January 5, 2026, 8:46 am


নেহাল আহমেদ, রাজবাড়ী

Published:
2026-01-04 16:11:31 BdST

আজ সাগর সেনের অকাল প্রয়াণ দিবস


বাঙালি জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর গান। বিগত শতকের গোড়ার দিকে পঙ্কজ কুমার মল্লিক রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার যে গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের বিভিন্ন শিল্পীরা বিভিন্ন সময়ে সেই দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

পঙ্কজ-প্রবর্তিত পথেই হেটেছেন তাঁরা নিজের যোগ্যতায় এবং আপন ভঙ্গিমায়। এবং এইভাবেই রবীন্দ্রগান হয়ে উঠেছে বাংলার প্রতিটি ঘরের সুখ-দুঃখের নিত্যসঙ্গী। সকাল-সাঁঝে কাজের মাঝে অনেকেই নিজ নিজ প্রিয় শিল্পীর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত কানে ঢেলে নিতে চান। আবার অনেক সময় বেতার বা বর্তমান যুগের নিত্যসঙ্গী মুঠোফোনের মাধ্যমে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ঠিক কানে চলে আসে বিভিন্ন গান, রবীন্দ্রসঙ্গীতও।

পঙ্কজ-প্রবর্তিত সেই পথেই হেটেছেন বাংলার সঙ্গীতজগতের এক বিস্ময়কর প্রতিভা সাগর সেন। তিনি নিজের যোগ্যতায় এবং আপন ভঙ্গিমায় উজ্জল ভাস্কর। তাঁর নিজস্ব গায়কি এবং কন্ঠের মাধুর্য রবীন্দ্রগান গানকে করেছেন বাংলার প্রতিটি ঘরের সুখ-দুঃখের নিত্যসঙ্গী। প্রয়াণের আটত্রিশ বছর পরও গান দিয়ে আকৃষ্ট করতে পারেন তিনি। বিমুগ্ধ শ্রোতারা আজও অবাক হয়ে শোনেন তাঁর কণ্ঠ।

পূর্বতন পূর্ববঙ্গের অধুনা ফরিদপুর জেলার রাজবাড়ীর প্রখ্যাত জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বিজনবিহারী সেন ও নয়নমঞ্জরী সেনের কনিষ্ঠ পুত্র সাগর সেন। তবে তাঁর জন্ম হয়েছিল কলকাতায় ১৯৩২ সালের ১৫ মে। স্থানান্তরের পরবর্তীতেও দেশের বাড়িতে বহুদিন ধরে তাঁর যাতায়াত ছিল অব্যাহত। অনেকেরই ধারণা তাঁর জন্ম বরানগরে মামারবাড়িতে। কিন্তু তা সঠিক নয়। শৈশবকাল বাংলাদেশে কাটলেও তাঁর প্রায় আড়াই দশকের সঙ্গীতজীবন কেটেছে কলকাতাতেই।

ছোটোবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রকৃতিদত্ত কণ্ঠের অধিকারী। সেই কণ্ঠকেই ধীরে ধীরে পরিশীলিত, পরিমার্জিত করে তুলেছিলেন তিনি নিজের চেষ্টায় ও দক্ষতায়। সেই অর্থে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান শেখেননি কারোর কাছেই। তা সত্ত্বেও আশ্চর্যজনকভাবে অদৃষ্টের বিধানে সঙ্গীতই ছিল তাঁর সারাজীবনের মূল সঙ্গী। তীর্থপতি ইন্সটিটিউশনে স্কুল শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। পরে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রোতাদের সামনে উপস্থিত হওয়া এবং ১৯৫৮ সালে প্রথম বেতারে সঙ্গীত পরিবেশন। এইভাবেই তাঁর সঙ্গীতজীবনের সূত্রপাত ঘটে।

সঙ্গীতজীবনের প্রথম থেকেই সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তাঁর কণ্ঠের অসামান্য ব্যাপ্তি ও গভীরতা ছিল বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। ভাবের জটিলতম মিশ্রণের অনায়াসসাধ্য পরিবেশনাতেও অত্যন্ত সফল ছিলেন তিনি।

