সামিউর রহমান লিপু
Published:2026-03-20 12:53:22 BdST
দরপত্র, নিয়োগ, ভ্যাকসিন ক্রয়ে কমিশন বানিজ্য, লাগামহীন দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ৬ কর্মকর্তার সিন্ডিকেটে জিম্মি প্রানীসম্পদ অধিদপ্তর
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কেনাকাটা, টেন্ডার এবং বড় বড় প্রকল্প নিয়ন্ত্রণে একটি অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা অধিদপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে জিম্মি করে ফেলেছে। এই চক্রটি মূলত নিয়োগ বানিজ্য, প্রকল্পের মালামাল কেনা, বিদেশ সফর এবং টেন্ডারে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে অবৈধ সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি সম্পদের পাহাড় গড়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। এদের সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে দেশের সাধারণ মানুষ যেমন সুলভমূল্যে ডিম ও মাংসের চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে ঠিক তেমনি প্রান্তিক খামারিরাও বঞ্চিত হচ্ছে এবং একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র বিশেষ অনুসন্ধানে এই সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের বিষয়ে বিস্ফোরক তথ্য উন্মোচিত হয়েছে যা আজকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হচ্ছে।
এফটি টীমের প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ৬ জন ক্ষমতাধর কর্মকর্তার হাতে জিম্মি হয়ে আছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ খোদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ আবু সুফিয়ানের হাতে। তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনেই এই অধিদপ্তরের যে কোনও নিয়োগ, বদলী, দরপত্র এবং কেনাকাটা ঘিরে কমিশন বানিজ্যে প্রশাসন শাখার পরিচালক ডাঃ বয়জার রহমান এবং উপ-পরিচালক ডাঃ তারেক হোসেন মূখ্য ভূমিকা পালন করেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রশাসন শাখার এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরেই প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরে তৈরি হয়েছে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক বলয়, যা নিয়োগ-টেন্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ন্ত্রণ করে। আর এই অনৈতিক কর্মকান্ডে সার্বিক সহযোগিতা করে থাকেন পরিচালক (উৎপাদন) ড. এ. বি. এম. খালেদুজ্জামান, উপ-পরিচালক (খামার) মোঃ শরিফুল হক এবং প্রকল্প পরিচালক মো: শাহজামান খান তুহিন।
সূত্র মতে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ আবু সুফিয়ান বিগত ১৭ বছর যাবত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে চাকরি করেছেন। পরবর্তীতে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর কতিপয় নেতার ডিও লেটরে তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান।
একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ডাঃ আবু সুফিয়ান আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মো: হানিফের নিকটাত্মীয় হওয়ার সুবাধে এই অধিদপ্তরে সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন। ৫ই আগষ্টের পটপরিবর্তনের পরপরই তিনি পুরোদস্তুর জামাতপন্থী বনে যান এবং প্রভাব খাটিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তাদের টপকে নিজেই অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের পদটি বাগিয়ে নেন। এক্ষেত্রে তিনি ২ জন সমন্বয়ককে ৫ কোটি টাকা দিয়েছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এখন ঐ সমন্বয়কদের ব্যবহার করে ভারমুক্ত হওয়ার জন্য জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অসংখ্য অভিযোগ নিয়ে একটি পূর্নাঙ্গ প্রতিবেদন আগামী পর্বে প্রকাশিত হবে।
এই সিন্ডিকেটের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর কর্মকর্তা হচ্ছেন পরিচালক (প্রশাসন) ডাঃ বয়জার রহমান। তিনি এবং তার স্ত্রী বিগত ১৭ বছর ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেছেন। ডাঃ বয়জার ১৯৮৭-৮৮ সেশনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটোনারি অনুষদে ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থায় তিনি শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতা এলে তিনি ছাত্রদলে যোগ দেন শিবিরের গুপ্তচর হিসেবে। তবে, ছাত্রদলের কোন কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়নি। এমনকি তিনি হলের কোন পদেও ছিলেন না। বর্তমানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে তিনি সর্বজনস্বীকৃত হাইব্রিড এবং সুযোগসন্ধানী একজন কর্মকর্তা। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন তিনি সেই দলের আদর্শের অনুসারী বনে যান। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে তার চাকুরীর আমলনামা দেখলেই এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে।
