ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষায় বুড়িগঙ্গা
বুড়িগঙ্গা দূষণ ও দখলের জন্য শুধু সরকার নয়, আমরা সবাই দায়ী। শিল্পমালিকরা ইটিপি না চালিয়ে বর্জ্য ফেলছে। বাড়ির ময়লা সরাসরি নদীতে ফেলছি। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় দখল চলছে বছরের পর বছর। হাইকোর্ট বহুবার নির্দেশ দিয়েছে দখলমুক্ত করতে, দূষণ বন্ধ করতে। কিন্তু বাস্তবায়ন নেই
বুড়িগঙ্গা শুধু একটি নদী নয়, ঢাকার জন্মের সাক্ষী। চারশো বছর আগে এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল আজকের রাজধানী। ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, সংস্কৃতি—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল বুড়িগঙ্গা। অথচ আজ সেই বুড়িগঙ্গাই ধুঁকছে। দখল, দূষণ আর অবহেলায় ঢাকার এই প্রাণপ্রবাহ এখন মৃতপ্রায়। ঐতিহ্যের ধারক বুড়িগঙ্গাকে রক্ষা করা তাই কেবল পরিবেশগত দায় নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
বুড়িগঙ্গার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম, মুঘল আমলে বুড়িগঙ্গা ছিল ঢাকার প্রধান বাণিজ্য পথ। সদরঘাট, আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা—সবকিছু এই নদীকে ঘিরে। নদীপথে আসত মসলিন, আসত বিদেশি বণিক। নদীর পানিতে প্রতিফলিত হতো ঢাকার সমৃদ্ধি। সাহিত্যে, গানে, চিত্রকলায় বুড়িগঙ্গা বারবার উঠে এসেছে। এই নদী ছাড়া ঢাকার ইতিহাস অসম্পূর্ণ। আজকের ইট-পাথরের ঢাকার নিচে যে সাংস্কৃতিক শিকড়, তার মূল রসদ জুগিয়েছে বুড়িগঙ্গা।
বর্তমানের চিত্র দখল ও দূষণের করাল গ্রাসের। বুড়িগঙ্গার দুই তীরে এখন ইটভাটা, ট্যানারি, প্লাস্টিক কারখানা, বহুতল ভবন। প্রভাবশালীরা নদী ভরাট করে গড়ে তুলেছে মার্কেট, গুদাম, আবাসিক প্রকল্প। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যের কাছাকাছি। ঢাকার প্রায় ৭০০০ শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি এই নদীতে পড়ছে। প্রতিদিন প্রায় ৬০ হাজার ঘনমিটার তরল বর্জ্য ও ৪৫০ টন কঠিন বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় মিশছে। পলিথিন, প্লাস্টিক, ট্যানারির ক্রোমিয়াম, টেক্সটাইলের রং—সবকিছু মিলে নদীর পানি এখন কালো বিষ। গ্রীষ্মে নদীর পাশে দাঁড়ানো যায় না দুর্গন্ধে। মাছ, জলজ প্রাণী বহু আগেই বিলুপ্ত।
বুড়িগঙ্গা বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে। এই নদী ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জ করে। নদী মরে গেলে পানির সংকট তীব্র হবে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা বাড়বে, কারণ প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেম নষ্ট হচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ছে, নগরীর তাপদ্বীপ প্রভাব তীব্র হচ্ছে। নদী না থাকলে ঢাকার বাতাস আরও বিষাক্ত হবে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও বুড়িগঙ্গা গুরুত্বপূর্ণ। নৌপথ সচল থাকলে সড়কের চাপ কমে, পরিবহন খরচ কমে। পর্যটনের অপার সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, বুড়িগঙ্গা আমাদের পরিচয়। নদী হারালে আমরা শেকড়হীন হয়ে পড়ব।
বুড়িগঙ্গা দূষণ ও দখলের জন্য শুধু সরকার নয়, আমরা সবাই দায়ী। শিল্পমালিকরা ইটিপি না চালিয়ে বর্জ্য ফেলছে। বাড়ির ময়লা সরাসরি নদীতে ফেলছি। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় দখল চলছে বছরের পর বছর। হাইকোর্ট বহুবার নির্দেশ দিয়েছে দখলমুক্ত করতে, দূষণ বন্ধ করতে। কিন্তু বাস্তবায়ন নেই।
এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। প্রথমত, নদীর সীমানা পিলার দিয়ে চিহ্নিত করে সিএস ম্যাপ অনুযায়ী সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিল্পবর্জ্য পরিশোধন বাধ্যতামূলক করতে হবে। ইটিপি না চালালে কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। তৃতীয়ত, ঢাকা ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন লাইন নদীতে না ফেলে শোধনাগারে নিতে হবে। চতুর্থত, নদী খনন করে নাব্যতা ফেরাতে হবে। পঞ্চমত, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজে বুড়িগঙ্গা রক্ষার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নদীপাড়ে সবুজ বেষ্টনী ও ওয়াকওয়ে করে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
বুড়িগঙ্গা ছাড়া ঢাকা কল্পনা করা যায় না। এই নদী মরে গেলে ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিবেশ—সবই মরে যাবে। উন্নয়নের নামে আমরা নদী হত্যা করছি, আসলে নিজেদের ভবিষ্যৎ হত্যা করছি। এখনো সময় আছে। প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাধারণ মানুষ—সবার সম্মিলিত উদ্যোগে বুড়িগঙ্গাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। টেমস, সিন, ক্লিন নদী যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারে, বুড়িগঙ্গা কেন পারবে না? ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষায়, আগামী প্রজন্মের জন্য, বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতেই হবে। এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
Shamiur Rahman