১৯৬১ সালে মেগাফোন কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রথম রেকর্ড। গানদুটি ছিল ‘ওগো জলের রাণী’ এবং ‘নূপুর বেজে যায়’। এর এক বছরের মধ্যেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষাকেন্দ্র ‘রবিরশ্মি’। অচিরেই ‘রবিরশ্মি’র নথিভুক্ত ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা হাজার অতিক্রম করে এবং তাঁর অনুগামীদের সংখ্যাও বেড়ে ওঠে ক্রমশঃ।

একইবছর তিনি সুমিতা দেবীর সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁর প্রথম সন্তান প্রীতম সেন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৪ সালে। ওই একই বছর তাঁর গাওয়া 'আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না' এবং 'কেন আমায় পাগল করে যাস' প্রকাশিত হয় কলম্বিয়া রেকর্ড লেবেলে।

তাঁর দ্বিতীয় পুত্র প্রিয়ম জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৬-তে এবং তার পরের বছরই তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র প্রমিত সেনের জন্ম হয়। ১৯৬৭ সালেই কলম্বিয়া রেকর্ডস থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি রেকর্ড, যার গানদুটি ছিল 'ওই মালতীলতা দোলে' এবং 'আমার নয়ন তব নয়নের'।

১৯৬৮ সাল হল সাগর সেনের সঙ্গীতজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বছর। সেই বছর গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর কণ্ঠে 'সখী বহে গেলো বেলা' এবং 'আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান' - রবীন্দ্রনাথের 'মায়ার খেলা' নাটকের গান। 'আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান'- গানটি সাগর সেনকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। এইভাবেই 'রবিরশ্মি'-'র প্রতিষ্ঠাতা সাগর সেন হয়ে উঠলেন এক সচল প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ঈপ্সিত হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতানুরাগী মানুষদের কাছে; জন্ম হল এক কিংবদন্তির।

১৯৭৯ সালে 'পরিচয়' ছায়াছবিতে তাঁর গাওয়া 'আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে' গানটির জন্য রবীন্দ্রসঙ্গীতে শ্রেষ্ঠ নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সাগর সেন 'বিএফজেএ' পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে তিনিই প্রথম পুরুষ শিল্পী, যিনি সিনেমায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে পুরস্কার লাভ করেছিলেন।

সাগর সেনের স্বল্প সঙ্গীতজীবনে তিনি প্রায় ১০০টি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেছেন, যেগুলি প্রায় আড়াই দশক ধরে প্রকাশিত হয়েছে মেগাফোন, কলম্বিয়া, এইচএমভি রেকর্ড লেবেলে।

এহেন একজন কিংবদন্তি শিল্পীর বহু অসামান্য রবীন্দ্রসঙ্গীত সেইসময়ে রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত হত। তিনি ছিলেন বেতারের নিয়মিত শিল্পী। অনন্য উপলব্ধি এবং আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি তাঁর রেকর্ড করা প্রতিটি রবীন্দ্রসঙ্গীতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বহু অপ্রচলিত রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর কণ্ঠেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার জনমানসে। বিভিন্ন গীতিনাট্যে কণ্ঠদান তো বটেই, নির্দিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে সংকলিত মঞ্চানুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অন্যতম পথপ্রদর্শক। এই অনুষ্ঠানগুলির পরিকল্পনা, পরিচালনা ও নির্দেশনায় থাকতেন সাগর সেন নিজেই। সেসব অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে 'শ্রাবণসন্ধ্যা', 'বিশ্বজন মোহিছে', 'গানের ঝর্ণাতলায়', 'স্বদেশী নেয়ে বিদেশী খেয়া', 'ঋতুরঙ্গ' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে 'শ্রাবণসন্ধ্যা' বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল এবং এই অনুষ্ঠানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ তাবড়-তাবড় শিল্পীরা অংশগ্রহণ করতেন। এই মঞ্চানুষ্ঠানগুলির মাধ্যমে নবপ্রজন্মের বহু সঙ্গীত এবং নৃত্যশিল্পীদের তিনি প্রতিভা প্রকাশের যোগ্য সুযোগ দিতেন। সমকালীন সময়ে সাগর সেন ছিলেন এক বিস্ময়কর মঞ্চায়োজক।