এই সিন্ডিকেটের তৃতীয় ক্ষমতাধর কর্মকর্তা হচ্ছেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডাঃ তারেক হোসেন। তার বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করার মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।
সূত্র মতে, নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে ডাঃ তারেক হোসেনের বিরুদ্ধে ১১-২০ গ্রেডের পদসমূহের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা ও পছন্দের প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়া এবং অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পদে থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে নিজের প্রভাব বিস্তার ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
এই সিন্ডিকেটের চতুর্থ ও পঞ্চম ক্ষমতাধর কর্মকর্তারা হচ্ছেন পরিচালক (উৎপাদন) ডা. এ বি এম খালেদুজ্জামান এবং পরিচালক (খামার) শরিফুল হক। দুইজনের বিরুদ্ধেই খামারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে, খালেদুজ্জামানের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ব্রাহমা গরু আমদানি ও বিক্রিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাদিক এগ্রোর কর্ণধার ইমরান হোসেনকে সার্বিক সহযোগিতা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
এছাড়াও, প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (খামার) শরিফুল হককে ঘিরে সন্দিহান অনেকেই। বাজারে অঘোষিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ এবং করপোরেট কোম্পানির আগ্রাসনে দেশের প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রি শিল্প এখন গভীর সংকটে। আর এই আগ্রাসনের নেপথ্যে শরিফুল হকের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কানাঘুঁষা চলছে অধিদপ্তরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বড় কোম্পানিগুলো মুরগির বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণ করায় প্রান্তিক খামারিরা তাদের ওপর জিম্মি হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’-এর মাধ্যমে খামারিদের স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে। এই বিষয়ে প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (খামার) শরিফুল হক গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু কোনও এক অজানা কারনে তার রহস্যজনক নীরবতায় কর্পোরেট কোম্পানিগুলো একচেটিয়াভাবে মুরগির খাদ্য ও ঔষধের বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পেয়েছে। যথাযথ তদারকি এবং মনিটরিং না থাকার কারণেই এই সেক্টরে দুর্নীতির রামরাজত্ব চলছে। দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ ও কার্যকর নীতিমালা না নিলে এই বিশাল শিল্প গুটিকয়েক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে, এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (খামার) শরিফুল হকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তথ্যপ্রমাণ পাওয়া সাপেক্ষে তাকে নিয়েও একটি বিশেষ প্রতিবেদন অচিরেই প্রকাশিত হবে।
এই সিন্ডিকেটের ষষ্ঠ কর্মকর্তা হচ্ছেন প্রকল্প পরিচালক মো: শাহজামান খান তুহিন। আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে নিজের পছন্দনীয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ করে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার বাণিজ্য করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
উল্লেখ্য, পরিচালক মো: শাহজামান খান তুহিন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী মির্জা আজমের ভাগ্নে পরিচয়ে ডিও লেটার নিয়ে পরিচালক পদে পদোন্নতি নিয়েছিলেন এবং বিসিএস লাইভস্টক একাডেমীর পরিচালক পদে নিয়োগ লাভ করেন। এমনকি পুলিশ ক্লিয়ারেন্সে তুহিনকে আওয়ামী পরিবারের সদস্য হিসাবে উল্লেখ করা আছে। যা তার এসএসবির ছাডপত্র যাচাই করলেই প্রমানিত হবে।
মো: শাহজামান খান তুহিন ৫ই আগষ্টের পটপরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেকে সবচেয়ে বড় জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের অনুসারী দাবী করে তদবিরের মাধ্যমে অধিদপ্তরের সবচেয়ে লাভজনক 'এআই' এর পরিচালক পদটি দখল করে নিয়েছেন। এই পদে আসতে তাকে প্রায় ২ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছিল বলেও কথিত আছে।
