January 5, 2026, 9:23 am


S M Fatin Shadab

Published:
2026-01-04 16:49:43 BdST

গাজীপুর লিফটকাণ্ডে রোগী মৃত্যুর বিচার হয়নিগণপূর্তের দুর্নীতির বরপুত্র নির্বাহী প্রকৌশলী আ: হালিম শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক


গণপূর্তের দুর্নীতির বরপুত্র নির্বাহী প্রকৌশলী আ: হালিম শত কোটির অবৈধ সম্পদের মালিক

গাজীপুর লিফটকাণ্ডে রোগী মৃত্যুর বিচার হয়নি

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

পর্ব-১
আঃ হালিম। গণপূর্ত অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী। বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত আছেন। গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের দ্বিতীয় সন্তান। আনোয়ার হোসেনের বড় সন্তান তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী। ছোট ছেলে আঃ আলিম গ্রামের চাষাবাদ ও গরুর খামার দেখাশোনা করেন। কর্মজীবনে আঃ হালিমের পিতা আনোয়ার হোসেন কর্মের প্রয়োজনে কুমিল্লা থেকে কুষ্টিয়ায় এসে বটতৈল গ্রামের তাহমিনা হকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কর্মপেশায় আনোয়ার হোসেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন নিরাপত্তা প্রহরী। বর্তমান আনোয়ার হোসেন অতিশয় বৃদ্ধ ও অবসর জীবন যাপন করছেন। আনোয়ার হোসেন বটতৈল এলাকায় একজন বিত্তশালী ও জমিদার হিসেবে পরিচিত। একজন নিরাপত্তা প্রহরী বটতৈল শিশির মাঠ এলাকায় অর্ধশত বিঘা জমি ও বাগানের মালিক। শতাধিক গরু নিয়ে তার খামার ও স্ত্রীর নামে এগ্রো ফার্ম। এ সম্পদের উৎস কোথায়? এ নিয়ে দ্য ফিনান্স টুডে অনুসন্ধানী টিমের অনুসন্ধানে উঠে এসে দুর্নীতির দায় অভিযুক্ত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে শতকোটি টাকার দুর্নীতিবাজ গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আঃ হালিমের ভয়ংকর চিত্র।
আঃ হালিম গণপূর্ত অধিদপ্তরে চাকুরী পাওয়ার পর যেন সোনার হরিণ হাতে পেয়েছে। আঃ হালিমের পিতা আনোয়ার হোসেনের দেওয়া তথ্য মতে বগুড়ার সাবেক একজন পুলিশের (এসপির) কন্যাকে বিবাহ করেন। তার দুই সন্তান বিসিএস ক্যাডার ও এক মেয়ে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। বড় ছেলে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী ও মেজো ছেলে গণপূর্ত নির্বাহী প্রকৌশলী। এ দু সন্তানের অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ দিয়ে আনোয়ার হোসেন কুষ্টিয়ার বটতৈল এলাকায় বিত্তশালী ও অর্ধশত বিঘা জমির মালিক। বটতৈল এলাকায় শিশির মাঠ ও তার আশেপাশে কেউ কবরস্থানের জমি ও কিনতে পারেনা আঃ হালিমের কারণে। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ। পরিবারটি এখন শুধু বিত্তশালী না তাদের প্রভাবে এলাকায় কোন জমি কেনা বেচা স্বাভাবিক নিয়মে হতে পারে না। এলাকাবাসীর প্রশ্ন একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর বেতন কত? ঢাকাতে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক ব্যালেন্সের এর উৎস কোথায় ? মূলত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে কুষ্টিয়ার প্রভাবশালী নেতা মাহাবুবুল আল হানিফের ছত্রছায়ায় থেকে তার নাম ভাঙ্গিয়ে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও টাকার মালিক হয়েছে এই আঃ হালিম। বটতৈল মধ্যপাড়ার বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, হালিমের বাবা ছিল একজন দাড়োয়ান। এই এলাকার বিবাহ করে ঘরজামাই ছিলেন। তার সন্তানেরা পড়ালেখা করে এখন কুষ্টিয়ার যে কয়জন দুর্নীতিবাজ ও অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছে তার মধ্যে আনোয়ার হোসেনের পরিবার। তার পরিবারের কিছু আত্মীয় আছে যাহারা সেনাবাহিনীতে বড় পদে চাকুরী করে তাদের ভয় দেখায় এলাকাবাসীকে। আবুল হোসেন বলেন দুদক কি করে আমরা বুঝি না। দুদকের চোখ কি অন্ধ? চোখের সামনে দুর্নীতি করে শত কোটি টাকার মালিক হলো কিভাবে। তাহলে এই দুদক থেকে লাভ কি ? আঃ হালিমের বাবা নাকি এলাকাবাসীর নিকট বলেন আমার ছেলেদের হাত অনেক লম্বা তাদের কেউ কিছুই করতে পারবে না।
