May 5, 2026, 6:25 am


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-05-05 04:45:56 BdST

অগ্রণী ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, নেপথ্যে সাত্তার গ্রুপ


রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য ব্যাংকের মতো গত দেড় দশকে অগ্রণী ব্যাংকেও সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এই সময়ে ঋণের নামে ব্যাংকটি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন প্রভাবশালীরা। ব্যাংকিং নিয়ম না মেনে ঋণ দেয়ার কেলেঙ্কারিতে ধুঁকছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মূলধন সংরক্ষণে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের লুটপাট, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে এখন ভঙ্গুর অবস্থায় ব্যাংকটি। আমদানি-রপ্তানির আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার দেশের ব্যাংক খাতকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।

অগ্রণী ব্যাংকের বড় গ্রাহক ও ঋণ বিতরণের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যাংকটির বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ৮২ শতাংশ বড় গ্রাহকদের কাছে কেন্দ্রীভূত। মাত্র ৬৪ গ্রাহককে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে ব্যাংকটি। এই তালিকায় একই পরিবারের চার-পাঁচটি পৃথক কোম্পানিও রয়েছে।

সূত্র মতে, ব্যাংকটির প্রায় ৫২ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে রাজধানীর মাত্র নয়টি শাখা থেকে। এর মধ্যে কেবল মতিঝিলের প্রিন্সিপাল শাখা থেকে বিতরণ হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকার ঋণ। অন্যদিকে, গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে ডেফারেল সুবিধা পেয়েও অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার ৮২২ কোটি টাকা।

এদিকে, খেলাপি ঋণে জর্জরিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও শীর্ষ খেলাপিদের নিয়ে বিপাকে ব্যাংকটি। সূত্র মতে, জজ ভূইয়া, তানাকা, ম্যাগপাই নিটওয়্যার, ঢাকা হাইড অ্যান্ড স্কিন ও বসুন্ধরার দুই প্রতিষ্ঠানসহ শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে ব্যাংকটির আটকে আছে ১৩ হাজার কোটি টাকা। এই তালিকার নতুন সংযোজন হচ্ছে সাত্তার গ্রুপ।

একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, সাত্তার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর ই আলম রানা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর সুপারিশে রাষ্ট্রয়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। পরে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ পরিশোধ প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেন তিনি।

অগ্রণী ব্যাংক টাকা আদায়ে একের পর এক পদক্ষেপ নিলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। উল্টো টাকা না দেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে অভিযুক্ত রানা কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে রেখেছেন ‘বিগ বটম লিমিটেড’।

অভিযোগ আছে, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তৎকালীন মন্ত্রী শাহজাহান খানের প্রভাব খাটাতেন এই নূর ই আলম রানা। যদিও ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এই ‘ধূরন্ধর’ এখন ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতাদের আশীর্বাদ পেতে দলটির অফিসে ঘুরছেন। বর্তমানে বিপুল অঙ্কের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করে বহাল তবিয়তেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি।

অগ্রণী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সাত্তার গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের নামে অগ্রণী ব্যাংক থেকে নেয়া হয়েছিলো ৬১১ কোটি টাকা। যা সুদ ও আসলসহ বর্তমান স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমার চেয়েও বেশি ঋণ বিতরণের অভিযোগ রয়েছে ব্যাংকটির বিরুদ্ধেই।

অভিযোগ অনুযায়ী, সাত্তার জুট অ্যান্ড ফাইবার্স লিমিটেডের নামে অগ্রণী ব্যাংক থেকে সিসি প্লেজ ঋণ নেওয়া হয়েছে ৪৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অথচ ঋণসীমা ছিল ৪০ কোটি। অর্থাৎ ৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত প্লেজ ঋণ দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক।

এছাড়া, একই কোম্পানিকেই সিসি ব্লক হিসেবে ৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং সিসি হাইপো হিসেবে ৩০ কোটি ঋণসীমা অতিক্রম করে ৩৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, এই ঋণের বিপরীতে যে পরিমাণ সম্পদ গোডাউনে থাকার কথা সেই পরিমাণ সম্পদ প্রতিষ্ঠানটির গোডাউন পরিদর্শনে যেয়ে পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল।

এই গ্রুপের আরেকটি প্রতিষ্ঠান স্টেয়ার ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে সিসি হাইপো ঋণ নেওয়া হয়েছে ২৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার। অথচ ঋণসীমা ছিল ২০ কোটি টাকা। প্লেজ ঋণ নেয়া হয় ৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকার অথচ ঋণসীমা ছিল ৭ কোটি টাকা। ব্লক ঋণ নেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার।

সাত্তার গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান, স্পান স্টার নামের কোম্পানি সিসি হাইপো ঋণ নিয়েছে ২৭ কোটি ২৬ লাখ টাকার। অথচ ঋণসীমা ছিল ২২ কোটি টাকা। এদিকে প্লেজ ঋণের সীমা ১৫ কোটি টাকা হলেও ঋণ নেয়া হয়েছে ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার। সেভেন হ্যাভেন নামের কোম্পানিটির পক্ষে হাইপো ঋণ নেয়া হয়েছে ৪৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা আর প্লেজ ঋণ নেয়া হয়েছে ৩৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

সাত্তার গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান এসএলজি ইউনিক লিমিটেডের নামে সিসি হাইপো ঋণ নেওয়া হয়েছে ৬৫ কোটি ৩ লাখ টাকা যার ঋণসীমা ছিল ৫৫ কোটি টাকা। সাত্তার ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের নামে হাইপো ঋণ নেওয়া হয়েছে ১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকার।

