বিশেষ প্রতিবেদক
Published:2026-01-19 13:55:25 BdST
রাজউকের অদৃশ্য দুর্নীতির সাম্রাজ্য ও দুদকের নীরবতায় নগরবাসীর প্রশ্ন—হিসাবের দিন আসবে কবে?থলের বিড়ালের রাজত্ব ভাঙবে কবে?
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউক। কাগজে-কলমে এটি দেশের নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। অথচ বাস্তব চিত্র যেন উল্টো। রাজধানীর প্রতিটি ইমারত অনুমোদন, প্ল্যান পাস, জমি বরাদ্দ কিংবা ঠিকাদারি কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে—সেই রাজউক এখন দুর্নীতির অভিযোগে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে। সরকারি প্রতিষ্ঠান হয়েও এখানে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলয়—যেখানে ফাইলের গতি নির্ধারিত হয় নিয়মে নয়, বরং অঘোষিত ‘লেনদেনের ছকে’।
অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক। রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান সংস্থা। কাগজে যার ক্ষমতা পাহাড়সম, কিন্তু বাস্তবে যেসব অভিযোগ বছরের পর বছর ধুলো জমে থাকে তদন্তের অপেক্ষায়—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় যখন একের পর এক দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও দুদকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই অভিযোগগুলো কি কেবল কাগজেই বন্দী থাকবে নাকি কোনো একসময় বেরিয়ে আসবে অদৃশ্য দেয়ালের আড়ালের সত্য?
এই প্রেক্ষাপটে রাজউকের জোন-৫ অফিস ঘিরে সম্প্রতি সামনে এসেছে একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ। ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি—এখানে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যার অন্যতম আলোচিত নাম ফাতেমা বেগম ওরফে মলি—বর্তমানে রাজউক জোন-৫-এর অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর এবং উচ্চমান সহকারী (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত)।
২০২০ সালের ১১ অক্টোবর মেহেদী হাসান নামের এক ভুক্তভোগী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়—মলি দীর্ঘদিন ধরে চাকরির সুবাদে রাজউকের অভ্যন্তরে প্রভাবশালী একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। প্রাক্কলন, চুক্তিপত্র, বোর্ড সভার কর্মপত্র, ঠিকাদারদের বিল কিংবা প্ল্যান পাসের নথি—কোনো ফাইলই নাকি ‘অঘোষিত মূল্য’ ছাড়া নড়ে না।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়—রাজউকের সদস্য মেজর (অব.) শামসুদ্দিনের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সূত্রে মলি নিজেকে প্রভাবশালী পরিচয়ে উপস্থাপন করেন। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর একই জায়গায় কর্মরত থাকার সুযোগে ঠিকাদার ও গ্রাহকদের একটি নির্ভরশীল বলয় তৈরি হয়েছে, যেখানে ফাইল আটকে রাখা কিংবা দ্রুত ছাড়—সবই নাকি নির্ধারিত হয় লেনদেনের মাধ্যমে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার ফলে ঠিকাদার ও সাধারণ গ্রাহকদের হয়রানি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে সরকারি সেবা আটকে থাকে, অন্যদিকে নিরুপায় মানুষ বাধ্য হয় ‘অদৃশ্য দরজা’ দিয়ে সমাধান খুঁজতে।
সবচেয়ে আলোচিত অংশ আসে সম্পদের বিবরণে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়—একজন উচ্চমান সহকারী পদমর্যাদার কর্মকর্তা কীভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন—এ প্রশ্ন এখন রাজউকের ভেতরেই ফিসফাস আলোচনার বিষয়।
নথি অনুযায়ী অভিযোগে বলা হয়েছে—মলির নামে রাজধানীর পূর্বাচলে ১৭ নম্বর সেক্টরে ৫ কাঠার একটি প্লট, ২২ নম্বর সেক্টরে আরও ৫ কাঠার একটি এবং ২৭ নম্বর সেক্টরে ৫ কাঠার আরেকটি প্লট রয়েছে। রাজধানীর ঝিগাতলায় ১৫/এ ঠিকানায় হাফিজুল্লাহ গ্রিন টাওয়ারে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের তিনটি ফ্ল্যাটের মালিকানার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায় তিনি হাফিজুল্লাহ গ্রীন টাওয়ারেই বসবাস করেন। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জসহ গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর এলাকাতেও বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। চলাফেরার ক্ষেত্রেও নাকি রয়েছে রাজকীয় ছাপ।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়—তিনি নিয়মিত অফিসে আসেন নতুন মডেলের নোহা মাইক্রোবাসে, যার নম্বর ঢাকা মেট্রো-চ-১৫-৪৬১৮।
অভিযোগকারীর বক্তব্য—“একজন উচ্চমান সহকারী কীভাবে ফ্ল্যাট, প্লট ও বিলাসবহুল গাড়িসহ অঢেল সম্পদের মালিক হন—এই প্রশ্ন এখন রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝেও ঘুরছে।
