাখ টাকা ঘুষের মাধ্যমে বদলী নীতিমালা লংঘন করে বদলি বাণিজ্য করা হয়েছে। অনুরূপ আরও পদের কর্মকর্তাদের লোভনীয় পদে নিয়োগ দিতে ২৫-৩০ লাখ, এসিদের ৩০-৫০ লাখ, ডিসিদের ৪০-৫০ লাখ, জেসিদের ৫০-৬০ লাখ ও কমিশনার পদে রদবদলে লোভনীয় কর্মস্থলে পোস্টিং দিতে ৩-৫ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের ঘটনা ঘটেছে।
এনবিআর সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন হচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও বিমানবন্দর থানা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ফাতেমা জামান সাথীর খুবই ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বেপরোয়া ক্ষমতাসিন হয়ে পড়েন। ঐ সময়ে সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদেরও তিনি থোরাই কেয়ার করতেন। ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে অবীধভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন শক শত কোটি টাকা। ’বিসিএস (শুল্ক ও আবগারী) দপ্তরের ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম চাকুরীকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অন্যায় সুবিধা দিয়ে সহকর্মীদের নিকট মুনাফিকি করে ঘুষ গ্রহন করেন।
তিনি বাইরে সততার লেবাস দেখান কিন্তু অবৈধ অর্থ লেনদেন হতে বিরত থাকেননি। তার বিরুদ্ধে আমেরিকায় অর্থ পাচার, পাবনায় অবস্থিত ইউনিভার্সেল গ্রুপের কাছে ১১ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহন, ঢাকা কাস্টমস কমিশনার থাকাকালে ব্যাপক দুর্নীতির প্রমান এবং যশোরের কমিশনার থাকাকালে অবৈধ সিগারেট বাণিজ্য হতে শত শত কোটি টাকা অবৈধ অর্থ উপার্জনের সত্যতা রযেছে।
মোয়াজ্জেমের ছেলে আমেরিকার John Hopskin University তে সেমিস্টার প্রতি ৩৫,০০০ ডলার প্রদান করে পড়ালেখা করে। মোয়াজ্জেম হুন্ডির মাধ্যমে এই টাকা আমেরিকায় প্রদান করেন। ছেলে রাগীব মোয়াজ্জেমের এই লেখাপড়ার খরচ কোন মাধ্যমে বিদেশে প্রেরন করেছেন তার কোনো বৈধ উৎস নেই। আমেরিকার বাল্টিমোরে সম্প্রতি একটি বাড়ী ক্রয় করেছেন ছেলে ও ছেলে বৌ আদিবা গাল্ফারের নামে। বিষয়টি কাস্টমস ডিপার্টমেন্টের সবাই জানে।
উল্লেখ্য গত এপ্রিল মাসে এনবিআর বিলুপ্ত করে “রাজস্ব নীতি” ও “রাজস্ব ব্যবস্থাপনা” নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের অধ্যাদেশ জারি হয়। এরপর থেকেই সংস্থার ভেতরে অস্থিরতা দেখা দেয়। অধ্যাদেশ বাতিল ও চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবিতে কর্মকর্তারা “সিবিএ স্টাইলে” ধর্মঘট, কলম বিরতি ও “মার্চ টু এনবিআর” কর্মসূচি পালন করেন। এই আন্দোলনের সময় নির্দিষ্ট কিছু সেবা ছাড়া প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ ছিল। মে ও জুনে বাজেট প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়েও তারা অচলাবস্থা তৈরি করেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বদলির আদেশ ছিঁড়ে ফেলেন—যা এনবিআরের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
সংস্থার ভাবমূর্তি সংকটে একাধিক ঘটনায় এনবিআরের ভেতরে গভীর অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তাদের একটি অংশ বলছেন, এই অনিয়মই সংস্থার ভাবমূর্তিকে নিচে নামিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সদস্য বলেন, “এটা অস্বীকারের উপায় নেই, এনবিআর ভাবমূর্তি সংকটে আছে। কিছু কর্মকর্তার কারণে পুরো সংস্থাটিই এখন দুর্নীতির প্রতীক মনে হচ্ছে।”
একজন কমিশনার বলেন, “এখানে অধিকাংশ কর্মকর্তাই কোনো না কোনোভাবে আর্থিক অনিয়মে জড়িত। পার্থক্য শুধু কে ধরা পড়ছে আর কে পড়ছে না।"
একজন দ্বিতীয় সচিবের ভাষায়, “এখন এনবিআরে কাজ করি এই পরিচয় দেওয়াটাই অনেক সময় লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
তবে এনবিআর বলছে, অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি করবর্ষ থেকে ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আয়কর ও ভ্যাট অডিটও অনলাইন প্রক্রিয়ায় হচ্ছে। ভ্যাট রিফান্ড ও আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত নথিপত্রও ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে অনলাইনে দাখিল করা যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষের আশা, সব কার্যক্রম ডিজিটাল হলে ঘুষ, অনিয়ম ও হয়রানি কমে যাবে এবং ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পাবেন।