সঙ্গীতশিল্পী ছাড়াও সাগর সেন ছিলেন একজন প্রতিভাবান ভাস্কর। কিশোর বয়সেই দেশের বাড়ির একচালা দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করতেন একাই নিজ হাতে। ভবানীপুরে এক আত্মীয়ের বাড়ির দুর্গাপূজায় টানা আধঘণ্টা-একঘণ্টা ঢাক বাজাতে পরিবারের অনেকেই দেখেছেন তাঁকে। এছাড়া খুব ভালো ছবিও আঁকতেন।

একজন আদর্শ সঙ্গীতশিল্পীর সমস্ত গুণই ছিল তাঁর মধ্যে বর্তমান। অত্যন্ত নিয়মমাফিক জীবনযাপন করতেন তিনি। নিয়মিত সকালে উঠে রেওয়াজে বসতেন। অতি মশলাদার বা ঠান্ডা জিনিস খেতেন না একেবারেই। তাঁর অত্যন্ত প্রিয় খাবার ছিল চিংড়িমাছ ও খাঁটি ইলিশ। শুধুমাত্র কণ্ঠের যত্নের কথা মাথায় রেখে এইসব খাবার ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সময়জ্ঞানও ছিল অত্যন্ত প্রখর। তাঁকে দিয়ে ঘড়ির সময় মেলানো যেত। হাজার ঝড়-জল-বৃষ্টিতেও পূর্ব-নির্ধারিত সময়েই শুরু করতেন প্রতিবারের ‘শ্রাবণসন্ধ্যা’ অনুষ্ঠান। এছাড়া বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন ধরণের গান শোনার শখ ছিল তাঁর। ইংরেজি, গ্রিক, জার্মান ইত্যাদি ভাষার গানও শুনতেন এবং চিন্তা করতেন কীভাবে সেই সঙ্গীতশৈলী সুচিন্তিত, সাবলীল এবং মার্জিতভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবকে অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োগ করা যায়। 

সাগর সেন শুধুমাত্র একজন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিভাই নন, তিনি ছিলেন একাধারে সঙ্গীত-পরামর্শদাতা, আয়োজক, সঙ্গীত পরিচালক এবং সর্বোপরি একজন মানবদরদী মানুষ। নিজের আয়োজিত বহু চ্যারিটেবেল পাবলিক ফাংশনের মাধ্যমে তিনি অক্লান্তভাবে জনহিতকর কাজের প্রেক্ষিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। বিশেষ করে সত্তরের দশকের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে তিনি বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাহায্য করেছিলেন। কত মানুষকে নিঃশব্দে কত দান করেছেন তিনি, পরিবারের কাউকে কখনও জানতে দেননি। তাঁর বহু ছাত্র ও অসংখ্য অনুরাগীদের কাছে তিনি ছিলেন ঈশ্বরতুল্য মানুষ, একজন পথ-প্রদর্শক, একজন অভিভাবক, একজন পরহিতব্রতী ব্যক্তিত্ব, তাদের প্রিয় 'সাগরদা'!

খ্যাতির মধ্যগগনে থাকাকালীনই তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হন। এর মধ্যেও অদম্য উদ্যমে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গানের রেকর্ডিং করেছেন তিনি। কিন্তু এক সময় ব্যাধি তাঁকে গ্রাস করে দুর্দান্তভাবে। প্রায় দেড় বছরের লড়াই শেষে সাগর সেনের বিস্ময়কর সঙ্গীতজীবন হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে যায়। মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে, ১৯৮৩ সালের ৪ জানুয়ারি এই অসামান্য সঙ্গীতপ্রতিভা পরলোক গমন করেন।

সাগর সেনের আত্মপ্রত্যয়, অবিচলিত নিষ্ঠা, রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কে অবিমিশ্র শ্রদ্ধা তাঁকে অচিরেই জনমানসে একটি কালজয়ী আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.