April 22, 2026, 10:17 pm


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-04-22 20:17:22 BdST

ঢাকায় গ্রাহকের কাছে ‘ভুতুড়ে বিল’ পাঠাচ্ছে উবার


গ্রাহকদের কাছে ভুয়া বিল পাঠাচ্ছে উবার। পাঁচ-ছয় মাস আগের কোনো ট্রিপের ভাড়া বকেয়া দেখিয়ে ভুতুড়ে বিল পাঠানো হচ্ছে। এই বিল নিয়ে গ্রাহকরা অভিযোগ জানালেও কোনো প্রতিকার দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে উবার কর্তৃপক্ষ। ফলে ঢাকার ব্যবহারকারীরা উবারের ভুতুড়ে বিলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছেন।

এমনিতেই ঢাকায় উবারের সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। গ্রাহকসেবা কেন্দ্র না থাকা, অ্যাপে অভিযোগ জানানোর সহজ সুযোগ না থাকা, চালকের কাছে যাত্রীর সব তথ্য উন্মুক্ত রাখা এবং যাত্রা শুরু ও শেষে প্রদর্শিত ভাড়ায় বড় ধরনের তারতম্য— এসব নিয়ে আগে থেকেই অভিযোগ ছিল। এবার ভুয়া বিলের ঘটনা সেই অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিকার চাইলে উবার কর্তৃপক্ষ ই-মেইলে দুঃখ প্রকাশ করে গ্রাহককে ‘এবারের মতো’ ভুয়া বিল পরিশোধ করার অনুরোধ জানাচ্ছে।

এদিকে একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে উবারের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতির মেয়াদ আগামী জুনে শেষ হচ্ছে। উবার কর্তৃপক্ষ গত মার্চের প্রথম সপ্তাহে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে। তবে বেশ কিছু শর্ত পূরণ না করায় সরকার এই বছর তাদের অনুমতি নবায়নের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় রেখেছে। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, মার্চ মাসে উবারের নবায়ন আবেদনের পর থেকেই গ্রাহকদের কাছে ভুতুড়ে বিল যাওয়া শুরু হয়েছে।

যেভাবে ভুয়া বিল আসছে

অনুসন্ধানে একাধিক গ্রাহকের কাছে উবারের ভুয়া বিল আসার তথ্য উঠে এসেছে। উবারের নিয়মিত ব্যবহারকারী আনান ফারাবি জানান, গত ১৬ মার্চ উবার অ্যাপে গাড়ি ডাকতে গিয়ে তিনি দেখেন আগের কোনো একটি ট্রিপের ৪০৯ টাকা অপরিশোধিত বলে নোটিশ দেখাচ্ছে। অথচ এর আগে কোনো ট্রিপেরই বিল তার বাকি ছিল না— প্রতিবারই চালকের দাবিমতো নগদে ভাড়া পরিশোধ করেছেন তিনি।

একই সময়ে উবারের একটি ই-মেইল বার্তায় তাকে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে আব্দুর রশীদ নামের এক চালকের গাড়িতে (ঢাকা মেট্রো গ-২৩-৪৪২০) ঢাকার ভেতরে একটি ট্রিপে ৪৬৭ টাকার ভাড়ার মধ্যে ৪০৯ টাকা অপরিশোধিত রয়েছে। সেবা পেতে হলে এই বকেয়া পরিশোধ করতে হবে, অথবা আপত্তি থাকলে অ্যাপের মাধ্যমে জানাতে হবে।

আনান ফারাবি প্রশ্ন তোলেন, ১০ নভেম্বরের ট্রিপের বিল বাকি থাকলে পরবর্তী পাঁচ মাসে— অর্থাৎ ১৪ মার্চ পর্যন্ত— কোনো নোটিশ না দিয়ে কীভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে তাকে উবার সেবা দেওয়া হলো? উবারের নিজের নীতি অনুযায়ী, আগের ট্রিপের বিল বাকি থাকলে পরের ট্রিপেই তা সমন্বয় হওয়ার কথা। তাছাড়া ঢাকায় উবারের ৯৯ শতাংশ চালকই নগদ ছাড়া ট্রিপে যান না। চালককে টাকা না দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার সুযোগও নেই। তাই পাঁচ মাস আগের ট্রিপের বিল বকেয়া থাকার দাবি সম্পূর্ণ হাস্যকর।

তিনি জানান, অ্যাপে প্রায় বিশটি ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত আপত্তি জানানোর অপশন পান তিনি। আপত্তি জানানোর তিন দিন পর উবার আরও তথ্য চেয়ে ই-মেইল পাঠায়। সেই তথ্য দেওয়ার আরও তিন দিন পর পাঠানো জবাবে উবার জানায়— ট্রিপটি যে ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর হয়েছিল এবং নগদ পেমেন্ট অপশনেই লেনদেন হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে বকেয়া বিলের বিষয়ে কিছু করার নেই, কারণ ট্রিপটি চার মাসেরও আগের এবং এত পুরনো ট্রিপের সমাধান দেওয়ার ‘কারিগরি সক্ষমতা’ উবারের নেই। তাই এবারের মতো বিলটি পরিশোধ করে ভবিষ্যতে ট্রিপের তিন দিনের মধ্যে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

আনান ফারাবির প্রশ্ন— ছয় মাস পর ভুতুড়ে বিল পাঠানো হলে গ্রাহক তিন দিনের মধ্যে অভিযোগ জানাবেন কীভাবে? অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি সেবা প্রতিষ্ঠান এত অযৌক্তিক জবাব দেয় কীভাবে?