এদিকে, মো: শাহজামান খান তুহিন পরিচালক এ আই হিসাবে বদলীর আদেশ প্রাপ্তির পরপরই তার বিরোধিতা করে অধিদপ্তরে বিএনপিপন্থী কর্মকতা-কর্মচারীরা মিছিল মিটিং করে এবং উক্ত আদেশ বাতিল করার জন্য দাবী জানায়। কিন্তু তৎকালীন মহাপরিচালকের প্রভাবের কারণে আন্দোলনকারীরা পরে চুপ হয়ে যায়। এই বিষয়ে দ্য ফিন্যান্স টুডের একটি চৌকস টীম নিবিড় অনুসন্ধান শুরু করেছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু সুফিয়ান, পরিচালক ডাঃ বয়েজার এবং উপ-পরিচালক ডাঃ তারেক হোসেন মিলে এই অধিদপ্তরকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়ে রেখেছেন। বর্তমানে এই তিন জামাতপন্থী কর্মকর্তার দৌরাত্ম্যে অনেক সৎ, যোগ্য এবং নিষ্ঠাবান কর্মকর্তারা আজ কোনঠাসা। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত নিম্নে তুলে ধরা হলো।
৫ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য
সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ৬০০ কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়। এই নিয়োগে প্রশাসন শাখার দুই কর্মকর্তার নজিরবিহীন দুর্নীতির কারণে অধিদপ্তরে ব্যাপক তোলপাড় হয়।
অধিদপ্তরের একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, এই নিয়োগ ঘিরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার পরিচালক ডাঃ বয়েজার এবং উপ-পরিচালক ডাঃ তারেক হোসেনের নেতৃত্বে নিয়োগ বোর্ডে “সম্মানী ভাতা” নামে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোপাট, সদস্যপ্রতি দিনে প্রায় ১ লাখ টাকা ভাতা গ্রহন, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক নিয়োগে পক্ষপাতিত্ব এবং এক উপ-পরিচালকের ব্যক্তিগত গাড়িচালককে বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।
সূত্রমতে, অধিদপ্তরের এই নিয়োগ বোর্ড ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা—মূল সিদ্ধান্ত নেয়া হতো বাইরে থেকে। অধিদপ্তরের ৩ শীর্ষ কর্মকর্তার পারস্পরিক যোগসাজসে এই নিয়োগ বানিজ্য সম্পন্ন হয়। এনিয়ে ইতিপূর্বে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো তবে জামাত এবং এনসিপির প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার প্রত্যক্ষ দাপটে তাদের বিরুদ্ধে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আদালত অবমাননা করে ১২৮ শূন্য পদে জনবল নিয়োগের পাঁয়তারা
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে সমাপ্ত এনএটিপি প্রকল্পের ১২৮ জন মাঠ সহকারী প্রকল্প সমাপ্তি শেষে চাকুরী রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করার জন্য আবেদন করেন। ১২৮ জনের চাকুরী রাজস্ব খাতে প্রয়োজন রয়েছে মর্মে প্রতিবেদন পাওয়ার পর অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক ডা: মনজুর মোহাম্মদ শাহাজাদা একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে তাদের চাকুরী রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের জন্য মন্ত্রণালয়ে় প্রস্তাব প্রেরন করেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় হতে এই বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত না আসায় ভুক্তভোগীরা হাইকোর্টে রীট পিটিশন দাখিল করেন ( রীট নং-৭২০০/২৩)। তদপ্রেক্ষিত উচ্চ আদালত রীটকারীদের চাকুরী কেন রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা হবে না মর্মে বিগত ২৯/৫/২৪ ইং তারিখে রুলজারী করেন এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে শুন্য সমমানের ১২৮ টি পদ ( ৫৪ টি ক্যাশিয়ার ও ৭৪ টি অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিকের পদ) শুন্য রাখার জন্য নিদেশনা প্রদান করেন।
এমতাবস্থায়, কোন প্রকার যাচাই বাছাই ছাড়াই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে ৫৪ টি ক্যাশিয়ারের পদসহ অফিস সহকারী পদের লিখিত পরীক্ষার চুড়ান্ত ফলাফল ঘোষনা করে এবং নিয়োগপত্র জারির পদক্ষেপ নিচ্ছে আর এই অবৈধ প্রক্রিয়ার সমস্ত কলকাঠি নাড়ছেন নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও পরিচালক প্রশাসন ডা: তারেক।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের আদেশ অমান্য করার সাহস দেখিয়েছেন। এতে করে প্রাণিসম্পদ অধিদপরের মহাপরিচালকসহ নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত কর্মকর্তারা উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন।
ভ্যাকসিন ক্রয়ে ২১ কোটি টাকার দুর্নীতি