অগ্রণী ব্যাংক থেকে এসএলজি বেস্ট লিমিটেডের নামে হাইপো ঋণ দেওয়া হয়েছে ৩৯ কোটি ৭১ লাখ টাকার যার ঋণসীমা ছিল ৩৪ কোটি টাকা। ৫০ কোটি টাকা ঋণসীমার প্লেজ ঋণ দেওয়া হয়েছে ৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার। ব্লু গ্রের নামে ২৫ কোটি ঋণসীমার প্লেজ ঋণ দেওয়া হয়েছে ৩১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং ৩০ কোটি ঋণসীমার হাইপো ঋণ দেওয়া হয়েছে ৩৮ কোটি ২২ লাখ টাকার।

অন্যদিকে, গোল্ডেন প্যারট ও গ্লো ওভার লিমিটেডের নামে দেয়া হয়েছে যথাক্রমে ৫১ কোটি ৩০ লাখ ও ৫০ কোটি ২০ লাখ টাকার ঋণ।

অগ্রণী ব্যাংকের পক্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের অনূকুলে সব মিলিয়ে মোট ৬১১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ঋণ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু ঋণের এই অর্থ ব্যবসায়িক কাজে যথাযথভাবে ব্যবহার না করে নিজের মনের মতো করে খরচ করেছেন সাত্তার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর ই আলম রানা।

বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বিশাল অংকের ঋণ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নেয়া হলেও রানা এই সমুদয় ঋণের অর্থে বিলাসী জীবনযাপন করেছেন। ঋনের অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বাড়ি নির্মাণ, ফ্ল্যাট ক্রয় এবং জমি কেনায়। 

নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ প্রদানের পর ব্যাংকের দায়িত্ব হচ্ছে টাকার ব্যবহার যথাযথভাবে হচ্ছে কি না তা তদারকি করা। তবে, অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সাত্তার গ্রুপ বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়ে সেই ঋণ আর পরিশোধ করছে না।

সূত্রমতে, বিশাল এই ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টার  ছিলেন রানার শ্বশুর সাবেক রূপালী ব্যাংক কর্মকর্তা সাইফুল আলম ও তার বড় ভাই লুতফর মোল্লা। লুতফর মোল্লা আবার সাব-রেজিস্টার হিসেবে সর্বশেষ নীলফামারির জলঢাকায় দায়িত্বরত ছিলেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো ঋণের গ্যারান্টার ছিলাম না। রানার সাথে কোন যোগাযোগ নেই আমার।’ এই কথা বলেই তিনি ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে, তার সাথে আর যোগাযোগ করা সম্ভবপর হয়নি।

এই অনিয়মের বিষয়ে জানতে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ফোন দেয়া হলে তিনি বলেন, ‘সাত্তার গ্রুপ যখন ঋণ পেয়েছিল তখন আমি এমডি ছিলাম না। এক্সাক্টলি কী হয়েছে বলতে পারবো না।’

অগ্রণী ব্যাংকের ঋণ প্রদানে এই অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে শুধুমাত্র গ্রাহকই দায়ী নয়। ব্যাংকের দায় আরও বেশি। যেসব গ্রাহকের ঋণ পাওয়ার কথা নয় কিংবা ঋণ পাওয়া উচিত ১০০ টাকা, ব্যাংকের যোগসাজশে সেই গ্রাহক ঋন পেয়েছে ৫০০ টাকা।

তিনি বলেন, গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আছে কি না তা যাচাই না করেই দেওয়া হয়েছে ঋণ। এতে করে গ্রাহক আর ঋণ ফেরত দিতে পারছে না। এমন ঘটনায় ব্যাংক এবং গ্রাহক উভয়কেই শাস্তি পেতে হবে।’

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. খন্দকার বজলুল হককে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম এই সদস্য পরবর্তীতে দলটির পরিবেশ উপকমিটির চেয়ারম্যানও ছিলেন। একই সময়ে ব্যাংকটির পর্ষদে ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা পরিচালক হিসেবে স্থান পান।

সূত্রানুযায়ী, ২০১০ সালের মার্চে সৈয়দ আবদুল হামিদকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগ দেয়া হয়। মূলত সেই সময় থেকেই ব্যাংকটিতে অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে অগ্রণী ব্যাংকের নাম।

পরবর্তীতে, ২০১৪ সালের নভেম্বরে খন্দকার বজলুল হকের পরিবর্তে অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখতকে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় শেখ হাসিনার সরকার। অন্যদিকে, ঋণ কেলেঙ্কারিতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ায় ২০১৬ সালের জুনে এমডি পদ থেকে সৈয়দ আবদুল হামিদকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর মো. শামস-উল-ইসলামকে ব্যাংকটির এমডি পদে নিয়োগ দেয়া হয়। দুই মেয়াদে টানা ছয় বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২২ সালের আগস্টে তিনি অবসরে যান।

অগ্রণী ব্যাংক কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ২০১০ সালের পর থেকে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে যে অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু হয়, পরবর্তী সময়ে সেটি ব্যাংকের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন সাবেক দুই এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদ ও শামস-উল-ইসলাম। গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে কমিশন নিতেন তারা। ঘুষ হিসেবে প্রাপ্ত কমিশনের একটি অংশ চেয়ারম্যানসহ পরিচালকদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হতো।

অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা ও তাদের শাস্তির আওতায় আনার বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আনোয়ারুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে নিয়মিতই কোনো না কোনো ঋণের বিষয়ে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের তলব করা হচ্ছে। আমরাও চেষ্টা করছি দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে। আশা করছি, অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা সাবেক কিংবা বর্তমান যা-ই হোক না কেন, তারা শাস্তি পাবে।’

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.