একই ধরনের অভিজ্ঞতার শিকার হওয়া আরেক গ্রাহক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ২০২৪ সালের অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহের একটি ট্রিপের প্রায় ৩৫০ টাকা বকেয়ার নোটিশ পান তিনি। অনেক কষ্টে অ্যাপ থেকে অপশন বের করে প্রতিকার চাইলে উবার ই-মেইলে দুঃখ প্রকাশ করে জানায়, ছয় মাস আগের ট্রিপের বিষয়ে কিছুই করার নেই। তার প্রশ্নও একই— কিছুই করার না থাকলে ছয় মাস আগের বকেয়া বিল আসছে কীভাবে?

শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে পুরনো মোবাইল নম্বরে খোলা উবার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে নতুন নম্বরে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেছেন তিনি। বিস্তারিত প্রকাশ করতে রাজি নন, কারণ নতুন অ্যাকাউন্টটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবু ট্যাক্সিক্যাবহীন ঢাকায় প্রয়োজনে উবার ছাড়া উপায় নেই বলে জানান তিনি।

যেভাবে চলছে উবার

নিয়মিত ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্বের অন্যান্য শহর— এমনকি প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলংকার তুলনায়ও— ঢাকায় উবারের সেবার মান অত্যন্ত নিম্নমানের। ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ চালক অপ্রশিক্ষিত এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে অদক্ষ। ঢাকাই সম্ভবত একমাত্র শহর যেখানে উবারে ট্রিপ পেতে হলে গ্রাহককে চালকের সঙ্গে আগে ফোনে কথা বলতে হয়, গন্তব্যের বিস্তারিত জানাতে হয় এবং নগদ ভাড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়।

ঢাকার কাস্টমাইজড উবার অ্যাপে চালক ট্রিপ গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের গন্তব্য ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য দেখতে পান। তবু ফোনে ‘সাক্ষাৎকার’ না দিয়ে ট্রিপ পাওয়া কার্যত অসম্ভব।

উবারের সঙ্গে আগে সম্পর্কিত ছিলেন এমন একজন সূত্র জানান, ঢাকায় চালকদের প্রযুক্তিনির্ভর অ্যাপ ব্যবহারের জন্য উবার কর্তৃপক্ষ কিংবা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ— কেউই যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেনি। অথচ শ্রীলংকায় নতুন চালককে প্রথমে প্রশিক্ষণ দিয়ে তারপর সেবায় যুক্ত করা হয়। সেখানে কোনো চালকের বিরুদ্ধে নীতিলঙ্ঘন বা অসদাচরণের অভিযোগ গেলে উবার সেবা বন্ধসহ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ঢাকায় চালকদের বিষয়ে গ্রাহকের অভিযোগের কোনো প্রতিকার নেই।

তিনি আরও জানান, গ্রাহকদের বিষয়েও কিছু অভিযোগ আছে। আসলে বাংলায় সহজবোধ্যভাবে উবারের নীতি গ্রাহকদের জানানোর কোনো ব্যবস্থাই নেই। ঢাকার মতো বিশৃঙ্খল উবার সেবা আর কোথাও মেলা ভার।

অ্যাপে প্রতিকারের পথ নেই

বাংলাদেশে একসময় উবারের কল সেন্টার ছিল, অ্যাপে ‘ট্রিপ হেলপ’ নামে সহজে অভিযোগ জানানোর ট্যাবও ছিল। এখন ঢাকার কাস্টমাইজড অ্যাপে ‘হেলপ’ অপশন থেকে ‘ট্রিপ হেলপ’ পর্যন্ত পৌঁছাতে অনেকগুলো ধাপ পেরোতে হয়। ফলে অধিকাংশ গ্রাহক অভিযোগ জানাতেই পারেন না। কার্যত ঢাকায় উবারের কোনো গ্রাহকসেবা কার্যক্রমই নেই। উবার কর্তৃপক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত চালকদের খেয়ালখুশিতে সব ভোগান্তি মেনে নিয়েই সেবা ব্যবহার করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, চালকদের দেওয়া হয়েছে ব্যাপক স্বাধীনতা। ট্রিপ গ্রহণের পর গন্তব্য বা ভাড়ায় অসন্তুষ্ট হলে অধিকাংশ চালক ফোনে যাত্রীকে ট্রিপ বাতিল করতে বলেন। যাত্রী রাজি না হলে পিক-আপ পয়েন্টের দিকে কিছুটা এসে ট্রিপ ফরওয়ার্ড বা বাতিল করেন কেউ কেউ। এতে যাত্রীকে ৩০ টাকা বিলম্ব ফি গুনতে হয়। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত অভিযোগ জানানো বা প্রতিকার পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। জরুরি যাত্রায় ভোগান্তি সহ্য করে ৩০ টাকা গচ্চা দিয়ে আবার নতুন ট্রিপ খুঁজতে হয়।

এছাড়া একটু যানজট দেখলেই রাস্তার মাঝপথে হঠাৎ ‘গাড়ি বন্ধ’ হয়ে যায় বা চালক বন্ধ করে দেন এবং যাত্রীকে নামতে বাধ্য করা হয়। মাঝপথে ট্রিপ শেষ হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল গন্তব্যের ভাড়াই দেখায় উবার, এবং যাত্রীকে তা দিতে বাধ্য হতে হয়। এক্ষেত্রেও যাত্রীরা সম্পূর্ণ অসহায়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকায় উবারের জনসংযোগ সংস্থার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও গত এক সপ্তাহেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.