নিজ আয়কর রিটার্নে অসত্য তথ্য প্রদানকারী এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান দুর্নীতিবাজ সদস্য (শুল্ক ও ভ্যাট প্রশাসন) মোয়াজ্জেম ২জনই স্বৈরাচারের দোসর হওয়ায় হাজারো অভিযোগ উত্থাপন হওয়া সত্বেও চেয়ারম্যান সাহেব বিষয় সমূহ ওভারলুক করে থাকেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কমিশনার জানান।
টান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুর্নীতিবাজ কর কর্মকর্তারা বড় ব্যবসায়ীদের যেমন কর ফাঁকিতে সহায়তা করেন, তেমন নিজেরা অবৈধ আয়কে বৈধ করতে আয়কর ফাইলে জালিয়াতি করেন। আয়কর গোয়েন্দারা তার অবৈধ সম্পদের তথ্য পেলে তাকে অবশ্যই বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে এটা যেহেতু দুর্নীতি, তাই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন. ‘যারা ন্যায় ও সততার সঙ্গে কর দিতে চান তাদের জন্য আয়কর অফিসের দরজা পার হওয়া কঠিন, আর যারা অসৎভাবে কর ফাঁকি দিতে চায় তাদের জন্য স্বর্গ। এটা তারই একটা বড় দৃষ্টান্ত।’
মোয়াজ্জেমের দূর্নীতির ব্যপারে দুদকের এক উপ-পরিচালকের দৃষ্টি আর্কষন করা হলে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে বা পত্র-পত্রিকায় এ সংক্রান্ত কোন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে আইনানুনাগ ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরো জানান বর্তমানে দেশব্যাপী প্রধান উপদেষ্টা ঘোষিত দূর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়ে গেছে অতএব, দূর্নীতির সামান্যতম লেশ পাওয়ামাত্র কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়া হবেনা।
উল্লেখ্য, দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় সাধারণত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই, সম্পদের উৎস নির্ধারণ, ব্যাংক হিসাব বিশ্লেষণ, আয়কর নথি পর্যালোচনা, বিদেশে সম্পদ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজন হলে মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে তার বৈধ আয়, সম্পদ বিবরণী, কর নথি, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ এবং পারিবারিক ব্যয়ের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়। একই সঙ্গে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
আইনজ্ঞদের মতে, অভিযোগ যত গুরুতরই হোক না কেন, তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাও ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত।
সাবেক আয়কর কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, তদন্তে যে কোনো সরকারি কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একজন সরকারি কর্মকর্তা চাকরি করে বৈধ পথে এত সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। এত সম্পদ করে থাকলে নিশ্চয়ই তিনি অবৈধ পথ অবলম্বন করেছেন।
খোদ এনবিআর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দাপটের সঙ্গে প্রভাব বিস্তার করেছেন তিনি। করদাতাদের কর ফাঁকি দিতে সহযোগিতা করে তিনি অঢেল অবৈধ অর্থ আয় করেন। অবৈধ পথে উপার্জিত এই অর্থ বৈধ করতে তিনি নানা কায়দায় নামে-বেনামে সম্পদ কেনেন। এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অবৈধ উপায়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন।
এদিকে, প্রশাসনিক মহলে আলোচিত এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টদের নজর এখন দুদকের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। অভিযোগের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ্য অনুসন্ধান শুরু হবে কি না, ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের নথিপত্র যাচাই করা হবে কি না, কিংবা কোনো মামলা দায়েরের পর্যায়ে বিষয়টি যাবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অভিযোগের পরিধি, আর্থিক অনিয়মের সম্ভাব্য মাত্রা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্বপূর্ণ অবস্থান বিবেচনায় বিষয়টি জনস্বার্থে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
অন্যদিকে মোয়াজ্জেম হোসেনের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য, সম্পদের উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা এবং অনুসন্ধানে উত্থাপিত দাবিগুলোর জবাব পাওয়া গেলে বিষয়টি সম্পর্কে আরও ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে এখন পর্যন্ত পুরো বিষয়টি অভিযোগ, অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট দাবি এবং প্রাথমিক তথ্যের পর্যায়েই রয়েছে; এর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্তকারী সংস্থা ও বিচারিক প্রক্রিয়া।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