আঃ হালিমের শিশির মাঠ এলাকায় প্রায় অর্ধশত বিঘা জমি রয়েছে অধিকাংশ জমি ক্রয় করেছে তার বাবা/মায়ের নামে ও বেনামে। প্রশ্ন হল বাবা একজন দাড়োয়ান তার আয়ের উৎস কি? বটতৈল এলাকার মধ্যপাড়ায় রাহিম রাইস এন্ড এগ্রো নামে প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার পরিচালক হিসেবে রয়েছে তার মায়ের নাম তহমিনা হক। ৬/৭/২০২০ তারিখে উক্ত প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলে বিশাল গোডাউন করে রেখেছে। একই প্লটে তার পিতা আনোয়ার হোসেনের নামে রয়েছে জমি সহ শতাধিক গরু নিয়ে খামার। ক্রয় সূত্রে উক্ত জমির মালিক আনোয়ার হোসেনের নামে সাইন বোর্ড। বাড়ির ভিতরে গিয়ে দেখা যায় দোতালা বিশিষ্ট বাড়ির ও বিশাল গরুর খামার ও সাথে বিঘা বিঘা জমি। যেখানে ঘাসের চাষ করা হয়েছে ও রয়েছে গাছের বাগান।
গণপূর্ত ইএম বিভাগের দুর্নীতির বরপুত্র নির্বাহী প্রকৌশলী আঃ হালিম ইএম বিভাগ ১০ এ কর্মরত থাকাকালীন সময়ে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজে ২০২৪ সালে নিম্নমানের লিফটে স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের কারণে লিফট ছিঁড়ে ও আটকা পড়ে ২ জন রোগীর মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে মমতাজ বেগম (৫৩) নামে হৃদরোগী হৃদরোগী লিফটে পড়ায় ৪৫ মিনিট আটকা থাকার পর মারা যায়। ২০২৪ সালে কুমিল্লার জাহিদুল ইসলাম (৪০) এক রোগীর স্বজন লিফটের দরজা খুলে নিচে পড়ে গিয়ে মারা যায়। লিফট কাণ্ডে মন্ত্রণালয়ের থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী শামীম আক্তারের অত্যন্ত আস্থাভাজন হওয়ার কারণে আঃ হালিম পার পেয়ে যায় এবং এখন পর্যন্ত রয়েছে বহাল তবিয়তে।
বহুরূপীর অধিকারী দুর্নীতিবাজ নির্বাহী প্রকৌশলী গিরগিটির মতো রং বদলায়। যখন যে ক্ষমতায় আসে সেই রুপ ধারন করে। গণপূর্ত অধিদপ্তর ই-এম ৮ দায়িত্বে থাকাকালীন (২০২২) ঠিকাদারদের নিকট থেকে আব্দুল হালিম স্টাফ অফিসার জুবায়েরের এর মাধ্যমে ৫% হারে কমিশন আদায় করতেন বলে একাধিক ঠিকাদার তথ্য দিয়েছে। পিপিআর অনুযায়ী এলটিএম (লিমিটেড টেন্ডার) অনুযায়ী দরপত্র হওয়ার কথা থাকলেও তা না করে ওটিএম এর মাধ্যমে টেন্ডার আহবান করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছেন। আর তার স্টাফ অফিসার জুবায়ের আইডি হ্যাক করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারের আইডি রেট দেখে দাম হাঁকাতো। একজন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম মূলতঃ গণপূর্ত সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আক্তারের মুরিদ। আর সেই সুবাদে তিনি ভাগিয়েছেন ভালো ভালো পোস্টিং এবং বড় অঙ্কের কাজ। আমাদের অনুসন্ধান ও বিভিন্ন তথ্য সূত্রে তার দুর্নীতি ও অনিয়ম যে কোন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বহুগুণ ছাড়িয়ে গিয়েছে। বর্তমান তিনি প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত আছেন ঢাকা, মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় রয়েছে তার শত কোটি টাকার সম্পদ। তার গ্রামের তথ্যসূত্র শ্বশুরবাড়ি এলাকায় বগুড়া ক্যান্টমেন্টের ফ্লাট লেকের পাশেও তিনি কিনেছেন অঢেল সম্পদ ও জমি। গণপূর্তে যে কয়েকজন দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়াল রয়েছে আব্দুল হালিম তার মধ্যে অন্যতম মাস্টারমাইন্ড। তার কলিগ ও বন্ধুবান্ধবদের ভাষ্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নাকি টাকায় কেনা যায়। অতএব দুদক তাকে কিছুই করতে পারবে না।
দ্য ফিনান্স টুডের অনুসন্ধান কিভাবে লিফট কান্ডের দুর্নীতি থেকে আব্দুল হালিমকে পার করে দেওয়া হলো। গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ যে কোম্পানির লিফট দেওয়ার কথা ছিল দরপত্র অনুযায়ী ইতালির বিখ্যাত মভি ব্র্যান্ডের। কিন্তু ইলেকট্রিক মোটর ছাড়া কেবিন ও যন্ত্র দেওয়া হয়েছে চীনের। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করায় লোড বেশি হলেই আটকা পড়ে লিফট। প্রতি মাসের রক্ষণাবেক্ষণ এর কথা থাকলেও তা বাস্তবে হতো না। অতএব লিফট দুর্ঘটনার সাথে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি উঠেছে। পরপর দুটি লিফট দুর্ঘটনা ঘটেছে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজে এর দায় দায়িত্ব কার? গণপূর্ত অধিদপ্তরের দায় এড়াতে পারে কিনা? ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় অত্যন্ত ক্ষমতাধর ছিল এই দুর্নীতির বরপুত্র আব্দুল হালিম। জুলাই আন্দোলনের পর কেন তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় নাই এই দাবী মৃত্যুর পরিবারগুলো। দ্যা ফিনান্স টুডে অনুসন্ধানী টিম এ গিয়ে বিস্তারিত কাজ করছে।
ঢাকা, কুষ্টিয়া ও বগুড়াতে সম্পদের পাহাড় কিভাবে গড়ে তুললো এই প্রকৌশলী তা নিয়ে আমাদের অনুসন্ধান চলমান।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.