”ডার্লিং পয়েন্ট অ্যাপার্টমেন্ট—ধানমন্ডির ঝিগাতলা এলাকার একটি প্রতিষ্ঠিত আবাসিক ভবন। স্থানীয় রিয়েল এস্টেট সূত্র বলছে, ভবনটির নির্মাণকাল প্রায় এক দশক আগে। অর্থাৎ অভিযোগে উল্লিখিত ফ্ল্যাটগুলো নতুন কেনা নয়, বরং ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যেই মালিকানা হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে সময় ঝিগাতলা এলাকায় এই ধরনের মাঝারি-উচ্চমানের একটি ফ্ল্যাটের বিক্রয়মূল্য ছিল আনুমানিক ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকার মধ্যে। বর্তমান বাজারে যার মূল্য এক কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, একই ভবনে তিনটি ফ্ল্যাটের মালিকানা রয়েছে ফাতেমা বেগম মলির নামে। শুধু ফ্ল্যাটেই বিনিয়োগ দাঁড়ায় কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা (ক্রয়মূল্যে), বর্তমান বাজারমূল্যে যা তিন থেকে চার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
অন্যদিকে একই সময়ে সরকারি পে-স্কেল অনুযায়ী একজন অফিস সহকারী বা উচ্চমান সহকারীর মাসিক বেতন সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ২২ হাজার টাকার বেশি ছিল না। বছরে বৈধ আয় দাঁড়াত দুই থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে। সংসার ব্যয়, বাসাভাড়া, সন্তান লালন-পালনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিলে সঞ্চয়ের সুযোগ ছিল নিতান্তই সীমিত। এমন বাস্তবতায় কয়েক বছরের ব্যবধানে অর্ধকোটি টাকার বেশি মূল্যের একাধিক ফ্ল্যাট কেনার আর্থিক সামর্থ্য অর্জন—স্বাভাবিক অর্থনৈতিক যুক্তিতে ব্যাখ্যাতীত।
এখানেই প্রশ্ন উঠে আসে সম্পদের উৎস নিয়ে। যখন একজন কর্মচারীর ঘোষিত আয়ের সঙ্গে অর্জিত সম্পদের পরিমাণের ব্যবধান কয়েক দশকের হিসাবেও মেলানো যায় না, তখন সেটি আর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প থাকে না—বরং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার গুরুতর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
এই আর্থিক অসঙ্গতিই এখন অভিযোগপত্রের প্রধান ভিত্তি। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টদের ভাষায়—এই হিসাবের গরমিল শুধু একজন ব্যক্তির নয়, বরং রাজউকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অদৃশ্য লেনদেন ব্যবস্থার দিকেই ইঙ্গিত করে।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজউকের ভেতরে যখন উপপরিচালক প্রবীর কুমার দাসের নেতৃত্বে মলির বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন সংশ্লিষ্ট মহলে গুঞ্জন ওঠে—দুদকের সম্ভাব্য তদন্ত মোকাবিলায় তৎপরতা শুরু হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এখানেই শেষ নয়। রাজউকের অন্যান্য শাখাতেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে দুদক ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। এস্টেট ও ভূমি শাখার এক অফিস সহকারীর বিরুদ্ধেও পৃথক অভিযোগ দায়ের হয়েছে—যেখানে অভিযোগের ধরন ও ভাষা প্রায় একই রকম।
এতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—সমস্যা কোনো একক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধি।
রাজউক একসময় ছিল নগর উন্নয়নের নিয়ন্ত্রক স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। অথচ আজ সেই প্রতিষ্ঠান ঘিরে উঠছে ‘ফাইল আটকে রাখা’, ‘চুক্তিপত্রের দরদাম’, ‘নথির গোপন দরজা’—এসব শব্দের অস্বস্তিকর অভিধান।
প্রশ্ন উঠছে—যেখানে দেশের রাজধানীর পরিকল্পনা ও নিরাপদ নগরায়ণের দায়িত্ব, সেখানে যদি দুর্নীতির অভিযোগই প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে, তাহলে নাগরিক আস্থা কোথায় দাঁড়ায়?
উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো নিয়ে মলির বক্তব্যে জানার জন্য তার অফিসে যাওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায় নি।
এখন দেখার বিষয়—প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও দুদকে জমা পড়া এসব লিখিত অভিযোগ আর কত দিন, কত বছর তদন্ত করার পর এসব অভিযোগ বাস্তবে রূপ নেবে? নাকি অভিযোগ গুলো কাগজের ভাঁজেই থেকে যাবে।
রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রিত অদৃশ্য সাম্রাজ্যের একেকটি অধ্যায় উন্মোচিত হচ্ছে অনুসন্ধানে। প্রশ্ন একটাই—এই অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান কবে ঘটাবে দুদক ? শেষ পর্যন্ত দুদকই উন্মোচন করবে কি না—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। নগরবাসীর চোখে এখন শুধু অপেক্ষা, কখন এই অন্ধকার অধ্যায়ের চূড়ান্ত হিসাব কাটা হবে।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