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে পিপিআর ও খুরা রোগ নির্মূলে ভ্যাকসিন ক্রয়ে ২১ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে বিভিন্ন পত্রিকায় ফলাও করে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এই বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও প্রশাসন শাখার পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করার জন্য অধিদপ্তরের নিকট প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তলব করে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুই কর্মকর্তাকে স্ব-শরীরে দুদক কার্যালয়ে এসে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জমা দেয়ার কথা থাকলেও তৎকালীন উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে তারা কাগজপত্র জমা দেয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নথি চাইলেও তা জমা না দেওয়া এবং তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ প্রভাবশালী মহলের চাপে ধামাচাপা পড়ে বলে দাবি করেছেন কর্মকর্তাদের একাংশ।
প্রাণীসম্পদ মেলা ঘিরে কমিশন বানিজ্য
গত নভেম্বরে জাতীয় প্রাণীসম্পদ মেলা সম্পন্ন হয়। এই মেলা ঘিরেও অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও প্রশাসন শাখার পরিচালক এবং উপ-পরিচালক মিলে প্রায় ৪ কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন। তাদের এই দুর্নীতিতে প্রত্যক্ষ সহায়তা করেছেন পরিচালক (উৎপাদন) ডঃ খালেদুজ্জামান এবং উপ-পরিচালক (খামার) মোঃ শরিফুল হক।
সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, প্রাণীসম্পদ মেলা আয়োজনের বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত বিল, স্টল বরাদ্দ ও সরবরাহে সিন্ডিকেট করে অভিযুক্তরা প্রায় ৪ কোটি টাকা হাতবদল করেছেন।
নিষিদ্ধ গরু আমদানি
২০২১ সালে ১৮টি আমেরিকান ব্রাহামা জাতের গরু বাংলাদেশে এনে তোলপাড় সৃষ্টি করেন ইমরান হোসেন। কিন্তু ব্রাহমা জাতের গরু আমদানি নিষিদ্ধ থাকায় সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে ঢাকা কাস্টমস। মূলত, করোনা মহামারির বিধিনিষেধের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা ব্রাহমা জাতের গরুগুলো বিমানবন্দরে ধরা পড়লে সেসময় গ্রহণ করতে যাননি কেউ। পরে জানা যায়, ওই গরুগুলোর আমদানিকারক সাদিক এগ্রো লিমিটেড। তারা কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে শাহিওয়াল জাতের উল্লেখ করে ব্রাহমা জাতের গরু আমদানি করেছিল। আর এটা করা হয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে। এই বিষয়ে সাদিক এগ্রোকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেন প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরের উৎপাদন শাখার পরিচালক ডা. এ বি এম খালেদুজ্জামান।
জব্দকৃত গরুগুলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সাভারের কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে রাখা হয়। পরবর্তীতে রহস্যজনকভাবে গরুগুলো চলে যায় ইমরানের সাদিক এগ্রোতে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, অবৈধভাবে আনা ব্রাহমা গরুগুলো ছিল প্রজনন অনুপযোগী। ফলে নিয়ম অনুযায়ী এসব প্রজনন অনুপযোগী গরু খামারি সংগঠনের কাছে হস্তান্তর করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। উপরন্তু সাদিক এগ্রোর ইমরান কৌশলে এসব গরু নিজের নামে নিয়ে নেন এবং শর্তানুযায়ী এসব গরুর মাংস বিক্রি না করে কোরবানির পশু হিসেবে বাজারেও বিক্রি করেছেন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের প্রাণিসম্পদ সেবা সপ্তাহ ও প্রদর্শনীতেও প্রকাশ্যে ইমরান এই ব্রাহমা জাতীয় নিষিদ্ধ গরু উঠিয়েছিলেন।
এছাড়া ৪৪৮টি গবাদিপশু কোনো ধরনের নিলাম ছাড়া জবাই করে ৬০০ টাকা কেজি দরে ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে বিক্রি, গোপনে ব্রাহমা গরু বিক্রি ও গরুর সিমেন বিক্রিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ডা. এ বি এম খালেদুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
২০ কোটি টাকার মালামাল ক্রয়ে ঘুষ লেনদেন; নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহের অভিযোগ
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রায় ২০ কোটি টাকার মালামাল ক্রয়ে নিম্নমানের কন্টেইনার ও সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে ৫ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের মালামাল ও কন্টেইনারের মান ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছিল সংশ্লিষ্টরা এবং এই ঘটনায় অভিযুক্ত কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালক মো: শাহজামান খান তুহিনের বদলির দাবি উঠে।
কথিত আছে মো: শাহজামান খান তুহিন পরিচালকের দায়িত্ব নিয়েই প্রায় ২০ কোটি টাকার মালামাল ক্রয়ের দরপত্র আহ্ববান করেন। পরে, নিয়মের ব্যতয় ঘটিয়ে বেসরকারী খাতে সরবরাহকারীকে কাজ দিয়ে নিন্মমানের কন্টেইনার ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে ৫ কোটি টাকার অধিক ঘুষ নিয়ে়ছিলেন। কন্টেইনারগুলি ল্যাব পরীক্ষা করলেই প্রমানিত হবে যে সেগুলো নিম্নমানের ছিল।
পরবর্তীতে, ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরবরাহকৃত কন্টেইনার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ল্যাবরেটরি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষা শেষে ল্যাবরেটরির রিপোর্ট মোতাবেক সরবরাহকৃত কন্টেইনার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি মানসম্মত ছিলো না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দরপত্রে কারচুপি এবং মাঠ পর্যায়ে যন্ত্রপাতি সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এই দুর্নীতি করা হয়েছে। এদিকে, অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন
২১ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ঘুষ-দুর্নীতি
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটার দরপত্র প্রক্রিয়ায় ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রায় ২১ কোটি টাকার এই কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসতেই তৎপর হয়ে গেছে সংশ্লিষ্ট সবাই।
সূত্র মতে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের সাথে সম্পৃক্ত এই কেনাকাটায় প্রথমে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদানের সুপারিশ (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড) দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কৃত্রিম ঘাটতি দেখিয়ে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগের সূত্র অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে সারা দেশে ক্ষুদ্র খামারি ও দরিদ্র কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ওষুধাঘারের মাধ্যমে ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনা হয়। এ বছর প্রায় ২১ কোটি টাকার কেনাকাটার জন্য মোট ৩১টি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কারণ ছাড়াই মিথ্যা তথ্য দিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া চালানো হয়। এই কাজে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা ঘুষের লেনদেন হয়েছে বলে দুদকে অভিযোগ জমা পড়ে।
দুদক জানায়, টেন্ডার সংক্রান্ত সংগৃহীত নথিপত্র বর্তমানে নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রচলিত বিধি-বিধান মেনে এই ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে এনফোর্সমেন্ট টিম কমিশন বরাবর বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করবে।
প্রশাসনে ক্ষোভ
সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর প্রানীসম্পদ মন্ত্রনালয়ের টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন এবং প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে এই অধিদপ্তরের সার্বিক বিষয়ে অবহিত করায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে এই চক্র। এই চক্রের কর্মকর্তাদের দাপটে সাধারন কর্মকর্তারা আজ কর্মপরিবেশ হারাতে বসেছেন। তবে অচিরেই এই জটিলতা নিরসন হবে বলে তারা আশাবাদী।
বর্তমানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের শক্তিশালী এবং অত্যন্ত ক্ষমতাধর এই সিন্ডিকেটের এসব অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা কেউই ফোন ধরেননি। এমনকি ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘদিনের বঞ্চিত কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা আওয়ামী দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেয়েছি সত্য, তবে গুপ্ত জামাতিদের কবলে পড়ে আমাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। অবিলম্বে এই চক্রকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে অধিদপ্তরের দক্ষ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে আনতে না পারলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উন্নয়ন পরিকল্পনা অনেকটাই বাধাগ্রস্থ হবে। তাই গুপ্ত জামাতী ও দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তাদের অপসারণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে সচেতন মহল মনে করেন।
উল্লেখ্য, প্রাণিসম্পদ খাত দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু উপরোক্ত অভিযোগ সমূহ সত্য হলে এটি শুধু একটি দপ্তরের সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে' ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। আগামী পর্বে প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডা: আবু সুফিয়ানের আমলনামা ফিন্যান্স টুডের পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হবে। এরপর, পর্যায়ক্রমে এই সিন্ডিকেটের সকল সদস্যের আমলনামা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
